kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

অনলাইন থেকে

মিয়ানমারকে সংকটমুক্ত করতে যা প্রয়োজন

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাল বেলুন এবং রিবনে—প্রতিরোধের নীরব প্রতীকে শুরু হয়েছিল মিয়ানমারের ক্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। এরপর এলো সসপ্যান ও থালাবাটির বাজনা। এগুলো প্রথাগতভাবে শয়তান তাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। ১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা মিলিয়ে যাওয়ার যখন শুরু, তখন রাস্তায় প্রথম বিক্ষোভের শুরু। সারা দেশে বড় বড় নগর ও শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। এখন প্রতিবাদের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। প্রচুরসংখ্যক লোকের অংশগ্রহণে এবং সাহসিকতার সঙ্গে তা ঘটছে; তাতে স্বতঃস্ফূর্ততা, আবেগের অভাব নেই এবং সেটি বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন।

ইচ্ছাশক্তির এক মহাকাব্যিক যুদ্ধ চলছে মিয়ানমারে। দুনিয়াবাসী এটিকে অবজ্ঞা করতে পারে না। বিভাজনরেখার এক পাশে রয়েছেন তরুণ, ছাত্র, শিক্ষক, তেল স্থাপনা ও কারখানার কর্মী, বৌদ্ধ ভিক্ষু, গৃহকর্ত্রী, শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী, নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সরকারি কর্মচারীরা; তাঁদের উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষা (যা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত) ক্যু লিডার অং মিন হ্লাইংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বার্থপর বাসনার কাছে, ইতিহাস বিস্মৃতির প্রবণতার কাছে, কর্তৃত্বপরায়ণতার কাছে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

বিভাজনরেখার অন্য পাশে রয়েছেন জেনারেলরা। তাঁরা মিয়ানমারের ডি-ফ্যাক্টো শাসক, তাঁরা স্বনিয়োজিত জাতীয় অভিভাবক। আর রয়েছেন উচ্চমার্গীয় ইকোনমিক পাওয়া ব্রোকাররা। ২০১৫ সালে তাঁরা পেছনে হটলেও অং সান সু চি এবং তাঁর দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসিকে রাজনীতির সম্মুখসারির ভূমিকা নিতে দিলেও উর্দি পরা লোকটি সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন সেই সংবিধানের মাধ্যমে, যা উর্দিধারীরা প্রণয়ন করেছিলেন। তাঁরা যা সবচেয়ে ভালো করতে পারেন, তা হলো নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন, ষণ্ডামার্কা আচরণ এবং অসততা ও অর্থগৃধ্নুতা।

এই যুদ্ধ কে ক্ষমতায় আছে সে জন্য নয়, যদিও অং মিন হ্লাইং দাবি করেছেন যে গত নভেম্বরের নির্বাচনে এনএলডির ভূমিধস বিজয় একটি প্রতারণা, একটি জালিয়াতি। তবে তাঁর এ দাবি একটি অসম্ভব ধারণা। আসলে লড়াইটি হলো কম্পিটিং ভিশনের, একটি দেশের জন্য ভিশন, যদিও দেশটি প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদে পরিপূর্ণ। এর পরও বলা যায়, দেশটিকে অপরাধী মানসিকতায় অপশাসন করা হয়েছে, বাজেভাবে শোষণ করা হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে নৃতাত্ত্বিক ইস্যুতে দেশটিকে তার নিজের বিরুদ্ধেই দাঁড় করানো হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই একই জেনারেলরা ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন।

কী করে এই যুদ্ধ সম্পন্ন করা হচ্ছে, সেটি এক উদ্বিগ্নতার নাম। অং সান সু চি ও অন্য নেতৃস্থানীয় রাজনীতিকরা গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন। সিভিল সোসাইটির ৩৫০ জন নেতাও গ্রেপ্তার। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মানুষের মনে সন্ত্রস্ত দশা বাড়ছে। কারণ সিকিউরিটি স্কোয়াডগুলো লোকজনকে টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে গভীর রাতে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে সংকুচিত করা হয়েছে, কারফিউ জারি করা রয়েছে, প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশের আচরণ আতঙ্কজনকভাবে কঠোর হচ্ছে বলে মনে হয়। এই পথের শেষে কোনো বিয়োগান্ত ঘটনাই অপেক্ষা করছে হয়তো।

মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ কী হবে না হবে শেষ পর্যন্ত সে চিন্তা মিয়ানমারের জনগণেরই। এ কথার মানে এই নয় যে একটি চলমান বিশ্বের কোনো ঘটনা মিয়ানমারের ঘটনাবলিকে প্রভাবিত করতে পারে না। জাতিসংঘ হিউম্যান রাইটস কমিশন, যদিও চীন ও রাশিয়া তাতে আপত্তি তুলেছে—এক প্রস্তাবে বলেছে, অং সান সু চি ও আটককৃত অন্যদের মুক্তি দিতে হবে এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।

বাস্তবতার নিরিখে যদি ভাবেন, তাহলে আরো অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ জান্তা সরকার নিশ্চিতভাবেই জাতিসংঘকে অবজ্ঞা করবে, যেমন অতীতে তারা করেছে। ক্যুতে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর পেনাল্টি আরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে রক্ষিত তাদের সম্পদ জব্দ করতে জো বাইডেনের ত্বরিত পদক্ষেপ একটি উদাহরণ। এখন যা দরকার, তা হচ্ছে বড় আকারের পদক্ষেপ—আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অবরোধ আরোপ করতে হবে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে মিলিটারির বিরুদ্ধে সতর্ক হয়ে এবং টার্গেট করে পদক্ষেপ নিতে হবে, তাদের বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোকে টার্গেট করতে হবে, একই সঙ্গে সার্বিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।

এসব করতে হলে চীনকে (মিয়ানমারের প্রতিবেশী, বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী) অবশ্যই পক্ষে আনতে হবে। বেইজিং এই ক্যুকে নিন্দা জানাতে অস্বীকার করেছে; কিন্তু তার হাতেই চাবিকাঠি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা উচিত চীনকে বোঝানোর জন্য, যাতে তারা জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে রাজি হয়। এই চাপের উদ্দেশ্য কী! এর উদ্দেশ্য সব রাজনৈতিক বন্দির আশু মুক্তি এবং মিয়ানমারকে পথে ফিরিয়ে আনার জন্য সব পক্ষের আলাপ-আলোচনা।

অন্যদের চেয়ে চীন সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে, যদি ভবিষ্যতের জন্য মিয়ানমারের যুদ্ধ সহিংস হয়ে ওঠে এবং যদি দেশটি স্থায়ীভাবে অস্থিরতার মধ্যে পড়ে যায়। বেইজিং এরই মধ্যে তার দরজার কাছেই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র পেয়েছে—উত্তর কোরিয়া। আরো একটি অবশ্যই তারা চায় না। কিন্তু সমস্যা যদি ঘনীভূত হয়, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের, আজ যারা সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়ছে। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের আরেকটি বিপর্যয় কাম্য নয়, সেটি হতে পারে একটি টার্নিং পয়েন্ট। চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোকে এই সংকট থেকে মিয়ানমারকে বের করে আনার জন্য অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সূত্র : দ্য সানডে অবজারভার, ইউকে

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা