kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

গবেষণার ঘাটতি পোষানো যাবে, নৈতিকতার বিপর্যয়ের কী হবে

মো. জাকির হোসেন

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



গবেষণার ঘাটতি পোষানো যাবে, নৈতিকতার বিপর্যয়ের কী হবে

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ, পর্যাপ্তসংখ্যক গবেষণা না হওয়া। বিশেষ করে বিশ্বমানের সৃজনশীল গবেষণার বড় ঘাটতি। এ বিষয়ে দ্বিমত করার অবকাশ নেই। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য, প্রচারের অভাব এবং সৃষ্ট জ্ঞান জাতীয়ভাবে প্রয়োগ করার ব্যবস্থা না থাকায় যতটুকু গবেষণা হচ্ছে সেসবও মানুষ জানতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত জার্নাল  Scopus-এ বাংলাদেশের গবেষকদের আট হাজার ৫০০ গবেষণা প্রবন্ধ  প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে বিদেশের অন্যান্য জার্নাল ও দেশীয় জার্নালে  প্রকাশনা। পর্যাপ্ত ও বিশ্বমানের সৃজনশীল গবেষণা না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে এসব  প্রতিবন্ধকতা প্রতিকারযোগ্য। আমাদের গবেষণার অবস্থাও তথৈবচ। পর্যাপ্ত তহবিল, অবকাঠামো, জবাবদিহি ও প্রয়োজনীয় বিধি-বিধানের অভাবে গবেষণার উদাসীনতা দূর হচ্ছে না। তবে আশঙ্কার কথা হলো, মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কেন আগ্রহ হারাচ্ছেন সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেশিদূর যেতে হবে না। দেশে বহুল আকাঙ্ক্ষিত চাকরির অন্যতম হলো বিসিএস। বিসিএসের ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে শিক্ষা ক্যাডার প্রথম পছন্দ দিয়েছেন এমন প্রার্থী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দেখা গেছে,  প্রার্থীরা শেষ পছন্দ হিসেবে শিক্ষা ক্যাডার দিয়ে থাকেন। ফলে যাঁরা এখন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে বিভিন্ন সরকারি কলেজে চাকরি করছেন, তাঁদের বেশির ভাগই অন্য ক্যাডারে  প্রতিযোগিতায় স্থান না পেয়ে অনিচ্ছা নিয়ে শিক্ষকতায় এসেছেন। শিক্ষকতা পেশার কেন এ অবস্থা? দেশে অন্যান্য পেশার তুলনায় শিক্ষকতা পেশা মোটেও আকর্ষণীয় নয়। বিসিএস পরীক্ষায় একই সিলেবাস ও একই  প্রশ্নের পরীক্ষায় পাস করেও বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তদের সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধার তুলনায় রাত-দিন পার্থক্য। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। আমাদের দেশে একজন প্রভাষকের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা, সহকারী অধ্যাপকের ৩৫ হাজার ৫০০ এবং অধ্যাপকের ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা। ভারতে শিক্ষকতা শুরু সহকারী অধ্যাপক দিয়ে। সহকারী অধ্যাপকদের বেতন স্কেল ৫৫ হাজার টাকা, সহযোগী অধ্যাপকের ৯০ হাজার টাকা এবং অধ্যাপকের এক লাখ ১০ হাজার টাকা। পাকিস্তানে সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন এক লাখ চার হাজার টাকা, সহযোগী অধ্যাপকের এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং অধ্যাপকের দুই লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এর বাইরে গবেষণা, আবাসন, যাতায়াতের জন্য গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। আর উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর শিক্ষকদের বেতন আরো কয়েক গুণ বেশি। কেউ হয়তো বলতে পারেন শিক্ষকদের বেতন স্কেল তো অন্যান্য সরকারি চাকুরেদের মতো একই। এটি পূর্ণ সত্য নয়, কিছু উচ্চতর স্কেল সামরিক-বেসামরিক নির্ধারিত চাকুরেদের জন্য আছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য তা নিষিদ্ধ লোবান। এ ছাড়া অন্যান্য পেশায় যেসব আকর্ষণীয় প্রান্তিক সুবিধাদি আছে তা-ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নিষিদ্ধ। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা আগের চেয়ে বাড়লেও মর্যাদায় এগোচ্ছে না। প্রাথমিকের শিক্ষকরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, যা বিশ্বেই বিরল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মর্যাদা রাষ্ট্রীয় পদক্রমে যুগ্মসচিবের পদমর্যাদায় সিল করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতনকাঠামোর কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি গত ১০ বছরেও। ফলে শিক্ষকদের অনেকেই বঞ্চনার ঘাটতি পুষিয়ে নিতে নিজ পেশায় মনোযোগ না দিয়ে অন্যান্য কাজে ঝুঁকে পড়ছেন। আর এভাবে শিক্ষা ও গবেষণা দুটিই পিছিয়ে পড়ছে। গবেষণা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে, অবকাঠামো আরো উন্নত হলে, জবাবদিহি বৃদ্ধি করা গেলে, মেধাবীদের শিক্ষকতায় ফিরিয়ে আনা গেলে এবং রাষ্ট্র শিক্ষা ও শিক্ষকদের প্রতি আরো মনোযোগী হলে গবেষণার ঘাটতি অনেকখানিই পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

ভয়ানক আশঙ্কার কথা হলো, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৈতিকতাখেকো নতুন নতুন যে রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে তার নিরাময় হবে কিভাবে? একটি  প্রবণতা ক্রমেই মারাত্মক রূপ ধারণ করছে। গদিনশিন উপাচার্যকে ঘিরে গড়ে ওঠে একটি গ্রুপ। তিনি এই গ্রুপের ওপর এতটাই নির্ভরশীল থাকেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ-পদোন্নতি, তদন্ত, বরখাস্ত, কাউকে শাস্তি দেওয়া, কাউকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেওয়া—সব কিছুর নিয়ামক হয়ে ওঠে এই গ্রুপ। উপাচার্য বিশেষ কয়েকজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় এই গ্রুপ উপাচার্যের কান ভারী করে তাদের অপছন্দের মানুষদের কোণঠাসা করে, তাদের নানাভাবে বঞ্চিত করে। জন্ম নেয় উপাচার্যবিরোধী দল। উপাচার্যের মেয়াদের শেষ দিকে এই দল খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। উপাচার্য ও তাঁর গ্রুপের কারো কারো বিরুদ্ধে নানা কর্মকাণ্ডের সত্য-মিথ্যা ঘটনাসংবলিত লিফলেট বের করে, এমনকি পোস্টার পর্যন্ত ছাপায়। উপাচার্যের দ্বিতীয় মেয়াদ ঠেকানো ও সামাজিকভাবে হেয় করার জন্যই মূলত এই লিফলেট বিতরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে যদি এ কাজ হতো, তাহলে লিফলেট বিতরণ না করে মামলা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশি উপকার হতো। উপাচার্যের জেল-জরিমানা হতে পারত কিংবা তাঁর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেত। অন্যদের জন্যও দৃষ্টান্ত হতো। লিফলেট-পোস্টারের পাশাপাশি উপাচার্যবিরোধীরা তাঁদের পছন্দের কাউকে উপাচার্য করতে জোর তদবির-লবিং শুরু করেন। উপাচার্যের দৌড়ে একাধিক প্রতিযোগী থাকলে প্রার্থীরা নিজেদের যোগ্যতার চেয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে তাঁদের অতীতের দোষত্রুটি, ভুলভ্রান্তি এমনকি একান্ত ব্যক্তিগত ও গোপনীয় বিষয়গুলোর তদবির-লবিংয়ে তুলে ধরেন। প্রতিযোগী প্রার্থীকে ঠেকাতে নিজেদের লোকদের দিয়ে প্রতিযোগী প্রার্থীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পক্ষে এমন কাজ অত্যন্ত গর্হিত ও আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। অবাধ যৌনাচারের দেশেও মানুষ প্রেসিডেন্টকে বা দায়িত্বশীল পদের মানুষকে অনৈতিক যৌনতায় জড়াতে দেখলে  প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তেমনি অন্যায়-অপরাধ-অনৈতিকতায় কলুষিত সমাজের মানুষও শিক্ষককে আদর্শবান হিসেবেই দেখতে চান। তাই যাঁরা এসব করছেন তাঁদের কাছে প্রশ্ন, উপ-উপাচার্যের  প্রতিযোগিতার সময় কেন অভিযোগ উত্থাপন করছেন, তিনি তো দশকের পর দশক ধরে শিক্ষকতায় আছেন, তখন কেন অভিযোগ করেননি? কোনো ব্যক্তির চরিত্রহননকারী বিষয়গুলো সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম কিংবা অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ পর্ষদে কেন অভিযোগ করলেন না? বিদ্বেষে বিষাক্ত যে হৃদয়, হিংসার অনল জ্বলছে যে মনে, সে হৃদয় কলুষিত। কলুষিত হৃদয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনুষ্যত্বের শিক্ষা দেবেন কিভাবে? কথায় আছে, ‘দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য’। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। কিন্তু কোনো মানুষ যদি আচরণগত বা চরিত্রগতভাবে খারাপ হয়, তবে সে শিক্ষিত হলেও সমাজের বা মানুষের উপকার করে না, বরং ক্ষতি করে। শিক্ষকের কাজ শুধু শিক্ষার্থীকে পুঁথিগত জ্ঞানে সমৃদ্ধ করা নয়, বরং সঠিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে মানুষের ভেতর সত্যিকারের মানুষ সৃজন করা। অহিংস, শান্তিপূর্ণ ও নৈতিক সমাজ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বলা হয় সন্তানের দ্বিতীয় জন্মদাতা। সত্যি তো, জন্মদাতা পিতা শুধু জন্ম দিয়েই থাকেন; কিন্তু তাকে সত্যিকার মানুষরূপে গড়ে তোলেন তার শিক্ষক।

একজন চরিত্রবান মানুষ কখনোই নিজেকে উচ্চপদে আসীন করতে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠেকাতে অপরের ব্যক্তিগত, গোপনীয় বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করার মতো অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজ করতে পারেন না। আর এমন একজন অনৈতিক, অপরাধীমনস্ক, চরিত্রহীন মানুষ কখনোই নৈতিক মানুষ সৃষ্টি করতে পারেন না। নিজেদের ব্যক্তিগত লাভের জন্য যদি কেউ এত নিচে নামতে পারেন, এমন মানুষ উচ্চপদে আসীন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতটা মঙ্গল হবে তা বোধ করি বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তার ২০২০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে। উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদ চরিত্রগতভাবে অত্যন্ত দুর্বহ দায়িত্ব। শিক্ষা ও গবেষণার ক্রমাগত উন্নতি, হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে কাজ করা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের উপযোগী সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক মানবসম্পদ তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ অনেক ভারী বোঝা কাঁধে নেওয়া। উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ লাভকে স্বাভাবিক চরিত্রগত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা না করে যখন একে ব্যক্তিগত লাভ ও স্বার্থ হাসিলের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখনই এসব পদে নিয়োগ লাভের জন্য অসুস্থ ও অনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

গবেষণার ঘাটতি পোষানো গেলেও নৈতিকতার এমন বিপর্যয় নিরাময় হবে কিসে?

 

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা