kalerkantho

শনিবার । ২১ ফাল্গুন ১৪২৭। ৬ মার্চ ২০২১। ২১ রজব ১৪৪২

বাংলা ভাষার উন্নতির সম্ভাবনা ও অন্তরায়

আবুল কাসেম ফজলুল হক

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



বাংলা ভাষার উন্নতির সম্ভাবনা ও অন্তরায়

ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার বিস্ময়কর উন্নতি সাধিত হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় (১৯০৫-১১) থেকে রাজনীতিতে ইংরেজির জায়গায় বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষা ব্যবহৃত হতে থাকে। আর রাজনীতি তখন মিলনায়তন ছেড়ে চলে আসে মাঠে-ময়দানে ও রাস্তায়। তখনই সূচিত হয় গণজাগরণ। রাজনীতিতে ইংরেজি নিয়ে গণজাগরণ সম্ভব হতো না। স্বদেশি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের ও জনসাধারণের মধ্যে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরাট উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আশা দেখা দিয়েছিল। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পরে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের কালেও বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের মনে জাতীয় জীবনে বড় কিছু অর্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা দেখা দিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে গোটা ভারতে বাংলা ভাষা ছিল অন্যতম প্রধান অবলম্বন। সেটা ছিল রেনেসাঁসেরও কাল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই সূচিত হয় আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। তারপর প্রতিবছর সংগ্রামী স্পৃহা নিয়ে সৃষ্টিশীল উপায়ে প্রতিবন্ধকতার পর প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে ঘটেছে স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। বাংলা ভাষায় রেনেসাঁসের স্পিরিট তখনো ক্রিয়াশীল ছিল। সরকারি প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ওই প্রতিটি আন্দোলনই ছিল বাংলা ভাষার, বাংলা সাহিত্যের ও বাংলা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্য প্রেরণাদায়ক। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে আমাদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ উন্নতির ধারায় চলবে, এটা সবাই আশা করেছিল। এই সময়ে বাংলা ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়েও শিক্ষিত সমাজে অভূতপূর্ব আশা দেখা দিয়েছিল। একজন লেখকের লেখায় দেখছি : ‘বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার, লালন করার এবং তাকে অন্তহীন শুভ পরিণামের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলার পূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশরই। এ ধারণাটি এখন ব্যক্তিগত, শ্রেণিগত ও সম্প্রদায়গত চেতনাকে অতিক্রম করে রাষ্ট্রগত ও জাতিগত চেতনায় এসে সুস্থির হয়েছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তিকে যাঁরা পরম কাঙ্ক্ষিত বিষয় বলে উপলব্ধি করেন, বাংলা ভাষার সাফল্যে তাঁদের সংশয় নেই।’—আজিজুল হক

১৯৭২ সালে এটাই বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজের প্রগতিশীল বিশ্বাসরূপে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এ বিশ্বাস ভেঙে যেতে থাকে ১৯৯১ সাল থেকে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের পরিচালনা গ্রহণ করে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন শুরু হওয়ার পরেই। বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ যেমন মার খেয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলা ভাষার উন্নতিও আর হচ্ছে না। বাংলা সমৃদ্ধ ভাষা। বাংলা ভাষার গোটা ইতিহাসেই দেখা যায় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এই ভাষা নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করেছে এবং বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। একসময় এমন ধর্মীয় বিধান প্রচলিত ছিল যে কেউ যদি রামায়ণ, মহাভারত ও অষ্টাদশ পুরাণ মানব ভাষায় আলোচনা করে, তাহলে সে রৌরব নরকে যাবে। শাস্ত্রকাররা প্রচার করতেন— ‘অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ। ভাষায়ং মানব : শ্রুত্বা বৌরবং নরকং ব্রজেৎ।’ ‘মানব ভাষা’ বলা হতো সংস্কৃত ভাষার বাইরে সব ভাষাকে, আর সংস্কৃত ভাষাকে বলা হতো ‘দেবভাষা’। বাংলায় শাস্ত্রানুবাদকারীদের তিরস্কার করে বলা হতো, ‘কৃত্তিবেসে, কাশীদেশে আর বাসুন ঘেঁষে, এই তিন সর্বনেশে।’ সংস্কৃত ছিল ধর্মানুশীলনের ও রাজকার্য পরিচালনার ভাষা। তুর্কি-পাঠান-মোগল শাসকদের কালে সংস্কৃতের জায়গায় ফারসিকে করা হয়েছিল রাজকার্য পরিচালনার ভাষা এবং ফারসি ও আরবিকে করা হয়েছিল জ্ঞান ও ধর্ম অনুশীলনের ভাষা। ধর্মানুশীলনে সংস্কৃতও ছিল। সমাজের উচ্চ শ্রেণিতে বাংলা ছিল অবজ্ঞাত ভাষা, সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আবদুল হাকিমের বিখ্যাত উক্তি— ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’

সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও লোকজীবনের অবলম্বন ছিল বাংলা ভাষা। লোকসাহিত্য ছিল, দরবারি সাহিত্যও ছিল। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব জীবনী সাহিত্য ও পদাবলি, অনুবাদ সাহিত্য ও রোমান্সকাব্য দরবারি সাহিত্যরূপেই বিকশিত হয়েছিল। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, চীন, ইরান, মিসর প্রভৃতি দেশের মধ্যযুগের রচনাবলির সঙ্গে বাংলা ভাষার মধ্যযুগের রচনাবলির তুলনা করলে বাংলা ভাষাকেও সমৃদ্ধ মনে হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে, পরাধীনতার মধ্যে, ইংরেজি ভাষার দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যে, বাঙালি বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের সব শাখায় সাধন করেছিল অসাধারণ উন্নতি। সেই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানকালে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর্যায়ে বাংলা ভাষার উন্নতি অব্যাহত ছিল।

কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দুই দশক যেতে না যেতেই অগ্রগতির সে ধারা ব্যাহত হতে থাকে। ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বাঙালি চরিত্রের নিকৃষ্টতা লক্ষ করে ১৯৭৩ সাল থেকেই কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি বলে আসছেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্ররূপে টিকে থাকার মতো

(Viable) নয়। তাঁরা জোর দিয়েছেন বাঙালি চরিত্রের নিকৃষ্টতায়। তাঁদের যুক্তি-মত কখনো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাঁরা অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নাগরিকত্ব নিয়েছেন এবং প্রায় সবাই তাঁদের সন্তানদের ওই সব রাষ্ট্রে নাগরিক করেছেন। আমি সব সময়, সব অবস্থায়ই বাঙালি চরিত্রের উন্নতি সম্ভব বলে মনে করেছি। আমি সব সময় মনে করেছি এবং এখনো মনে করি বাংলাদেশকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা যাবে। সে লক্ষ্যেই আমার চিন্তা ও কাজ। জাতীয় হীনতাবোধ বাংলাদেশের ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ক্ষমতাবান, ক্ষমতাবঞ্চিত সব মানুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। জাতীয় হীনতাবোধ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। ঘুমন্ত জনসাধারণকে জাগাতে হবে। অবস্থার উন্নতির জন্য যা কিছু করা দরকার, সবই আমাদের করতে হবে।

সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাস অভিমুখী করে তুলেছে। বড় দুই রাজনৈতিক দল জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের কথা না ভেবে দূতাবাসমুখী রাজনীতি নিয়ে চলছে। বাংলাদেশের সব প্রচারমাধ্যম ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বিবিসি রেডিওর অন্ধ অনুসারী হয়ে কাজ করেছে। বিরোধী দলগুলোও তাই করেছে। ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাহায্যের আবেদন নিয়ে ক্রমেই স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে সাহায্য চাইতে যান। তাঁরা চলে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যও কোনো কোনো নেতা নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের হেড অফিসে গিয়ে তদবির করেন। সাম্রাজ্যবাদী অর্থ সংস্থাগুলো ‘দাতা সংস্থা’ ও ‘উন্নয়ন সহযোগী’ নাম নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে যুক্ত হয়। উচ্চ ও উচ্চ মধ্য শ্রেণির লোকেরা সরকারি ও সরকারবিরোধী উভয় মহল তাদের ছেলে-মেয়েদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক করে চলছেন। এই ব্যক্তিরাই বাংলাদেশে রাষ্ট্রব্যবস্থার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্তৃত্বে আছেন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একদিকে আছে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ কাউন্সিল ও কেমব্র্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেল এবং অন্যদিকে আছে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নবপ্রবর্তিত ইংলিশ ভার্সন। এ সবই বাংলাদেশের ভূভাগে রাষ্ট্র গঠনের পরিপন্থী।

এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নতুন রেনেসাঁস ও তার ধারাবাহিকতায় নতুন গণজাগরণ সৃষ্টি করে, সেই সঙ্গে উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করে বাংলাদেশের জনগণ অবশ্যই বাংলাদেশকে নিজেদের প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলতে পারবে। জনগণ ঘুমিয়ে আছে বটে, তবে জাগবে। অভীষ্ট নেতৃত্বের জন্য অবশ্যই উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান কোনো দল চাইলেও নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্র উন্নত করতে পারে। নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। দলের চরিত্রই নেতৃত্বের চারিত্র। উন্নত চরিত্রের বৌদ্ধিক  (intellectual)  নেতৃত্বও লাগবে।

জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনে শিক্ষা খাতে সব রকম বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য পরিহার করতে হবে। প্রচলিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যসূচি, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নত করতে হবে। কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির জায়গায় অনুসন্ধিৎসামুখী, জ্ঞানমুখী পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। ইংলিশ ভার্সন বিলুপ্ত করতে হবে। বাংলাদেশে বিদেশি সরকার কর্তৃক পরিচালিত সব স্কুল বন্ধ করতে হবে। মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলতে হবে। সর্বজনীন কল্যাণে মূলধারার বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিয়ে উন্নত করতে হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। অনেকে বিশ্বমান অর্জনের কথা বলেন। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী কর্মনীতি নির্বিচারে অনুসরণ করার কথা বলেন। এটা ঠিক নয়। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য ও নীতি-বিধি সংস্কার করতে হবে। চলমান শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জাতি ও রাষ্ট্র গড়ে উঠছে না, উঠবে না।

বাংলা ভাষা উন্নত ভাষা। এর ভিত্তিতে আছে আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রিক বিরাট সম্ভাবনা। এই ভাষাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করে বাংলাদেশে রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের নাগরিক তৈরি না করে শুধু বিশ্বনাগরিক তৈরি করা করা কি ঠিক?

বাংলাদেশের উন্নতির জন্য ইংরেজি ও আরো কয়েকটি বিদেশি ভাষা শেখার ভালো ব্যবস্থা অবশ্যই বাংলাদেশে করতে হবে। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করে তা দিয়ে বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে হবে। যাঁরা জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক এবং পছন্দগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াা প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক, তাঁদের নেতৃত্বে ও পরিচালনায় বাংলাদেশ কখনো স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে গড়ে উঠবে না।

কেউ কেউ বলে থাকেন, এখন বিশ্বায়নের কাল, বাংলাদেশকে রাষ্ট্ররূপে গঠন করা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলো নানা কৌশলে এটা প্রচার করছে। আমার ধারণা, এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মত বাংলাদেশের জনগণের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশ্ব সরকার গঠিত হলেও জাতীয় সরকার থাকবে। বিশ্ব সরকার হবে জাতীয় সরকারগুলোর ঊর্ধ্বতন এক সরকার। তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকবে আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তা হবে জাতিসংঘের মতো। জাতিসংঘ বহুলাংশে অকার্যকর; বিশ্ব সরকার কার্যকর হতে পারে। রাষ্ট্রের ভেতরকার সব কাজ জাতীয় সরকারকেই করতে হবে।

বাংলাদেশে ৪৫টি জনগোষ্ঠীর ৪৫টি বিলীয়মান মাতৃভাষাকে রক্ষা করার জন্য এনজিওগুলো ও সরকার যে চেষ্টা চালাচ্ছে তা সফল হবে না। সরকারকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার মধ্যে সব জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সার্বিক উন্নতির ভালো পরিকল্পনা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। বাঙালি সন্তানদের মতো তাদের সন্তানদেরও রাষ্ট্রভাষা এবং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে যেকোনো পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববার সময় চলে যাচ্ছে। সময় থাকতে চিন্তা ও কাজ করতে হয়, সময় চলে গেলে সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। আজকের মূল প্রশ্ন— বাংলাদেশকে আমরা রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলব কি তুলব না। যদি সিদ্ধান্ত হয় গড়ে তুলব, তাহলে সময় নষ্ট না করে কাজ আরম্ভ করতে হবে। রাষ্ট্র গঠনের জন্য চেষ্টা লাগবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্র গঠিত হয় না। বাংলাদেশের জনগণের চেতনায় নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের মহান লক্ষ্য দরকার।

বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার এবং তার জন্য বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করার পথে বিরাজিত অন্তরায়গুলো দূর করতে হবে। তার জন্য নতুন সংকল্প ও সংকল্প অনুযায়ী নতুন কর্মধারা দরকার।

 

লেখক : প্রগতি-প্রয়াসী চিন্তক, আহমদ শরীফ অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য