kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭। ৪ মার্চ ২০২১। ১৯ রজব ১৪৪২

ছাত্র আন্দোলন, মধ্য ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ : কারাগারে কিছুদিন

সাইফুল হাসান চৌধুরী

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ছাত্র আন্দোলন, মধ্য ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ : কারাগারে কিছুদিন

সবার হয়তো স্মরণে আছে, ৩৯ বছর আগে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর ওই বছরের শেষ দিকে ১৪টি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন একত্র হয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করলে স্তিমিত হয়ে পড়া ছাত্ররাজনীতি আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এ সময় সংগ্রাম পরিষদ তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. আব্দুল মজিদ খান প্রণীত শিক্ষানীতি প্রত্যাখ্যান করে এটি বাতিলসহ বন্দি ছাত্রদের মুক্তি, দমননীতি বন্ধ এবং গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে।

১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা দলে দলে মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কলেজজীবনে ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলাম। উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নকালে আমি চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলাম। ফলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঘেরাও কর্মসূচিতে শিকড়ের টানে যুক্ত হয়ে গেলাম। সকাল ১১টা নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছাত্রসমুদ্রে পরিণত হয়। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ছাত্র-ছাত্রীরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় সচিবালয়ের দিকে। কার্জন হল পার হয়ে শিক্ষা ভবনের কাছাকাছি যেতেই মিছিলটি পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়। ছাত্ররা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই শুরু হয় লাঠিপেটা। ছাত্ররাও পুলিশের দিকে পাল্টা ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করে। লাঠিপেটা করে যখন ছাত্রদের ঠেকানো যাচ্ছিল না, তখন পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়তে শুরু করে। এতেও ছাত্ররা দমে না গিয়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ আরো মারমুখী হয়ে ওঠে এবং এক পর্যায়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে। এরই মধ্যে প্রচুর ছাত্রের হতাহত হওয়ার খবর ক্যাম্পাসে আসতে শুরু করে। দুপুর নাগাদ ছাত্ররা ঢাকা মেডিক্যাল থেকে পুলিশের গুলিতে নিহত একজন ছাত্রের লাশ (জাফর অথবা জয়নালের) ক্যাম্পাসে নিয়ে আসে। বিকেলে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে ডাকসুর তৎকালীন সহসভাপতি আক্তারুজ্জামান তাঁর বক্তৃতায় ‘আমরা এ লাশ নিয়ে মিছিল করে বায়তুল মোকাররমে যাব, পথে যদি কোনো বাধা আসে, তবে আমরা তার দাঁতভাঙা জবাব দেব’ বলার পরপরই একটি গুঞ্জন শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি পুলিশের এক বিরাট গাড়িবহর কলা ভবনের দিকে এগিয়ে আসছে। তখন সেখানে অবস্থান অনিরাপদ মনে করে দ্রুত কলা ভবনে ঢুকলাম। ভাবলাম, আমার ডিপার্টমেন্টে যেতে পারলে মোটামুটি নিরাপদ। কিন্তু ঢুকতে গিয়ে কলাপসিবল গেটটি বন্ধ পেলাম। নিরুপায় হয়ে বাইরে বেরোতে গিয়ে দেখি কলা ভবন এলাকা পুলিশে ছেয়ে গেছে। বিকল্প চিন্তায় কলা ভবনের সামনের অংশে অবস্থিত কলা অনুষদের ডিন অফিসের একটি কক্ষে ঢুকে পড়লাম। এর মধ্যে পুলিশও ওই কক্ষে ঢুকে সেখানে বেধড়ক লাঠিপেটা শুরু করে। লাঠির আঘাতে নিমিষে কয়েকজন ছাত্রকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখলাম। উপায়ান্তর না দেখে আমি কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এলাম; কিন্তু ততক্ষণে পিঠে, মুখে এবং পায়ে কয়েক ঘা পড়ে গিয়েছে। পার্শ্ববর্তী ‘মলে’ যাওয়ার গেটও ততক্ষণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশে পরিপূর্ণ কলা ভবন এলাকায় কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করে এক পর্যায়ে ‘মল’ সংলগ্ন প্রায় চার-পাঁচ ফুট উঁচু দেয়ালের ওপর উঠে গেলাম। ভেবেছিলাম দেয়ালের ওপারে যেতে পারলে অনায়াসে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া যাবে। কিন্তু দেয়ালের ওপর উঠে মনে হলো, ঢাকার সব পুলিশ ওপারে যেন সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। খামাখা দৌড়াদৌড়ি করে শক্তি অপচয় না করাই বুদ্ধিমানের কাজ বিবেচনা করে দেয়াল থেকে নেমে পড়লাম। একজন পুলিশ কর্মকর্তা দৌড়ে এসে আমাকে পাকড়াও করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে উঠিয়ে দিল।

বাসের ভেতরে থাকা একজন প্রবীণ কনস্টেবল আমাকে একনজর দেখে হাত ঘড়িটি খুলে পকেটে রাখতে বললেন। এই অপ্রত্যাশিত নির্দেশে ভ্যাবাচেকা খেয়ে ঘড়িটি খুলে পকেটে রাখলাম। খানিক বাদে বাস থেকে নামিয়ে পাশে থাকা একটি পিকআপে তোলা হলো। পিকআপে বসে দেখলাম আমার পাশেই বসে আছেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক খ ম জাহাঙ্গীর (পরবর্তী সময়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন)। একজন বড় ছাত্রনেতাকে পাশে পেয়ে মনে একটু জোর পেলাম। আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো রমনা থানায়। সন্ধ্যার পর থানায় যারা আসছিল তাদের বেশির ভাগই রক্তাক্ত অবস্থায় ছিল। জানতে পারলাম গ্রেপ্তারকৃতদের অনেকেরই মানিব্যাগ, হাতঘড়ি খোয়া গেছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম কেন আমাকে ওই প্রবীণ পুলিশ সদস্য ঘড়ি পকেটে ঢোকাতে বলেছিলেন। রাতে থানা থেকে ভাত-ডাল দেওয়া হলো। মাঝরাতে খ ম জাহাঙ্গীরকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। রমনা থানার দুটি কক্ষে গাদাগাদি করে শখানেক ছাত্রকে রাখা হয়েছিল। রাতে শোয়া দূরের কথা, পা মেলে বসার মতো জায়গাও ছিল না।

পরদিন দুপুরে থানা থেকে খাবার দেওয়া হলে কক্ষসংলগ্ন টয়লেটের দুরবস্থা দেখে সেটি না খাওয়াই সমীচীন বিবেচনা করলাম। এভাবে থানায় দুটি দিন কেটে যায়। ১৭ তারিখ সকালে আমাদের নেওয়া হয় কোর্টে। সেখান থেকে কমবেশি ৭০ জন ছাত্রকে দুপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় নাজিমউদ্দিন রোডস্থ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ছাত্রদের বেশির ভাগই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। বুয়েটের একজনসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও কিছু ছাত্র ছিল। কেন্দ্রীয় কারাগারে যাওয়ার পর অন্তত সেখানকার ‘খোলামেলা’ পরিবেশ আমাদের কিছুটা ভালো লাগল। দুপুরে ডাল-রুটি খেতে দেওয়া হলো। বিকেলে কারাগারের ‘৫ খাতার’ নিচের তলার পাশাপাশি দুটি ওয়ার্ডে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। শুনেছি, জেলখানার প্রতিটি বিল্ডিংয়ের জন্য একটি করে খাতা (রেজিস্টার) মেইনটেন করা হয়। বিল্ডিংগুলোর নামও খাতার নামানুসারে নির্ধারিত হয়। তাই ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের নাম ‘৫ খাতা’। জনপ্রতি তিনটি করে কম্বল, একটি অ্যালুমিনিয়ামের থালা এবং একটি বাটি দেওয়া হলো। তিনটি কম্বলের একটি ফ্লোরে বিছানোর জন্য, একটি ভাঁজ করে বালিশের মতো ব্যবহারের জন্য এবং অপরটি গায়ে দেওয়ার জন্য। কারাগারে একটি কথা চালু আছে, ‘থালা বাটি কম্বল—জেলখানার সম্বল।’ সন্ধ্যায় জেল হাসপাতালের ডাক্তার এলেন। গ্রেপ্তারকৃত সব ছাত্রই কমবেশি আহত ছিল। হাসপাতালে স্থান সংকুলান না হওয়ায় সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে ওয়ার্ডেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলো এবং এই ব্যবস্থা এক সপ্তাহ কার্যকর থাকবে বলে জানানো হলো। আমাদের জন্য মেডিক্যাল ডায়েট হিসেবে সকালে দুধ-পাউরুটি, দুপুরে সবজি-ভাত-ডাল, বিকেল ৩টায় ডিম-চা এবং ৫টায় ভাতের সঙ্গে মাছ অথবা মাংস বরাদ্দ ছিল। সন্ধ্যার আগে বন্দিদের লকআপে যাওয়ার নিয়ম থাকায় রাতের খাবার বিকেলেই পরিবেশন করা হতো।

কারাগারে প্রতিটি বিল্ডিংয়ের সামনে প্রশস্ত আঙিনা ছিল, যেখানে বন্দিরা সন্ধ্যায় লকআপে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতে পারত। আঙিনার এক প্রান্তে ছিল গোসল করার জায়গা। সেটি অদ্ভুত ধরনের। আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ ফুট লম্বা একটি প্ল্যাটফর্মের দুই পাশে থাকা চ্যানেলের এক প্রান্ত থেকে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে পানি ছাড়া হতো। কারাবাসীরা চ্যানেলের পাশে লাইন ধরে বসে এই পানিতে গোসল করত। এখন কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরিত কেন্দ্রীয় কারাগারে নিশ্চয় উন্নততর ব্যবস্থার সংযোজন হয়েছে।

কারাগারে আমরা সিগারেটের প্যাকেটের উল্টো দিকে কলম দিয়ে এঁকে কার্ড বানিয়ে ‘স্পেড ট্রাম্প’ খেলতাম। বিকেলে প্যান্ট-শার্ট পরে আঙিনায় হাঁটতাম। এ সময় কারাগারসংলগ্ন ব্যস্ত নাজিমউদ্দিন রোডের গাড়ির হর্ন, রিকশার ঘণ্টা, মানুষের কোলাহল শুনে এবং আশপাশের ভবনের ছাদে নারী-পুরুষের বৈকালিক পদচারণ দেখে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠত। কারারক্ষীরা কারাবন্দিদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দিনে একাধিকবার বন্দিদের আঙিনায় এনে লাইনে বসিয়ে গুনে দেখত। এটিকে বলা হতো ‘গুনতি’। সকাল ৬টায় যে গণনা হতো তাকে বলা হতো ৬-এর গুনতি। এভাবে ৯-এর গুনতি, ১২-এর গুনতি এবং অন্যান্য সময়ের গুনতি হতো। আমাদের অবশ্য কারারক্ষীরা ওয়ার্ডে গিয়ে গুনে আসত। ১৯৮৩ সালের এই গুনতি পদ্ধতি এখনো বহাল আছে কি না, জানি না। ওয়ার্ডে আমাদের দেখাশোনা করার জন্য কয়েকজন পুরনো কয়েদি নিয়োজিত ছিল, যাদের ‘মেট’ বলে ডাকা হতো। মেটদের কাছ থেকে কারাগারের নানা গল্প শুনতাম।

পুরনো কারাবন্দিদের কারো কারো কাছে রেডিও ছিল। আমরা বিবিসি, ভোয়া শুনতাম। মধ্য ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং হুলিয়া, গ্রেপ্তার, নির্যাতনের মাধ্যমে এর বিস্তার প্রতিহত করা হচ্ছিল, সে খবর আমরা বিদেশি গণমাধ্যমের সাহায্যে জানতাম। এরই মধ্যে আমরা কারাগারের পরিবেশের সঙ্গে মোটামুটি খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম। মাঝেমধ্যে সম্ভাব্য সাজার দুশ্চিন্তা মনকে দুর্বল করে ফেললেও কৃতকর্মের জন্য একটা পুলক অনুভূত হতো।

দেখতে দেখতে আরো কটা দিন কেটে গেল। দিনটি ছিল ৮ মার্চ ১৯৮৩। সন্ধ্যার পর একজন কারা কর্মকর্তা এসে আমাদের মধ্যে ২০ জনের একটি তালিকা পাঠ করে লকআপ থেকে বেরিয়ে আসতে বললেন। কানাঘুষা শোনা গেল, আমাদের সম্ভবত ঢাকার বাইরে কোনো কারাগারে স্থানান্তর করা হতে পারে। এক অজানা আশঙ্কায় মনটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। এ সময়টায় কারাগারের এক কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে গল্প করে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

আনুমানিক রাত ৯টা নাগাদ সব আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে আমাদের মুক্তির বারতা এসে পৌঁছাল। কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে গচ্ছিত আমার কিছু টাকা এবং ঘড়ি ফেরত নিয়ে (এগুলো কর্তৃপক্ষ কারাগারে ঢোকার সময় তাদের জিম্মায় রেখেছিল) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের লৌহ কপাট দিয়ে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন এক অনাবিল আনন্দে মনটা নেচে উঠল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নিলাম। ঘড়িতে তখন রাত ১১টা। কালক্ষেপণ না করে একজন কারাসঙ্গীসহ দ্রুত রিকশায় চেপে বসলাম। আজ রাতে নিকটবর্তী কোনো আত্মীয় বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই। রাত ১২টা থেকে আবার কারফিউ শুরু হবে।

লেখক : পরিচালক (জনসংযোগ), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা