kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

ট্রাম্প যেভাবে ফিরে আসতে পারেন এবং বাইডেনের করণীয়

জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড

২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এটা যদি কোনো হরর সিনেমা হতো; ঈশ্বর জানেন, গত চারটা বছর একই রকম মনে হতো। আমরাও জানতে পারতাম ভবিষ্যতে কী ঘটবে। আমরা সিনেমার সেই পর্যায়ে থাকতাম, যেখানে দানব দৃশ্যত মারা যায়। নায়ক তখন ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বেঁচে যাওয়া লোকদের সান্ত্বনা দেয় এবং সাময়িকভাবে শান্ত অবস্থা ফিরিয়ে আনে। এই দৃশ্য দর্শকদের শুধু একটুখানি নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবে। কারণ দৈত্য আবার নড়েচড়ে উঠবে এবং মৃত্যু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার শেষ থাবাটি বসিয়ে দেবে।

এমন একটি সিনেমায় স্থির উপস্থিতি হিসেবে জো বাইডেনকে নিঃসন্দেহে ভালো কাস্ট করা হয়েছে, যিনি জঞ্জাল পরিষ্কার করতে এসেছেন। তবে ভয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর শেষ প্রকাশ্য বিবৃতিতে সেই হুমকিটা দিয়ে রেখেছেন, ‘আমরা কোনো না কোনো রূপে ফিরে আসব।’

এটা বিবেচনায় নিতে হবে যে ট্রাম্প ৮২ শতাংশ রিপাবলিকানদের সমর্থন নিয়ে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করেছেন। এখন তাঁর প্রত্যাবর্তন যাতে কখনোই না ঘটে তা নিশ্চিত করার একটি মাত্র উপায় আছে। সেটা হচ্ছে ক্যাপিটলে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার অভিযোগে ট্রাম্পকে সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করা। এ জন্য ১৭ জন রিপাবলিকানসহ ৬৭ জন (দুই-তৃতীয়াংশ) সিনেটরকে ভোট দিতে হবে, তাতে ট্রাম্পের সরকারি পদে ফিরে আসা চিরতরে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। এমন একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সিনেটে রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাকোনেলের বক্তব্যে। তবে তাঁর প্রতি ঠিক ভরসা রাখা যায় না। কারণ সিনেটে অভিশংসনের বিচারটি বিলম্বিত করার আহ্বান তিনিই জানিয়েছিলেন, যাতে ট্রাম্পের মেয়াদ অতিবাহিত হয়ে যায়।

সিনেটে বিচার হলেও ট্রাম্পের হুমকিকে লঘু করে দেখার সুযোগ নেই। তিনি কী বলেছেন মনে রাখতে হবে। তাঁর বক্তব্য হলো ‘কোনো না কোনো রূপে’ ফিরে আসা। তাই ২০২৪ সালে দৈত্য একটি নতুন ছদ্মবেশে পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। এটা হতে পারে হলিউডের প্রথাগত স্টাইলে ট্রাম্পপুত্র কিংবা ট্রাম্পকন্যা অভিনীত সিক্যুয়াল। হতে পারে বাইরে থেকে আসা কোনো বেপরোয়া চক্রের কেউ। এটা অবশ্যই আরো বড় চিন্তার বিষয়। কারণ মার্কিন জাতীয়তাবাদী লোকরঞ্জনবাদ (ন্যাটিভিস্ট পপুলিজম) এমন একজন নতুন বার্তাবাহককে খুঁজে পাবে, যিনি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ত্রুটি ও স্থূল মানসিকতা থেকে মুক্ত এবং আত্মনিয়ন্ত্রিত ও দক্ষ কর্তৃত্ববাদী।

সুতরাং সুপ্ত হুমকি প্রতিহত করতে সিনেটে ভোটাভুটির চেয়েও আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে হবে। সেটা ওবামা আমলের আপেক্ষিক শান্তি ফিরিয়ে আনার চেয়েও বেশি কিছু দাবি করে। এর অর্থ হবে, যেখানে ট্রাম্পবাদ জন্ম নেবে সেখানকার মাটি উল্টে দেওয়া, যাতে একই বিষবৃক্ষের নতুন জাত জন্ম নিতে না পারে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মূল চ্যালেঞ্জ এটাই।

প্রথম কাজ হচ্ছে তাঁর প্রেসিডেন্ট পদের বৈধতার প্রশ্নটি দূর করা। যেহেতু প্রতি তিনজন আমেরিকানের একজন ট্রাম্পের মারাত্মক মিথ্যাকে বিশ্বাস করে যে তিনিই ২০২০ সালের নির্বাচনে জিতেছেন, বাইডেন নন। তাই বাইডেনের প্রেসিডেন্সিজুড়েই বৈধতার প্রশ্নটি ঝুলে থাকবে। এর আগে ২০০০ সালের নির্বাচনের পরও এক-চতুর্থাংশ আমেরিকান জর্জ ডাব্লিউ বুশকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেয়নি। তবে তখন প্রশ্নটি নাইন-ইলেভেনের ধোঁয়া ও ধুলায় মিশে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে বহিরাগত হামলার অনুপস্থিতিতে বাইডেন কিভাবে বিরূপ মানসিকতার ভোটারদের অন্তত কিছু অংশের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলবেন?

উত্তরটা আমেরিকার সবচেয়ে জরুরি সংকটের মধ্যেই রয়েছে। বাইডেন যদি তাঁর ১০০ দিনের মধ্যে ১০ কোটি আমেরিকানকে টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণে সাফল্য পান, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠবে। তিনি চালকের আসনে থাকায় সুফল তাঁর ঘরেই উঠবে। এ প্রক্রিয়ায় আমেরিকানদের আস্থা পুনরুদ্ধারে অনেক দূর এগিয়ে যাবেন তিনি।

মার্কিন রাজনীতিতে একটা অদ্ভুত চক্র আছে। ১৯৯২, ২০০৮ এবং ২০২০ সালে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্টরা হাউস ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যা তাঁদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে শক্তি এনে দেয়। কিন্তু বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা দুজনের ক্ষেত্রেই তাঁদের ভূমিধস বিজয় দুই বছরের মধ্যে উল্টে যায়। আর পূর্বসূরিদের তুলনায় বাইডেনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো খুবই কম। অথচ তাঁর ঘড়ির কাঁটা চলতে শুরু করেছে।

নতুন প্রেসিডেন্ট নিজেকে শ্লথগতির মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ দিতে পারেন না, যাতে সিনেটে ম্যাকোনেলের সুপরিচিত কৌশলের কাছে ধরা খান। তাই ছলনার চেয়েও বেশি কিছু লাগবে। প্রত্যাশার তালিকা দীর্ঘ, যা ভোটার দমন ও জেরিম্যান্ডার্ড ডিস্ট্রিক্ট (দলীয় স্বার্থে নির্বাচনী জেলার সীমানা নির্ধারণ) থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারে অর্থায়ন ব্যবস্থার সংস্কার ও ফিলিবাস্টার রুলের (সিনেটের পদক্ষেপ বিলম্ব করার অপকৌশল) বিলোপ পর্যন্ত বিস্তৃত।

এসব কিছু সামাল দেওয়া জো বাইডেনের সহজাত প্রবৃত্তির সঙ্গে যায় না। তিনি হলেন সিনেটের এমন এক চরিত্র, যিনি এর ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত। আবার কলাম লেখক এজরা ক্লেইন যেমন বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্র্যাটরা গণতন্ত্রের প্রকৃত অগ্রগতির জন্য ভদ্রতার মেকি শান্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। তাই ইতিহাস বলছে, বাইডেন শুধু একটা গুলি করার সুযোগ পাবেন। তিনি অবশ্যই তা ছুড়ে ফেলতে পারেন না, যাতে অপছায়া পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।

 

লেখক : গার্ডিয়ানের কলাম লেখক

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা