kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

পিলখানা আর আলজাজিরা একই সূত্রে গাঁথা

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পিলখানা আর আলজাজিরা একই সূত্রে গাঁথা

ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের পিছু ছাড়ছে না, যার সম্প্রতি উদাহরণ আলজাজিরা টেলিভিশনের উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যাচার। কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশ যখন একটা স্থিতিশীল অবস্থায় আসে, সমৃদ্ধির পথ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখনই ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় হয়। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। অভিভাবক হিসেবে তিনি যথার্থ কাজ করেছেন। জনগণ সতর্ক থাকলে ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হবে না। দেশের অভ্যন্তর থেকে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জায়গা থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কারা ষড়যন্ত্র করে আসছে, তাদের স্বরূপ চিনতে এখন আর বাকি নেই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় থেকে এ পর্যন্ত বড় বড় ষড়যন্ত্র যেগুলো সামনে এসেছে তার পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলেই সব কিছু পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় যড়যন্ত্রের শিকার হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পরিবারের দুজন বাদে সব সদস্য নিহত হলেন। ষড়যন্ত্রে বিশাল বড় ঝুঁকি আছে। বিশাল ঝুঁকির বিপরীতে বিশাল লাভ যারা দেখে, তারাই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে? লাভবানদের মধ্যে এক নম্বরে আছে একাত্তরে পাকিস্তানের একনিষ্ঠ সহযোগী দেশের অভ্যন্তরীণ পরাজিত গোষ্ঠী জামায়াত, মুসলিম লীগসহ পাকিস্তানপন্থী ইসলামিস্ট দলগুলো। একাত্তরের পর তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। এই যে অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী, এদের বড় একাংশকে নিয়ে প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করলেন, যার নাম বিএনপি। এই একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে এবং সেনাবাহিনীর ওপর ভর করে তিনি রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন। সুতরাং এই বিচারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রধান সুবিধাভোগী জেনারেল জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের জেরে আঞ্চলিকভাবে পাকিস্তান অত্যন্ত লাভবান হয়। প্রথমত, একাত্তরের পরাজয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ নেওয়া হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের জন্য আরেকটি বড় প্রতিশোধ নেওয়ার পথ সুগম হয়। পাকিস্তানের সক্রিয় ইন্ধনে পূর্ব পাঞ্জাবের খালিস্তান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিহত হন। আগের একটি লেখায় তথ্য-উপাত্তসহ বিশ্লেষণ তুলে ধরে আমি বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে ইন্দিরা গান্ধীকে এভাবে নিহত হতে হতো না। এ প্রসঙ্গে অন্য সময়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে। এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথায় আসি।

একাত্তরের অব্যবহিত পরে জামায়াতপ্রধান গোলাম আযমের নেতৃত্বে পাকিস্তান যে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু করেছিল, তার লক্ষ্য পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই অর্জিত হয়ে যায়। পঁচাত্তরের পর জিয়ার আমল থেকে এরশাদ এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও জামায়াত-বিএনপির আমলে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতের সশস্ত্র, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়ার সুযোগ পায় পাকিস্তান। তাহলে কি এই দাঁড়াল না যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে লাভবান এবং সুবিধাভোগী দেশের অভ্যন্তরে একাত্তরের পরাজিত সব পক্ষের সঙ্গে নতুনভাবে আসা জিয়াউর রহমান ও তাঁর গঠিত দল বিএনপি, আর আঞ্চলিকভাবে পাকিস্তান। এবার বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি ও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের ধারক-বাহক এবং প্রধান কাণ্ডারি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায় আসি। শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা হয়েছে, যার ফুটেজ কয়েক দিন আগেও টেলিভিশনে দেখানো হলো। শেখ হাসিনার বিপরীতে দেশে আরো রাজনৈতিক শীর্ষ নেতা-নেত্রী ছিলেন এবং আছেন, তাঁদের কারো ওপর একবারও কোনো আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড আক্রমণ আরেকটি বড় ষড়যন্ত্রের উদাহরণ। সেদিন শেখ হাসিনা নিহত হলে কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতো? একাত্তরের পরাজিত পক্ষ যুদ্ধাপরাধীসহ সব ইসলামিস্ট উগ্রবাদী গোষ্ঠী এবং বিএনপি সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো। আর আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে লাভবান হতো পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যারা ধর্মীয়, উগ্রবাদী ওয়াহিতন্ত্র অর্থাৎ ব্রাদারহুডের রাজনীতির প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশে দেখতে চায়, যার মধ্যে কাতার এবং তাদের আলজাজিরা টেলিভিশন পড়ে। আদালতের বিচারে প্রমাণিত হয়েছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের আক্রমণের সঙ্গে বিএনপি, জামায়াত ও পাকিস্তান সরাসরি জড়িত। সুতরাং যৌক্তিকতাই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কারা জড়িত এবং তার টার্গেট কারা। এবার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের কথায় আসি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার, যেখানে তারা ওয়াদা করে, ক্ষমতায় গেলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করবে। একই সঙ্গে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড আক্রমণ, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে ধরা পড়া দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। ওয়াদা করা হয়, জঙ্গি দমনে জিরো টলারেন্স এবং প্রতিবেশী দেশের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। সুতরাং এ অবস্থায় তখন কারা স্বপ্নে ফাঁসির দড়ি দেখতে শুরু করে, কাদের রাজনীতি অস্তিত্বের হুমকিতে পড়ে এবং কোন দেশ আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণে এত দিনের সুবিধা হারাতে চলেছে তার সব কিছুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যার বাস্তব প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে। সুতরাং নিজেদের কৃত পাপের পরিণতি থেকে রক্ষা পাওয়ার নিয়মতান্ত্রিক সব পথ বন্ধ দেখেই তারা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেবে, সেটাই সহজাত হিসাব। নতুন সরকারের মাত্র ৫০ দিনের মাথায় ২০০১-০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি এবং ২০০৭-০৮ মেয়াদে জরুরি আইনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার অর্থাৎ একনাগাড়ে সাত বছর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সর্বত্র তারা যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তা বহাল থাকতেই উপরোল্লিখিত পক্ষগুলো একটা সুযোগ পেলেই নতুন সরকারকে ফেলে দেওয়ার চরম উদ্যোগ নেবে, সেই রকম কথাই সহজাত যুক্তিতে আসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৈরি কিছু ইস্যু নিয়ে সে সময় থেকেই তৎকালীন বিডিআর জোয়ানদের মধ্যে একটা চরম অসন্তোষ চলছিল। সংগত কারণেই ষড়যন্ত্রকারীরা এই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইবে না। বিডিআরের বিদ্রোহী জোয়ানরা গুলি চালিয়ে ৫৭ জন সেনা অফিসারকে হত্যা করে। অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে কিছু দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য বিদ্রোহের প্রথম ধাক্কায় বাহিনীপ্রধানসহ এতগুলো অফিসারকে হত্যা করার উদাহরণ কোনো বিদ্রোহের ইতিহাসে যেমন নেই, তেমনি কোনো যুক্তিও পাওয়া যায় না। বিদ্রোহে জড়িতদের বিদ্যা, বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার সহজাত সীমাবদ্ধতার কথা সবারই জানা। সুতরাং জোয়ানদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী। জোয়ানদের অসন্তোষকে পুঁজি করে ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্থাৎ সদ্য ক্ষমতায় আসা সরকারকে ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বিডিআর জোয়ানদের ব্যবহার করে। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট কর্তৃক রায়ের পর্যবেক্ষণেও প্রায় সে রকম কথাই এসেছে। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সরকারকে বিপদে ফেলা, রাজনৈতিক সংকট তৈরি এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই ষড়যন্ত্র করে।

ষড়যন্ত্রকারীরা সরকারের জন্য সূক্ষ্ম ফাঁদ পেতেছিল। প্রথম ধাক্কায় বাহিনীপ্রধানসহ বেশির ভাগ অফিসারকে হত্যা করে সরকার ও সেনাবাহিনীকে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন এবং চরম উত্তেজনার মধ্যে ফেলে দেয়। এ অবস্থায় সরকার ও সেনাবাহিনী পিলখানার অভ্যন্তরে অপরিকল্পিত ত্বরিত সেনা অভিযান চালালেই ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম হতো। পিলখানার ভেতর থেকে দূরপাল্লার বড় বড় অস্ত্র চালালে ধানমণ্ডিসহ আশপাশে বসবাসরত মানুষের মধ্যে বিশাল বড় হতাহতের ঘটনা ঘটত। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে ৪৬টি ব্যাটালিয়ন ও ১২টি সেক্টর সদর দপ্তর এলাকায় সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। কয়েক হাজার মানুষ নিহত এবং গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের ভেতর থেকে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সদ্য ক্ষমতায় আসা সরকার চরম বিপদ ও অস্তিত্বের সংকটে পড়ত। তাতে লাভবান হতো ওই সব রাজনৈতিক পক্ষ ও ব্যক্তি, যাদের কথা লেখার মধ্যভাগে উল্লেখ করেছি। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা মানেই আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণে পাকিস্তানের বেকায়দায় থাকা। সুতরাং পিলখানা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে কারা জড়িত সেটা একেবারে স্পষ্ট। সেদিন তারা সফল হতে পারেনি, কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে নেই। সম্প্রতি আলজাজিরা টেলিভিশন কর্তৃক প্রচারিত জোড়াতালি এবং কাট ও পেস্টের মাধ্যমে তৈরি মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ একটি তথ্যচিত্র দেখলেই সেটা বোঝা যায়। তাই প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। পিলখানা আর আলজাজিরা একই সূত্রে গাঁথা দুটি পৃথক ঘটনা।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য