kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

স্মরণ

জনবান্ধব ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ

আতিউর রহমান

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



জনবান্ধব ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ

ইব্রাহিম খালেদ ভাইও চলে গেলেন!

আমরা বুঝতে পারছিলাম, তাঁকে আর ধরে রাখা যাবে না। তবু মন থেকে এই সত্যটি মেনে নিতে পারছিলাম না। সর্বক্ষণ তাঁর ছোট ভাই মোহাম্মদ খালেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম। কভিড থেকে রেহাই পেলেন। এক-দুদিন হাসপাতালে রেখেই বাসায় নেওয়ার কথা। তাঁকে সেবা-যত্ন করবেন সে রকম একজন প্রশিক্ষিত নার্সও ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা ভাবি এক আর বাস্তবে ঘটে অন্য কিছু। শেষ পর্যন্ত আমাদের এক ভয়াল শূন্যতায় ফেলে রেখে একা একাই চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। এই বাস্তবতা যে কী কষ্টের তা বোঝাই কী করে? তিনি ছিলেন আমার আত্মার আত্মীয়। আমার বড় ভাই। আমার দুঃখের ও সুখের সাথি। কভিড আসার আগ পর্যন্ত এমন কোনো সপ্তাহ নেই যে তিনি অন্তত একবার আমাদের বাসায় আসেননি। আর টেলিফোনে তো যোগাযোগ ছিলই। ব্যাংকিং খাতের বাইরেও তিনি আমাদের নানা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার প্রতিষ্ঠিত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন সমন্বয় ও সমুন্নয় দেখে রাখতেন। ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের সভাপতির দায়িত্ব মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করে গেছেন। চরের মানুষের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমে তাঁর নিরলস অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। খালেদ ভাইয়ের পরিচালিত কচি-কাঁচার মেলার সঙ্গে ছিল আমার প্রাণের সম্পর্ক। তিনি সত্য, সুন্দর ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বদাই আপসহীন ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসতেন। বাংলাদেশের কপালে যখন অন্ধকার নেমে এসেছিল, তখনো তিনি পূবালী ব্যাংকে তাঁর অফিসে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়ে রেখেছিলেন। দায়িত্ব শেষ করে সেই ছবি সযত্নে বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। ব্যাংকসহ দেশের আর্থিক সেবা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিঃশঙ্ক চিত্তে কাজ করেছেন, আমাদের জন্য রেখে গেছেন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। ইব্রাহিম খালেদকে কাছে থেকে দেখার এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছে তাঁরা নিশ্চয়ই নিজ নিজ ক্ষেত্রে আরো বেশি জনবান্ধব ভূমিকা রাখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। ‘দুষ্ট’ লোকদের কারণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের আমলেও আর্থিক খাতকে আরো বেশিদিন সেবা করতে পারেননি। যে কদিন দায়িত্বে ছিলেন আমার সঙ্গে কতবার যে গ্রামে গেছেন প্রকাশ্যে কৃষিঋণ দেওয়ার জন্য! তাঁর মনের দুঃখ আমি জানতাম। সেসব কষ্টের কথা আজ না-ই বা বললাম। কত স্মৃতি, কত কথা আজ মনে ভাসছে! পেশাদারি কাজে শেষবার তাঁর সঙ্গে বসেছিলাম বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। এই দুর্ভাগা দেশে এমন ভালো ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ খুব বেশি জন্মে না। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির ভুবনের উজ্জ্বল প্রদীপগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। ইব্রাহিম খালেদের জীবন, কর্ম, অনুশীলন ও দর্শনকে অনুধাবন করে, তাঁর কাজগুলোকে এগিয়ে নিতে সমবেত চেষ্টার মাধ্যমেই আমরা তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে পারি। তাঁর আত্মা শান্তিতে ঘুমাক, সেই প্রার্থনাই করছি। পরিবারের সদস্য এবং তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহীর জন্য রইল গভীর সমবেদনা।

 লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক

 

মন্তব্য