kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

মৈত্রীর করোনা ভ্যাকসিন

ডা. কামরুল হাসান খান

২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মৈত্রীর করোনা ভ্যাকসিন

বিশ্ববাসী করোনার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে যে ভ্যাকসিনের স্বপ্ন দেখত, তা এখন মানুষের হাতে। বাংলাদেশেও আমরা ভ্যাকসিন পেয়ে গেছি। শুরু হচ্ছে ব্যবহার। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং কূটনৈতিক সফলতা। অভিনন্দন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অকল্পনীয় দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন নিয়ে আসার জন্য। যার সুফল বাংলাদেশের মানুষ পেতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে অভিনন্দন ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে, যিনি নিজের দেশের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে মৈত্রীর করোনা ভ্যাকসিন উপহার দিয়ে এই বিশ্বসংকটে কৃতজ্ঞ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী গত ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে কথা দিয়েছিলেন যে ভারতের মানুষ যখন ভ্যাকসিন পাবে, বাংলাদেশের মানুষও তখন পাবে। তিনি কথা রেখেছেন। ২১ জানুয়ারি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ভারতের সেরাম ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটে প্রস্তুত ২০ লাখ ডোজ ভারতের উপহার হিসেবে ঢাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি ভারত ভুটানে দেড় লাখ, নেপালে ১০ লাখ, মালদ্বীপে এক লাখ ডোজ ভ্যাকসিন বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ পাঠিয়ে দিয়েছে। চুক্তি মোতাবেক সেরাম ইনস্টিটিউট ইন্ডিয়া ২৫ জানুয়ারি প্রথম চালান হিসেবে ৫০ লাখ ডোজ পাঠিয়ে দিয়েছে। বহু কাঙ্ক্ষিত টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আজ। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একজন নার্সের শরীরে টিকা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি এই টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। একই দিনে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ আরো ২৪ জনকে টিকা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রগুলো বলছে, ২৭ জানুয়ারি ‘ড্রাই রান’ বা টিকাদানের মহড়া কার্যক্রম শুরু হবে। পরদিন ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আরো ৪০০ থেকে ৫০০ জনকেও এই ড্রাই রান টিকা দেওয়া হবে। টিকাদানের পর এসব ব্যক্তিকে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। প্রতিদিন দুই লাখ মানুষ টিকা পাবেন। এ হিসাবে প্রথম দুই মাস প্রতি মাসে ৬০ লাখ মানুষ টিকাদানের আওতায় আসবে।

পরের মাসগুলোতে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ দেওয়া হবে। জাতীয়ভাবে কভিড-১৯ টিকা বিতরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী সারা দেশে সাড়ে ছয় হাজার কেন্দ্রে করোনাভাইরাসের টিকা বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে চার হাজার ৬০০টি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১০ ও ২০ শয্যার হাসপাতালে ৬০০ কেন্দ্র, জেলা সদর হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল মিলে আরো ৪০০, সিটি করপোরেশন এলাকার বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়, নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ৮০০, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, পুলিশ হাসপাতাল, সচিবালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সংসদ সচিবালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র মিলিয়ে আরো ১০০ টিকাদান কেন্দ্র থাকবে। শুরুর দিকে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম চলবে। ২০ হাজার ৮০০ স্বাস্থ্যকর্মী টিকা প্রয়োগে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকবেন। তাঁদের সহায়তার জন্য ৪১ হাজার ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন। সারা দেশের জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা বহনে পাঁচ হাজার ৪৬৯ জন বহনকারী এবং আট হাজার ৮৬৯ জন সুপারভাইজার থাকবেন।

করোনাভাইরাসের টিকা পেতে নিবন্ধন করতে হবে ‘সুরক্ষা’ নামের একটি অ্যাপে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এই অ্যাপটি তৈরি করে ২৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করেছে। আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকে এই অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন শুরু হবে।

অ্যাপসের মাধ্যমে যাঁরা নিবন্ধন করতে পারবেন না তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অ্যাপসে নিবন্ধন না করার পরও কেউ টিকাকেন্দ্রে গেলে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা তাঁদের সহায়তা করবেন। এ জন্য প্রতিটি টিকাদান কেন্দ্রে পৃথক টিম কাজ করবে।

টিকা সংগ্রহে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কোভ্যাক্স (কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস ফ্যাসিলিটি) থেকে বাংলাদেশ আগামী জুন নাগাদ ছয় কোটি ৮০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পাওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে কোভ্যাক্স বাংলাদেশকে আট লাখ ডোজ ফাইজারের ভ্যাকসিন দিতে চেয়েছে। বাংলাদেশ সম্মতি প্রদান করে সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৮ বছরের নিচে মানুষদের এবং প্রসূতিদের ভ্যাকসিন দেওয়া যাবে না। সে হিসেবে দেশের সব মানুষকে যথাসময়ে ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে দেশে করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার অনেকটাই কমে গেছে। ২৫ জানুয়ারির হিসাব অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণ করেছেন ১৮ জন এবং সংক্রমিত হয়েছেন ৬০২ জন, মৃত্যুর হার ১.৫০ শতাংশ, শনাক্তের হার ৪.০৬ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃতে এবং নিবিড় মনিটরিং ও পর্যবেক্ষণে করোনার সব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ভ্যাকসিন নিয়ে নানা গুজব এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে কোনো কোনো মহল। এরই মধ্যে নরওয়ে এবং ভারতের মৃত্যু নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে করোনা ভ্যাকসিনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁরা সবাই ৮০ বছরের বেশি বয়স্ক এবং নানা জটিল রোগে ভুগেছেন। যেকোনো ভ্যাকসিনে কিছু সমস্যা হতে পারে। যেমন—হালকা জ্বর, মৃদু ব্যথা, বমি বমি ভাব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাইপারসেনসিটিভ প্রতিক্রিয়া হতে পারে, যাদের আগে থেকেই অ্যালার্জি আছে তাদের। তবে এগুলো খুবই সামান্য। অ্যালার্জির কারণে যে প্রতিক্রিয়া হয় তা সহজে বোঝা যায় এবং তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা দিলে সুস্থ হয়ে যায়। টিকা দেওয়ার ১০-১৫ মিনিট পর্যবেক্ষণ করলে তা বোঝা যাবে। স্বাস্থ্য বিভাগ উপর্যুপরি হাসপাতালে রেখে সাত দিন পর্যবেক্ষণ করবে তাতে মানুষের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ থাকবে না। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, সুলভ এবং এটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত। আমরা আশাবাদী, প্রয়োজনে ভারত থেকে আরো টিকা পাওয়া যাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব বিভাগের মধ্যে যেন সমন্বয় অটুট থাকে। সরকারের সব উদ্যোগে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। করোনা প্রতিরোধে সবার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব। ধন্যবাদ শেখ হাসিনা, ধন্যবাদ নরেন্দ্র মোদি।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা