kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

রাজনীতির ভ্যাকসিন ইস্যু

আলী হাবিব

২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাভাইরাস মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্বে শনাক্ত কভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা এরই মধ্যে ৯ কোটি ৯২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২১ লাখ ৩০ হাজার। বিপন্ন মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও বড় বড় প্রতিষ্ঠান টিকা তৈরির কাজ শুরু করল। অবশেষে পাওয়া গেল কাঙ্ক্ষিত টিকা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ উদ্যোগে উদ্ভাবিত টিকা তৈরি করেছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট। সেই টিকা এরই মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। শুরুতে আসে উপহারের ২০ লাখ ডোজ। আরো ৫০ লাখ ডোজ এসেছে গত সোমবার। কভিড বিপর্যয়ে টিকা যখন নতুন আশা নিয়ে এসেছে, তখনই টিপ্পনী কাটতে ব্যস্ত দেশের কিছু দেউলিয়া রাজনীতিক ও দিশাহারা সুধী-বুদ্ধিজীবী। ডুবন্ত মানুষ নাকি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। আমাদের দেশের কিছু সর্বস্বহারা রাজনীতিবিদ ঠিক সেই সূত্র মেনেই যেন টিকাকে রাজনীতির ইস্যু বানিয়ে ফেললেন। কারণ কী? ভারত! যে প্রতিষ্ঠানটি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা টোল ভিত্তিতে তৈরি করেছে, সেটি ভারতের। এই টিকা বিষয়ে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার এর বাইরে কোনো ভূমিকা নেই। অবশ্য এই প্রতিষ্ঠানটিই যে বিশ্বে মোট ব্যবহৃত টিকার ৬০ শতাংশ তৈরি করে, এই সত্যটি আমাদের রাজনীতিকদের জানা আছে; এমনকি আমাদের দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে টিকাগুলো ব্যবহার হয়ে থাকে, তারও ৭০ শতাংশ সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার তৈরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামান্যতম খবর যাঁরা রাখেন, তাঁরাও জানেন বিশ্বে বিভিন্ন রোগের টিকা তৈরিতে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া সবচেয়ে বড় কারখানা।

জনমানুষের সমর্থন হারিয়ে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া আমাদের ইস্যু হারানো কিছু রাজনীতিবিদ ও সুধী-বুদ্ধিজীবী করোনার টিকাকে ইস্যু হিসেবে খাড়া করার চেষ্টা করছেন। তাঁদের কথা শুনলে মনে হতে পারে, তাঁরা একেকজন জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ। যদিও বুঝতে অসুবিধা হয় না, করোনার টিকা নয়, আসলে ভারতবিরোধিতাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। ভারতের টিকা যেদিন বাংলাদেশে আসে তার আগের দিন অর্থাত্ গত বুধবার বিএনপির আবাসিক মুখপাত্র রুহুল কবীর রিজভী, যিনি দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, টিকার অগ্রাধিকার নিয়ে কথা বলেন। ভারত সরকারের উপহার হিসেবে করোনাভাইরাসের যে টিকা বাংলাদেশ পাচ্ছে, তা আগে ‘ভিআইপিদের’ দিতে নসিহত করেন তিনি। অথচ এর আগের দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, দেশের সাধারণ মানুষ করোনাভাইরাসের টিকা কতটা কিভাবে পাবে, সে বিষয়ে তাঁর সংশয় আছে। তিনি বলেছিলেন টিকা আগে ‘ধনীদের দেওয়া হবে’ বলে তাঁরা খবর পেয়েছেন। এর আগের দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা করোনার টিকা নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়েছে। টিকা নিয়ে একটা পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি বলেও উল্লেখ করেছিলেন মির্জা ফখরুল তাঁর বক্তব্যে।

অথচ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সব খবরই বলছে, টিকা দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন ধরেই এগোচ্ছে সব কাজ। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় টিকাদান কেন্দ্র এবং হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা টিম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রস্তুত থাকছে। অবশ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অক্সফোর্ডের গবেষণা বিভাগের তথ্যানুসারে এই টিকা নেওয়ার পর খুব জটিল কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এখন পর্যন্ত যে টিকাগুলো বিভিন্ন দেশে দেওয়া হচ্ছে তা এক ধরনের পরীক্ষামূলক অবস্থায় রয়েছে। ফলে এই টিকা প্রয়োগের ফলাফল নিয়েও প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা চলছে এবং চলবে। নেদারল্যান্ডস বা ভারতে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন এগুলো নিয়ে আরো গবেষণা হবে। নেদারল্যান্ডসে যারা মারা গেছে তাদের মৃত্যুর মূল কারণ কী, সেগুলোর গবেষণার ফলাফল জানা গেলে সংশয় দূর হবে। ভারতের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হচ্ছে। টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। সব টিকাই যে নিরাপদ হবে তা চোখ বন্ধ করে বলছেন না বিশেষজ্ঞরাও। কাজেই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে এগুলো নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না হয়। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের গবেষণার ফলাফলের তথ্য-উপাত্তের দিকেও নিশ্চয়ই বিশেষজ্ঞরা নজর রাখবেন।

করোনার টিকা নিয়ে যাঁরা সোচ্চার, তাঁদের একজন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই ট্রাস্টি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের স্বঘোষিত অভিভাবক। সম্প্রতি রাজধানীর ধানমণ্ডিতে তাঁর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ‘করোনা টিকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ‘টিকা নিয়ে টিপ্পনী কাটা’ বিশেষজ্ঞদের যোগ্য জবাবই দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ইমোশনাল হয়ে কোনো কাজ হয় না। ইমোশনাল হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সরকার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেছেন, কেউ যদি ভেবে থাকে যে সরকার চুরি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে—এটা ঠিক নয়।

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম কভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য। ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি খুব স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন, এখন যে ভ্যাকসিন জনগণকে দেওয়া হচ্ছে সেগুলোকে বলা হয় ‘ফার্স্ট জেনারেশন’ ভ্যাকসিন। বৈজ্ঞানিকদের ভাষায় একে ভ্যাকসিনের ফোর্থ ট্রায়ালও বলা হয়। হাজার হাজার মানুষকে এই ভ্যাকসিন দেওয়ার পর আবার বিশ্লেষণ করা হবে। তারপর সেকেন্ড জেনারেশন ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হবে। তিনি এটাও জানিয়েছেন, ফার্স্ট জেনারেশন ভ্যাকসিন আগে বড় আকারে ব্যবহার করা হতো না। কারণ আগে সময় ছিল। এখন যেহেতু সময় নেই, তাই তাড়াতাড়ি আমাদের টিকা নিতে হবে। এ জন্যই ফার্স্ট জেনারেশন ভ্যাকসিন শুধু আমরা না, সারা পৃথিবীর মানুষ নিচ্ছে। ‘বিশেষ-অজ্ঞ’ মির্জা-রিজভী গং যে প্রশ্নটি বারবার সামনে আনছেন, তারও সরাসরি জবাব দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বলেছেন, ফাইজারের ভ্যাকসিনে নরওয়েতে ২৩ জন বৃদ্ধ লোক মারা গেছেন। আবার ইউকেতে বৃদ্ধদের দেওয়া হয়েছে, একজনও মরেননি। তাঁর মতে, এসব নিয়ে ‘অ্যানালিসিস’ করার আছে। তিনি অভয় দিয়ে বলেছেন, ভয় পাওয়ার সঙ্গে ভ্যাকসিন না নেওয়ার সম্পর্ক একেবারেই ক্ষীণ। তিনি মনে করেন, ভয় পাওয়ার সঙ্গে ভ্যাকসিন না নেওয়া হচ্ছে সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার। বায়োলজিক্যাল ও ফিজিক্যাল বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। সেই আয়োজনের আলটিমেট প্রাপ্তি হচ্ছে সদা সমালোচক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বয়ান। সব ওষুধেরই যে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এই মহত্ বাক্য শিরোধার্য করেই তাঁকে এবং তিনি যাঁদের অভিভাবক তাঁদের কাছে একটা সোজাসাপ্টা প্রশ্ন, তাহলে ভ্যাকসিনকে ইস্যু বানানোর কারণ কী? রাজনৈতিক দৈন্য?

নৈরাশ্যবাদী রাজনীতিকরা যখন করোনার টিকা নিয়ে শুধুই হতাশা ছড়িয়ে আর বিতর্ক সৃষ্টি করে নিজেদের দৈন্য প্রকাশ করে চলেছেন, তখন একটা আশার কথা শোনাই। বাংলাদেশেই অদূর ভবিষ্যতে তৈরি হতে যাচ্ছে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা। দেশের কয়েকটি কম্পানি এরই মধ্যে সে সক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশবাসীর শুভাশিস নিশ্চিতভাবেই এ অর্জন ত্বরান্বিত করবে। সব হতাশা ঝেড়ে ফেলে আসুন আমরা আশাবাদী হই।

 লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা