kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

বিতর্কিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিতর্কিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি

আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৬ সালের এই দিন বাংলাদেশে ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন বিরোধী দলগুলোর বর্জন ও প্রতিরোধের মুখে অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসন লাভ করে, বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল এই সংসদে ছিল না। ফ্রিডম পার্টির নামে কর্নেল ফারুক (অব.) একটি আসন নেন, ১০ জন স্বতন্ত্র সদস্য বিজয়ী বলে ঘোষিত হন। ১০টি আসনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। একটি আসন আদালতের নির্দেশে স্থগিত ছিল। এই নির্বাচনটি বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এক কলঙ্কের ছাপ রেখেছিল। অন্যদিকে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিল তাদের অংশগ্রহণে সংসদে আনয়ন ব্যতীত নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণায় অনড় থাকে। বিএনপির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় থাকায় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও গোটা ১৯৯৫ সাল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সংসদ ও সংসদের বাইরে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। বিরোধী দল সংসদ থেকে পদত্যাগও করে। তার পরও খালেদা জিয়া পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাব তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে রাজি হননি। সে কারণে দেশে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে বিরোধ সৃষ্টি হয় সেটি নিরসনের জন্য কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফান ঢাকায় এসে মধ্যস্থতা করার মাধ্যমে নিষ্পন্নের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় দেশব্যাপী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন আরো জোরদার হয়। বিএনপি জনপ্রিয়তা হারায়। এরপর বিএনপি এককভাবে বিচারপতি এ কে এম সাদেকের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ যেকোনো মূল্যে অনুষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেয়। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন শুধু বর্জনই করেনি, প্রতিহত করতে রাস্তায় নামে। নির্বাচনে যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাঁদের কেউই তেমন কোনো প্রচারে অংশগ্রহণ করেননি। নির্বাচনের দিন অনেক জায়গায় ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ ভোটারদের তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। এর পরও নির্বাচনে ২১ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। বস্তুত ওই দিন ভোটকেন্দ্রে বিএনপির দলীয় ভোটাররাও আতঙ্কিত হওয়ার কারণে ভোট দিতে উপস্থিত হননি। বিভিন্ন কেন্দ্রে সিল মারার দৃশ্য পরদিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এভাবেই ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্নের ব্যবস্থা করা হয়। নির্বাচনটি সব মহলের কাছে শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, ১৬ তারিখ থেকে দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ার দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। খালেদা জিয়া তখন ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল উত্থাপনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। কিন্তু আন্দোলন দেশব্যাপী আরো জোরদার হতে থাকায় ২৪, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। এই অবস্থায় সরকার দ্রুত সংসদ অধিবেশন ডাকার উদ্যোগ নেয়। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পরামর্শে ১৯ মার্চ সংসদ অধিবেশন রাষ্ট্রপতি আহ্বান করেন। উক্ত সংসদে তত্ত্বাবধায় সরকারের বিল উত্থাপন করা হয়। এই সংসদের স্থায়িত্ব ছিল চার কার্যদিবস। তার পরও বিরোধী দলের আন্দোলন রাস্তায় প্রশমিত হয়নি। এরপর ৩০ মার্চ সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে ষষ্ঠ সংসদ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারও বিদায় নেয়।

১৯৯৩-৯৪ সালে যখন রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা সংসদ ও রাজপথে উচ্চারণ করেছিল, তখন সাধারণ মানুষের কাছে এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনে বিএনপি ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে বিরোধীদলীয় প্রার্থীর বিজয় ছিনিয়ে নেয়। ওই নির্বাচনের আয়োজন দেখতে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ রউফ মাগুরা থেকে পালিয়ে আসেন। এ ধরনের আরো কয়েকটি উপনির্বাচন দেশে সম্পন্ন হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়।

১৯৯৪ সালেই আওয়ামী লীগ সংসদে সাংবিধানিক পরিবর্তন তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার একটি রূপরেখা উপস্থাপনের চেষ্টা করে। বিএনপির মিত্র দল জামায়াতে ইসলামীও কেয়ারটেকার সরকারের অধীন নির্বাচন করার দাবি করে। দাবি দুটি প্রায় অভিন্ন হওয়ায় দেশে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দল যার যার অবস্থান থেকেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন গড়ে তুলতে শুরু করে। বিষয়টি নিয়ে যদি খালেদা জিয়া এবং বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতারা সংসদে খোলামেলা আলোচনা করতেন, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে সংসদের বাইরে আন্দোলন করার কোনো প্রয়োজন হতো না। কিন্তু খালেদা জিয়া এবং বিএনপির শীর্ষ নেতারা এ ধরনের কোনো বিল সংসদে উত্থাপন করতে বিরোধী দলকে সুযোগ দিতে রাজি ছিলেন না। বিরোধী দলগুলো ১৯৯৪ সাল থেকে একের পর এক হরতাল, অবরোধ, জনসমাবেশ ইত্যাদি জোরদার করতে থাকে। জনসাধারণের মধ্যে তখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে থাকে। কিন্তু খালেদা জিয়া কেন বিষয়টি গ্রহণ করছেন না সেটি অনেকের কাছেই বোধগম্য হয়নি।

১৯৯২ সালে জামায়াতপ্রধান গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে আন্দোলন সূচিত হয়, তাতে জামায়াত ও বিএনপির ঘনিষ্ঠতা দৃশ্যমান হয়। এবং গোলাম আযমকে নাগরিকতা প্রদানের ক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট ছিল। তার পরও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন কৌশলে বিএনপির ঐক্য থেকে সরে গিয়ে রাস্তার আন্দোলনে যুক্ত হয়। খালেদা জিয়া কোনো অবস্থায়ই পঞ্চম জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল উত্থাপন আলোচনায় সম্মতি দেননি। কিন্তু সংসদ তত দিনে সব বিরোধী দলের আসনশূন্যতায় অর্থহীন হয়ে পড়ে। সেই অবস্থায়ও তিনি অনড় থাকেন এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ তারিখে সব রাজনৈতিক দলের বর্জন ও প্রতিহত করার ঘোষণার মুখেও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন। সেই নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ফ্রিডম পার্টি ব্যতীত অন্য কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। সেই সংসদ মাত্র চার কার্যদিবস শেষ করতে পেরেছিল। এই সংসদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি রূপরেখা বিএনপি উত্থাপন করে এবং সেটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন।

দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে একসময় যেমন ব্যাপক জনসমর্থন সৃষ্টি হয়েছিল, এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে দেশে ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো নির্বাচন এবং স্বল্পকালীন সংসদ ও সরকার ব্যবস্থা তৈরি হয়। যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি সরকারের পছন্দমতো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই ২০০৬ সালে চরম দুর্বলতা প্রকাশ করায় এর প্রতি আর নতুন করে কোনো আবেগ বা সমর্থন ব্যাপকভাবে দানা বাঁধতে দেখা যায় না।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা