kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

কলমের খোঁচায় কি আমেরিকার পুনরুদ্ধার ঘটবে

অনলাইন থেকে

২৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাগামহীন উদযাপনের পরিবর্তে এটা ছিল বিশ্বজুড়ে এক তুমুল স্বস্তির মুহূর্ত। ওয়াশিংটন তার আইনসভা ভবন ক্যাপিটলে হামলার ঠিক দুই সপ্তাহ পর সেখানেই প্রত্যক্ষ করল একটি নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা। ওয়াশিংটন দেখল বিভাজনের মধ্য দিয়ে সাফল্য পাওয়া এক ব্যক্তির প্রস্থান এবং ঐক্যের অঙ্গীকার নিয়ে আসা আরেক ব্যক্তি জো বাইডেনের অভিষেক। দেখতে পেল ট্রাম্পের বর্ণবাদ ও নারীবিদ্বেষ ডিঙিয়ে আসা প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের আগমন, যিনি একজন অশ্বেতাঙ্গ। এসব প্রাপ্তি সত্ত্বেও নতুন প্রেসিডেন্টকে শুভেচ্ছা জানাতে উল্লাসে ফেটে পড়া জনতার ভিড় দেখা গেল না; বরং দেখা গেল ন্যাশনাল গার্ডের ২৫ হাজার সদস্যের সজাগ পাহারা। এ জন্য বাইডেনের পূর্বসূরির লিগ্যাসিকে (উত্তরাধিকার) ধন্যবাদ দিতে হয়। যেই উত্তরাধিকারের একটি হচ্ছে মহামারির মারাত্মক মৃত্যুহার এবং অন্যটি হচ্ছে এ মাসেই বিদ্রোহের ফলে সৃষ্ট এক রাজনৈতিক সহিংসতার নজির।

আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট যখন শপথ নিলেন, তখন এই হুমকি কিন্তু কমে যায়নি। এটা আমেরিকায় গড়ে ওঠা এক বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাজ, যা তিক্ত রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে। যদিও ট্রাম্প বাজেভাবে পরাজিত হয়েছেন, তার পরও সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সাত কোটিরও বেশি আমেরিকান তাঁকে ভোট দিয়েছেন এবং তাঁর পদটা বাইডেন চুরি করে নিয়ে গেছেন বলে এখনো তাঁরা বিশ্বাস করেন। আর প্রতি পাঁচজন ভোটারের একজন তো ক্যাপিটলের তাণ্ডবকে সমর্থনই করছেন।

শেষ রক্ষা হিসেবে ট্রাম্প পরাজয়ের মুখোমুখি না হয়ে ফ্লোরিডায় চলে যান। এখন দুইবার অভিশংসিত এই সাবেক প্রেসিডেন্ট তাঁর রাজনৈতিক উদ্দীপনা বজায় রাখতে পারেন কি না তা নিয়ে সংশয় থাকলেও বৃহত্তর অর্থে ট্রাম্পবাদের কিন্তু শিকড় গজিয়ে যাচ্ছে। এই পক্ষে প্রচুর আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে ট্রাম্পবাদের পরবর্তী আদর্শ বাহকরা আরো চতুর, আরো বিপজ্জনক হতে পারে। সুতরাং একটা বিষণ্ন ভাব শুধু অনিবার্য ছিল না, যথার্থও ছিল। প্রজাতন্ত্রের সামনে আসা বিপদ খুব কমই বড় হয়ে উঠতে দেখা গেছে। বাইডেনের ভাষণ এই সময়টাকে জাগিয়ে তুলেছে। তিনি তাঁর জাতির অব্যাহত সংগ্রাম ও বিদ্যমান বিপদের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। যেমনটা তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্র বিজয়ী হয়েছে, আমাদের শ্রেষ্ঠতর দেবদূতরা সব সময়ই বিজয়ী হয়েছে।’

সামান্য মধুচন্দ্রিমার প্রত্যাশায় নতুন প্রেসিডেন্ট এক প্রস্থ পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে তাঁকে অবশ্যই এই মহামারি থামাতে হবে, যা চার লাখ আমেরিকানের জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং যাদের এক-চতুর্থাংশই গত মাসে মারা গেছে। তাঁকে অর্থনৈতিক সংকটকেও মোকাবেলা করতে হবে, যেখানে এক বছর আগের তুলনায় এক কোটি কম কর্মসংস্থান হয়েছে। এ কারণে তিনি অবশ্য ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি প্রণোদনা প্যাকেজ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর প্রথম অপরাহ্নেই বেশ কিছু নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যার মধ্যে মুসলিমদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা; প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে প্রত্যাবর্তনসহ ট্রাম্পের সবচেয়ে জঘন্য কিছু কাজ বদলে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

এই সব উদ্যোগ সত্ত্বেও গত চার বছর সময়টা মুছে ফেলা অসম্ভব। কলমের খোঁচায় শুধু কিছু নীতি প্রণয়ন হতে পারে। একটি উচ্চাভিলাষী আইন প্রণয়নের এজেন্ডাকে একটি সমসংখ্যক আসনে বিভাজিত ৫০-৫০ সিনেটের মাধ্যমে শক্তি খাটিয়ে আদায় করতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ম-কানুন ভেঙেচুরে দিয়েছে এবং আদালতগুলোকে স্তূপে পরিণত করেছে। সর্বোপরি এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে, যা নির্লজ্জ মিথ্যা, নগ্ন নিষ্ঠুরতা ও ঘৃণাকে মামুলি বিষয়ে পরিণত করেছে। ট্রাম্প ছিলেন তাঁর দেশের ব্যর্থতার এক ফসল; তিনি তা আরো উন্মোচন করছিলেন এবং বাড়িয়ে তুলেছিলেন।

ইউরোপ ও অন্য মিত্ররা এখন স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে; কিন্তু নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকার অবস্থান বাস্তবে পুনরুদ্ধার করা যাবে না। বাইডেন বড়জোর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারেন। এ জন্য তিনি তাঁর শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, যখন সততা ও শালীনতার ডাক দেওয়ার প্রশ্ন—যা শুধু আমেরিকায় নয়, আটলান্টিকজুড়েই শোনা উচিত, সেই পথে রাজনীতি তার সব কিছু ধ্বংস করে একটি জ্বলন্ত আগুন হতে পারে না। এর পরও অন্যরা ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছে; এমনকি কিছু রিপাবলিকান যদিও সম্মানের আবরণ তৈরিতে বিরক্তিকরভাবে উঠেপড়ে লেগেছেন, তার পরও অন্যরা মিথ্যার লালন-পালন করে যাচ্ছেন। এখন অপতথ্যের এই যুগের সত্য ঐচ্ছিক বিষয় হয়ে গেছে।

আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন যতটা কঠিন ছিল, তার তুলনায় তাদের জাতির ক্ষত বেঁধে দেওয়ার চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে এটি একটি সহজ কাজ ছিল। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অন্তত একজন বিপজ্জনক ব্যক্তির অপসারণ হয়েছে এবং এমন একজন প্রেসিডেন্টের আগমন ঘটেছে, যিনি তাঁর শপথে বিশ্বাস করেন। এই অভিষেক সেই প্রত্যাশা বহন করছে, যতই তা সাময়িক হোক। একই সঙ্গে এটা যুক্তরাষ্ট্রের একান্ত প্রয়োজনও।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা