kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

বিতর্কিত একটি হত্যাকাণ্ডেই সেনাপ্রধানের পরিবারকে ‘মাফিয়া’ ট্যাগ কোন উদ্দেশ্যে?

এম আব্দুল্লাহ আল মামুন খান

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বিতর্কিত একটি হত্যাকাণ্ডেই সেনাপ্রধানের পরিবারকে ‘মাফিয়া’ ট্যাগ কোন উদ্দেশ্যে?

আনিস-হারিস-জোসেফ নাম তিনটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই ‘চক্ষুশূল শ্রেণি’র মুখস্থ এক উচ্চারণ ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’। নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদের সপক্ষে মোক্ষম হাতিয়ার তুমুল আলোচিত-সমালোচিত বাতাস ভবনের সেই তালিকা। বছরের পর বছর ঘোরতর আওয়ামীবিদ্বেষী লোকজনকে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে তিন সহোদরের নামের পাশে এই জুতসই টাইটেলেই।

আর কুিসত কদর্য মিথ্যাচারের উন্মুক্ত মাধ্যম হাল সময়ের ইউটিউব আর ফেসবুক হলে কোনো কথাই নেই যেন! এক শব্দেই তাদের পরিচিত করা হচ্ছে ‘মাফিয়া পরিবার’ হিসেবে। আর পরিবারটির প্রধান হিসেবে চাতুর্য ভরপুর চটকদার স্লোগানে উচ্চারিত হচ্ছে সেনাপ্রধান জেনারেল ড. আজিজ আহমেদের নাম। বিকৃত নোংরা তথ্য প্রচার আর মিথ্যাচারের কী জঘন্য শব্দ সন্ত্রাসের নমুনা। অথচ আনন্দের আতিশয্যে কী আটখানা ভাব উচ্চারণকারীদের!

বছরের পর বছর সাজিয়ে-গুছিয়ে একটি পরিবারের গায়ে এমন কলঙ্ক তিলক লেপ্টে আত্মতৃপ্তির ঢেকুরকারীরা সত্যের আপনা বাজনার কাছেই কার্যত হেরেছেন। আলজাজিরার ফিল্মি তথ্যচিত্র মঞ্চস্থের পর দেশের বুদ্ধিজীবী মহল, স্বাধীনতার সপক্ষের নেটিজেনরা, মুক্তচিন্তার তারুণ্য ও গণমাধ্যমকর্মীরা নিজেদের প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তিতেই ‘ময়না তদন্ত’ করেছেন আহমেদ পরিবারের তিন সহোদর ভাইয়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময়ের জঘন্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কল্পিত সব পরিচয়ের।

আদতে বঙ্গবন্ধুর খুনির দল ফ্রিডম পার্টিকে ‘পুরস্কৃত’ করতে গিয়েই তিন ভাইকে ফাঁসাতে ‘যুুবক কালিদাস’ তার অনুগামী বাবর আলীকে দিয়ে যে একটি ফরমায়েশি তালিকা প্রস্তুত করিয়েছিলেন, এই ধ্রুব সত্যও তাদের আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিহিংসার নষ্ট রাজনীতির বলি হয়ে একটি হত্যাকাণ্ডে জোসেফকে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে ২০ বছরের দহন যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় জোসেফ খালাস পেয়েছেন। দুই ভাই আনিস আহমেদ ও হারিস আহমেদকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১)-এর ধারায় সাজা মওকুফ করেছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার এ জন্য নতুন কোনো আইন করেনি। ১৮৮৯ সাল থেকেই নির্বাহী বিভাগকে এই সাজা মওকুফের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই আইনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত এবং ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও স্বাধীনতা দিবসে অনেক সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে সাজা মওকুফের একাধিক উদাহরণও দিয়েছেন দেশের শ্রেষ্ঠ আইন বিশেষজ্ঞদের অন্যতম আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

২.

তিলকে তাল বানানো বা ফোলানো-ফাঁপানো; একদা গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে গালমন্দ করে মনগড়া নিবন্ধ যাঁরা লিখতে পারেন, তাঁদের চোখে এই সাজা মওকুফ বিরাট এক অপরাধই বটে! কাতারে মেঘের পর দেশীয় আলোতে বৃষ্টি হয়েছে। দেশের আকাশে সেই ঘনঘোর অশুভ ছায়া নিয়েই কি তবে তাঁরা নিজেদের চেনা মাইনাস ফর্মুলা তত্ত্বের সেঁকোবিষ গেলাতে আবারও হন্তদন্ত হয়ে ছুটছেন?

নিষিদ্ধ ফ্রিডম পার্টির সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ‘লাল ঘোড়া দাবড়ে দেওয়া’ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত নব্বইয়ের প্রতিবাদী তারুণ্যের শক্তিকে কলুষিত চরিত্র দিয়ে তাঁরা কাদের বেনিফিশিয়ারি করতে চাচ্ছেন, সেই প্রশ্নও মোটাদাগে সামনে চলে এসেছে। তাঁদের এই অসৎ উদ্দেশ্যকে প্যারোডি করে কেউ কেউ এখন বলতে শুরু করেছেন, ‘কত কেরামতি জানো রে বান্দা, কত কেরামতি জানো।’

কেউ কেউ আবার নেতিবাচক এই ব্র্যান্ডিংকে দেখছেন এমনভাবে—ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১)-এর ধারায় যখন খালেদার সাজা স্থগিত হয়, তখন এঁরা আনন্দে গদগদ হয়ে অষ্টপ্রহর গণতন্ত্রের তসবিহ জপেন। আর আওয়ামী লীগের চরম দুঃসময়ের কর্মী আনিস, হারিস ও জোসেফের পিণ্ডি চটকাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা সিরিয়াল কিলারকে ‘ব্যবসায়ী’ অভিধায় ভূষিত করতে পারেন আর ত্যাগী, পরীক্ষিত রাজনৈতিক কর্মীদের নিজেদের অপপ্রচারের উর্বর মস্তিষ্ক দিয়ে শব্দবোমায় অভিঘাত করতে পারেন।

এমন মতলববাজ, সাধুচক্রের উদ্দেশেই কিনা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা, স্বনামখ্যাত সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী যথার্থই বলেছিলেন, ‘তাদের প্যাথলজিক্যাল হেট্রেট আছে আওয়ামী লীগের ওপর।’

খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক আদালতের বিচারে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হয়ে নিজ দলের পদে দাপটের সঙ্গেই টিকতে পারেন, দিব্যি রাজনীতি চালাতে পারেন—এসবে তাঁদের শরম করে না মোটেও। কিন্তু আনিস-হারিসরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমা পেলেই তাঁদের শরীরে চুলকানির মাত্রা তীব্র হয়। এ যেন ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ প্রবচনেরই সমার্থক।

 ৩.

তথ্য-প্রমাণহীন পূর্ণ মিথ্যাচারের চিত্রায়ণের মাধ্যমে আলজাজিরার ‘পর্বতে মূষিক প্রসব’র পর এক শ্রেণি রীতিমতো উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। কিন্তু সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেনা সদর দুই দফা অসত্য, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কল্পিত প্রতিবেদনকে ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান করেছে। পয়েন্ট ধরে ধরে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেনাপ্রধান নিজেও দেখিয়ে দিয়েছেন কোথায় কোথায় কিভাবে জাজিরা কল্পকাহিনি সন্নিবেশিত করা হয়েছে। দুই সহোদর দণ্ড মওকুফের পরই তাঁর ছেলের বিয়েতে উপস্থিত হয়েছেন, এটাও প্রমাণ দিয়েই উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এর পরও বিভ্রান্তি ছড়ানোতে মশগুল পক্ষটি জাজিরার ইস্যু জিইয়ে জল ঘোলা করে যাচ্ছে।

আওয়ামী রাজনীতিতে সেনাপ্রধানের ভাইদের ত্যাগের রক্তের ইতিহাস রয়েছে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই জোসেফ-হারিসদের দলীয় আদর্শে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী মনের কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গের শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাতে পিশাচসিদ্ধ ঘাতকের দল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির চরম বৈরী সেই সময়। এক রাতে সব হারানোর বেদনাকে জয় করে শুধু গণতন্ত্র আর প্রগতিশীলতার রাজনীতি ফেরাতে নিজেকে উৎসর্গ করেন মুজিবকন্যা।

ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে পিদিমের আলো নিয়ে ছুটে চলার প্রারম্ভিক সূচনায় হায়েনাদের বুলেট প্রতিনিয়ত তাড়া করছে তাঁকে। পিতা মুজিবের অনুসারীরা রীতিমতো একঘরে। বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল ফারুক-রশীদের নেতৃত্বাধীন ফ্রিডম পার্টি তখন পুরো রাজধানীতে অস্ত্রের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে গ্রেনেড বোমা আর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীরা। নিরাপত্তারক্ষী দুই হাবিলদার ও একদল মুজিবপাগল কর্মীর জীবনবাজির প্রতিরোধের মুখে পালিয়ে যায় খুনিরা—সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আজকের প্রধানমন্ত্রী। এরপর ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে হত্যা করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার বদান্যতায় দেশে চলছে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের উল্লাস নৃত্য।

আওয়ামীবিরোধী প্রবল হিংস্রতা ও দমন-পীড়নের চরম মুহূর্তে সাহস নিয়ে অনেক তরুণ-যুবা সম্মিলিতভাবে সেই অপশক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি ও মিরপুর এলাকায় আনিস, হারিস, টিপু ও জোসেফদের মতো তৃণমূলের বিশাল কর্মী বাহিনীই আওয়ামী লীগকে আবার সংগঠিত করতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

আদর্শিক নিবেদিত এই কর্মীরা শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দল ছেড়ে যাননি। এর খেসারত হিসেবে ফ্রিডম পার্টির ভয়ংকর সন্ত্রাসী ফ্রিডম মোস্তফা ও ক্যাডারদের হাতে প্রাণ হারাতে হয় আনিস-হারিসের সহোদর ছোট ভাই ভিপি সাঈদ আহমেদ টিপুকে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার এজাহারভুক্ত ১৮ নম্বর আসামি ছিলেন এই মোস্তফা।

রক্তভেজা ১৫ই আগস্টের কালরাতের পর আমরা দেখেছি জাতির পিতা হত্যার বদলা নিতে অনেক বীর তরুণ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যে প্রতিরোধ সেই সময় গড়ে উঠেছিল, সেটিকে কি কোনো অবস্থায়ই সন্ত্রাসবাদ বলা যাবে? বাম বিপ্লবের চেতনায় সত্তরের দশকে অনেক তরুণ ‘নকশাল’ হয়েছিলেন, তাঁদের কি অপরাধী বলা সমীচীন হবে? তাহলে প্রতিরোধের দীপ্ত শপথে জ্বলে ওঠা আনিস-হারিস-জোসেফদের কেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধীর ট্যাগ দেওয়া হবে?

আমরা জানি, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন চারজনকে ক্ষমা করেন, যাঁর মধ্যে তিনজনই আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন। ওই সময় ক্ষমা পাওয়া ঝিন্টু ছিলেন সুইডেন বিএনপির নেতা। সূত্রাপুরের দুই ব্যবসায়ীকে হত্যার দায়ে তিনিসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।

এর মধ্যে কামাল ও শহীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ঝিন্টু ২০০৫ সালে দেশে ফেরার পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পান। ঝিন্টু ২২ বছর আইনকে অবজ্ঞা করে বিদেশে পলাতক ছিলেন। ঝিন্টুকে ক্ষমা করার জন্য তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ সুইডেন গিয়ে ঝিন্টুকে একই বিমানে করে নিয়ে এসেছিলেন।

এমনকি ছাত্রদলের ক্যাডার ঝিন্টুর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছিলেন, এই কলঙ্কিত ইতিহাসও বিএনপির রয়েছে। সেনাপ্রধানের ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফই যে শুধু মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা পেয়েছেন, ঝিন্টুর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই কথাটি আর বলার সুযোগ নেই। অনেক বছর আগে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সাত খুনের জন্য সাজাপ্রাপ্ত শফিউল আলম প্রধানকে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর প্রথম ক্ষমা করেছিলেন। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রপতি বহুজনকে ক্ষমা করেছেন। তাই এই কুচক্রীদের কথাবার্তা এখন ‘ফাউল টক’ হিসেবেই পর্যবসিত হচ্ছে।

ওয়ান-ইলেভেনের মূল কুশীলব দৈনিকটির ২০১৩ সালের ৭ অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত আমলে পাঁচ হাজার ৮৮৮টি মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ৯৪৫টি মামলা থেকে কিছু আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই দুটি ঘটনায় সর্বমোট ৭৩ হাজার ৫৪১ জন অভিযুক্ত খালাস পান।’ তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল খুন, ধর্ষণ ও ডাকাতির। এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পেছনে সেই সময় সরকার জানিয়েছিল, এগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত মামলা। এ কারণে এই ৭৩ হাজার ৫৪১ জন ব্যক্তি খালাস পেয়েছেন। ওই সময় এই চক্রটি দরদি সরকারকে মাফিয়া বলেনি এবং ক্ষমা বা মামলা প্রত্যাহার নিয়েও কোনো রকম প্রশ্ন করেনি। কিন্তু হারিস-আনিসের সাজা মওকুফের পর তাদের রীতিমতো ‘গাত্রদাহ’ শুরু হয়েছে। তবে বিএনপির শাসনামলের সেই চিত্রই কি তারা বেমালুম ভুলে গেছে, নাকি স্বার্থের কাছে এই চক্রের নীতিবোধ নতজানু, এই প্রশ্নও প্রকট হয়ে উঠেছে।

৪.

সেনাপ্রধানের পরিবারের ত্যাগের রক্তের এই ইতিহাসকে ধূসর করতেই ফ্রিডম মোস্তফার রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে তাঁর নামের পাশে ‘ব্যবসায়ী’ উপমা জুড়ে দিয়ে এক শ্রেণির মিডিয়া ধূর্তরা বেশরকম চাটুকারিতার আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁদের পালে হাওয়া দেন ‘কোনো কিছুই ভালো লাগে না’ রোগে আক্রান্তরা। আদর্শের প্রশ্নে জীবনের মায়া তুচ্ছ করতে পারঙ্গম পরিবারটিই রামের দোসর সুগ্রীবের মতো সুধীসমাজের মুখপত্রের ষড়যন্ত্রের টার্গেট হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

ফেসবুক-ইউটিউবে সেনাপ্রধান ও তাঁর পরিবারের বিষয়ে জঘন্য অপপ্রচারের অপকৌশল গ্রহণকারীদের একজন সিনিয়র সাংবাদিক বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘জাতির পিতাকে হত্যার পর কাটাকুটির মাধ্যমে যারা সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল, এখন আবার নতুন সংবিধান রচনার গালগপ্প দিচ্ছে, জাতির পিতার খুনিদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষ এনেছে, সেই বিশ্বাসঘাতক, রাষ্ট্রের শত্রুদের চোখেই এই পরিবার একটি মাফিয়া পরিবার। সেই পরাজিত শত্রুরাই নানা অশুভ শক্তির সহায়তায় এখন রাষ্ট্রের সতীত্ব হরণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে।’

আলজাজিরা ফিল্ম দেখার পর নিজের মতামত জানিয়ে একজন বরেণ্য আইনজীবী আমাকে বলেছেন, ‘তাসনিম-বার্গম্যানের পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনিতে সেনাপ্রধানকে মাফিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ কসরত করা হয়েছে। কিন্তু ওরাই আবার দেখিয়েছে, বিদেশে ব্যক্তিগত কাজে সরকারি প্রটোকল ব্যবহার না করে একেবারে সাধারণ একজনের মতোই চলাফেরা জেনারেল আজিজ আহমেদের। যিনি ব্যয়বহুল এয়ারক্রাফটে ভ্রমণ না করে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রেন জার্নি করতে পারেন।

আনুগত্য আর দেশপ্রেম ছাড়া কোনো দৃশ্যেই তাঁর দাম্ভিকতা বা অহমিকার সন্ধান পাওয়া যায়নি। অথচ দেশ-বিদেশে কী জঘন্য অপপ্রচার! সচেতন ব্যক্তিমাত্রই এমন ঘৃণ্য ক্রিয়াকর্মে লিপ্তদের বিষয়ে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণার উদ্রেক করেছে।’

সম্প্রতি ডয়চে ভেলের সঙ্গে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের অনলাইন শোর সারসংক্ষেপ আলোচনার মাধ্যমেই আমার দীর্ঘ লেখাটি শেষ করব। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় আনিস-হারিসের সাজা, দেশ ছাড়া ও সম্প্রতি মওকুফের বিষয়ে মওকাসন্ধানীরা সমুচিত জবাব পাবেন এবং তাঁদের অন্তর্দৃষ্টির উন্মোচন হবে বলেই মনে করি।

আইনমন্ত্রী এই অনুষ্ঠানে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, আনিস-হারিসের মায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীয় বিবেচনায় তাঁদের দণ্ড মওকুফ করেছে। আইনমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রসঙ্গে তাঁর কাছে আসা ফাইলে আইনি মতামত দিয়েছেন। যেখানে মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ‘কোর্ট অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওরে ইন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট লেখা রয়েছে ৪০১ (১) ধারায় এ রকম সাজা মওকুফ করা যায়।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের দণ্ড মওকুফের প্রজ্ঞাপন আইনমন্ত্রীকে না পাঠানোর বিতর্কের বিষয়টিও পরিষ্কার করে আনিসুল হক বলেছেন, ‘রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী আমাকে প্রজ্ঞাপন পাঠানোর কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না। আইনমন্ত্রীর প্রজ্ঞাপন দেখতে হবে, এটার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবাদকর্মী

মন্তব্য