kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭। ৪ মার্চ ২০২১। ১৯ রজব ১৪৪২

গৃহহীনদের জন্য ঘর অনন্য এক মাইলফলক

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গৃহহীনদের জন্য ঘর অনন্য এক মাইলফলক

‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার থাকবে না কেউ গৃহহীন’—এই স্লোগান সামনে রেখে সরকার ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন মানুষের আশ্রয় ও জীবিকার ব্যবস্থার জন্য প্রায় ৯ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার পদক্ষেপ নিয়েছে, যা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও মাইলফলক। বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। অতীতে কখনো এত বড় কোনো আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। প্রায় ৭০ হাজার ঘর হস্তান্তরের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। আগামী মাসে আরো এক লাখ ঘর হস্তান্তর করা হবে এবং আমাদের বিশ্বাস এ বছরের শেষে যখন মুজিববর্ষ শেষ হবে, তখন সব ঘর হস্তান্তর সম্পন্ন হবে। যাঁদের জমি আছে তাঁরা ২ শতাংশ জমির ওপর অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাবিশিষ্ট দুই কক্ষবিশিষ্ট আধাপাকা ঘর পাবেন, আর যাঁদের জমি নেই তাঁরা ঘরসহ ২ শতাংশ জমি পাবেন। ঠিক ১৯৯৭ সালে কক্সবাজার ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘূর্ণিঝড়কবলিত ভূমিহীন, গৃহহীন ও ছিন্নমূল পরিবার পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প চালু থাকলেও বর্তমান প্রকল্প ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এমন বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অতীতেও একসময় ভূমিহীন ও নদীভাঙনকবলিত মানুষের জন্য গুচ্ছগ্রাম নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তখন এতটা ভালো ছিল না বলে টিনের ঘর দেওয়া হয়। সঙ্গে জমিও ছিল, যাতে সুবিধাভোগীরা চাষাবাদ করে খেতে পারেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক বেষ্টনীর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সরাসরি আর্থিক সহায়তা, এককালীন অনুদান ও চিকিৎসা সহায়তা, নিয়মিত খাদ্যশস্য সরবরাহসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু আছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে গরিব ও অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এ সহায়তা কাজ করে যাচ্ছে। তবে মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে।

সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ধারণায় এখনো আমাদের দেশে নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যা অনেক। এদের মধ্যে দিন আনে দিন খায় মানুষ সংখ্যার বিচারে আরো বেশি। শহরের দিকে তাকালে দেখা যায় এখানে কাজের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু আশ্রয়ের সমস্যা। আশ্রয় নিতে হচ্ছে সরকারের কোনো জমি, রেললাইনের পাশে কিংবা অন্য কারো জায়গায়। আশ্রয়হীন এসব মানুষ জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। গ্রামে কাজের সুযোগ নেই বলে তারা শহরে এসেছে। কারো কাজ ও আশ্রয় কোনোটাই নেই। একটি অংশের অবস্থা আরো খারাপ, যারা রাস্তা কিংবা ফুটপাতে রাতযাপন করছে। শুধু ঢাকা শহরেই নয়, এখন বিভাগীয় ও জেলা শহরেও এমন চিত্র চোখে পড়ে। গ্রামে হয়তো অনেকের বসতভিটা রয়েছে; কিন্তু জীবিকার জন্য নেই কোনো উপায়। আবার নদীভাঙনের মতো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় অনেককে। গত প্রায় এক বছরে করোনা পরিস্থিতি আমাদের জীবনযাপনে অভাবের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। ফলে যাদের শহরে বেঁচে থাকার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছিল, তারা গ্রামে চলে গেছে। তারা কেউ কেউ গৃহহীন ও কর্মহীন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ কাজে যোগ দিয়েছে। আমরা বলছি, আমাদের অর্থনীতি সচল ও স্বাভাবিক; কিন্তু যিনি বা যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন কিংবা যাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে তাঁদের কষ্টটা আমরা কতজন বুঝি। যেভাবেই হোক শহরে লোক আসা বন্ধ করতে হবে, যার জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প কাজ করবে।

করোনার এই সময়ে মুজিববর্ষের উপহার গৃহহীনদের জন্য ঘর সত্যিই আনন্দের। সত্যিকার গৃহহীন যেন ঘর পান তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ দিকটি সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের ভালোভাবে নজর দেওয়া উচিত। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদের ভাষায় বৈষম্য কমাতে পারলে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা কম বাড়ালে চলে। আমাদের এদিকে আরো বেশি নজর দেওয়া উচিত। এ জন্য দরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই কাজটি রাতারাতি করা সম্ভব নয় বলে সরকারের এমন উদ্যোগ মুজিববর্ষের পরেও অব্যাহত রাখা উচিত। যাতে সত্যিকার ভূমিহীন, আশ্রয়হীন এবং নদীভাঙনকবলিত মানুষ একটু আশ্রয় পান। আমরা সরকারের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং এর সাফল্য কামনা করি।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা