kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

যত্রতত্র ছাত্রী হোস্টেল নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যত্রতত্র ছাত্রী হোস্টেল নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত

‘নজরদারি নেই, ইচ্ছামতো ছাত্রী হোস্টেল বাণিজ্য’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা অনেকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সেখানে ঢাকা শহরে গড়ে ওঠা প্রাইভেট হোস্টেলের অব্যবস্থাপনা ও দুরবস্থার কথা ফুটে উঠেছে। কতটা অমানবিকভাবে আমাদের মেয়েরা এমন সব হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করছে, আমরা তা প্রতিবেদন পড়ে অনুধাবন করতে পারি। প্রতিবেদনটি যদিও ঢাকা শহরকেন্দ্রিক; কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরের চিত্র প্রায় একই রকমের। বিভাগীয় শহর এবং যেসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষার অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানেও ছেলে-মেয়ে উভয়কেই প্রাইভেট হোস্টেল কিংবা মেসে থেকে লেখাপড়া করতে হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য—প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ছুটছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ঢাকা রাজধানী বলে আগে থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। সরকার যখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন স্থানের বাধ্যবাধকতা না থাকায় উদ্যোক্তারা রাজধানী ঢাকাকেই বেছে নেন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য। ফলে শুরুর কারণেই হোক, ভালো ভালো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকায় হওয়ায় ঢাকা শহরে শিক্ষার্থীদের চাপ অনেক বেশি। তারপর রয়েছে লেখাপড়া শেষে চাকরি খোঁজার জন্য ঢাকায় অবস্থান করা।

উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ বাড়ে। আর তা যদি সাধ্যের মধ্যে হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাও এখন অনেকের হাতের নাগালে এবং সাধ্যের মধ্যে। অধুনা আমাদের শিক্ষিত সমাজে এক কিংবা দুই সন্তানবিশিষ্ট পরিবারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ার কারণে শিক্ষার প্রতি বিনিয়োগে অভিভাবকদের কষ্ট বেশি হচ্ছে না। এ ছাড়া রয়েছে ভর্তির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মানবহিতৈষী ব্যক্তিদের শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক অনুদান। পর্যাপ্ত প্রণোদনা থাকার কারণে সন্তান ছেলে কি মেয়ে, তা অনেকে বিবেচনায় আনেন না। ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে অনুপাত কমতে শুরু করছে। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেয়েরা ছুটছে শহরে উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও অন্যান্য কাজে। স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হচ্ছে আবাসিক সংকট। কেননা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা কিছুটা থাকলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন নেই। নব্বইয়ের দশকে কর্মজীবী মহিলাদের জন্য ঢাকার নীলক্ষেতে সরকারি একটি হোস্টেল ছিল। তখন সেখানে প্রচণ্ড চাপ ছিল। এখন হোস্টেলের সংখ্যা বেড়েছে কি না জানি না, তবে প্রাইভেট হোস্টেলের কমতি নেই। অনেক অলিগলিতে এখন পাওয়া যায়। আমাদের শিক্ষার্থীদের ভরসা এসব হোস্টেল।

আমরা দ্রুত আইন পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার অনুমোদন দিচ্ছি। শিক্ষার্থী ভর্তি করছি; কিন্তু কখনো ভাবছি না শিক্ষার্থীরা কোথায় থাকবে, বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীরা। আমাদের দায় যেন শিক্ষার্থী ভর্তি করানো, তাদের পড়াশোনা করানো এবং সার্টিফিকেট দিয়ে বের করে দেওয়া। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলের ধারণা আমার জানা নেই। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করে; কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ভর্তুকি দেওয়া হয় না। এ কথা বিশ্বাসযোগ্য যে একটি ছেলের পক্ষে মেস কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থাপনায় থাকা যতটা নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত, একটি মেয়ের পক্ষে ততটা নিরাপদ নয়। মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টি যেমন জড়িত, তেমনি তাদের রয়েছে বিশেষ চাহিদা। এগুলো পূরণের জন্য তাদের একটি নিরাপদ ও সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসনব্যবস্থা দরকার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ কারো পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা আমাদের চোখে পড়ে না। ফলে শুধু লাভের আশায় এবং চাহিদাকে লক্ষ্য করে প্রাইভেট হোস্টেল গড়ে উঠেছে। আমাদের সীমাদ্ধতার সুযোগ নিয়ে এসব হোস্টেল গড়ে উঠেছে। আর শিক্ষার্থীরা অসহায়ের মতো নিরুপায় হয়ে এসব হোস্টেলে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

সরকারের পক্ষে সব শিক্ষার্থীর আবাসিক সমস্যা সমাধান করা হয়তো সম্ভব নয়; কিন্তু প্রাইভেট হোস্টেলগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নীতিমালার আওতায় আনা অসম্ভব নয়। তাদের যদি নীতিমালার আওতায় আনা যায় এবং তা কঠোরভাবে মানতে বাধ্য করা যায়, তাহলে যথেচ্ছভাবে প্রাইভেট হোস্টেলের নামে ব্যবসা করা বন্ধ হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কেননা তারা নিরাপত্তাহীন থাকলে তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে হবে। বিভিন্ন প্রাইভেট কম্পানি কর্তৃক দক্ষ নিরাপত্তাকর্মীদের এসব জায়গায় নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের মেয়েদের অংশগ্রহণ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। যে কষ্ট করে একটি ছেলে একসময় এবং এখনো পড়াশোনা করছে, ঠিক একই কষ্ট করে এখন একটি মেয়েও মেস, ভাড়া বাড়ি, সাবলেট কিংবা প্রাইভেট হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে। পক্ষান্তরে মেয়ে হিসেবে তারা আলাদা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। লেখাপড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ ও ইচ্ছায় কোনোক্রমেই আবাসিক সমস্যা কিংবা এর নিরাপত্তাহীনতার জন্য ছেদ যেন না হয়, তার দিকে নজর দিতে হবে। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাকে মোকাবেলা করে তাদের আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রাইভেট হোস্টেল নিয়ে সঠিক নীতিমালা এবং তার বাস্তবায়নই পারবে মেয়েদের ভালো শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অংশীদার হতে।

 

 লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা