kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে আমাদের করণীয়

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে আমাদের করণীয়

বিশ্ব অর্থনীতির তিনটি প্রধান বিপর্যয়ের একটি এখন চলছে। প্রথম বিপর্যয়টি ১৯২৯-এর মহামন্দা হিসেবে পরিচিত, যা ১৯২৯ থেকে শুরু হয়ে ১৯৩৯ পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর চলে। তারপর ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আমরা দেখেছি। সর্বশেষটি হলো বর্তমানে কভিড-১৯ মহামারি সৃষ্ট আর্থিক বিপর্যয়। ২০২০ সাল থেকে এই বিপর্যয়ের শুরু এবং এখনো চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হয়ে উঠেছে কভিড-১৯ সৃষ্ট বিশ্বমন্দা। এটি বিশ্বকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রায় সব দেশই এর শিকার হয়েছে। ফলে দেশগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের একমাত্র দেশ চীন ছাড়া বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির কারো পজিটিভ প্রবৃদ্ধি নেই। উদীয়মান দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কিছুটা পটিজিভ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। অনেক দেশের তো ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০০৭-০৯ সালে আমরা যে মন্দা দেখেছিলাম, সেটা কাটতে অনেক সময় লেগেছে। কারণ অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার প্রমাণ ছিল ওই সংকট। তখন সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছিল বিশ্ব পুঁজিবাদের শিথিল নীতি। তখন অর্থনৈতিক রেগুলেশনগুলো ভেঙে পড়ে, যা কাটতে অনেক সময় লেগে যায়। এমনকি কভিড আসার আগ পর্যন্তও এর রেশ ছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিতে বিশ্বায়ন সংকট গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।

অর্থনীতিতে ২০০০ সাল থেকে বিশ্বায়ন (গ্লোবালাইজেশন) প্রক্রিয়া বেশি গতি পায়। আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সবাই বিশ্বায়নকে সমর্থন করতে থাকে। বিশ্বায়নটা হলো বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে একটি দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের যোগসূত্র বা আন্তর্নির্ভরতা। তখনকার ধারণা হলো, সবাই মিলে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করলে সেটা সবার জন্যই উপকার হবে। এই ধারণা নিয়ে প্রথম প্রথম বেশ সন্দেহ কাজ করেছিল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তবে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের নেতিবাচকতা দেখা যায়নি। তবে এর বড় নেতিবাচক প্রভাবটা হচ্ছে বৈষম্য সৃষ্টি। এই সময়ে দৃশ্যত মানুষের গড় উন্নতি ঘটলেও তুলনামূলকভাবে বৈষম্য মারাত্মক হয়েছে। আশঙ্কা অনুযায়ী এটা শুধু দক্ষিণের দেশগুলোতেই ঘটেনি, উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অংশের দেশগুলোর মধ্যেই দিন দিন বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি দেশে ধনী-গরিব প্রভেদটা প্রকট হয়েছে।

এই বাস্তবতায় এসে বিশ্বায়ন অনেকটা থমকে যায়। প্রকৃতপক্ষে কভিডের আগেই বিশ্বায়ন একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। বড় শক্তিগুলো, বিশেষ করে বড় অর্থনৈতিক শক্তি—চীন, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি ইউরোপের দেশগুলোতে মুক্তবাণিজ্য স্থাপিত হওয়ার কথা ছিল, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করার কথা ছিল। জাতিসংঘ থেকে প্রচার চালানো হয়েছিল যে বিশ্বায়ন হলে ভালো হবে, সেটি সেভাবে ঘটেনি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই এসেছে কভিড।

কভিডের কারণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা (ইকোনমিক ডিফিসিয়েন্সি)। ২০০০ সালে বলা হয়েছিল যে বাণিজ্যই হবে প্রধান বিষয়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুরতা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল। দ্বিতীয় হলো, রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিপর্যয়। দেখা যাচ্ছে, দিন দিন কর্তৃত্ববাদ বেড়েছে, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নীতিগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতার অভাবও প্রকট হয়ে উঠেছে। তৃতীয় হলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দুর্বলতা। এটা এখন প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বলুন, আইএমএফ বলুন, ডাব্লিউটিএ বলুন—সর্বত্র ভঙ্গুরতা। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত বা অনুন্নত দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলো বা সার্ক ও আসিয়ানের মতো সংস্থাগুলো এই সময়ে খুব ভালো কিছু করতে পারেনি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে এখন বিশ্বায়নের জন্য অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে নিরীক্ষণ ও পরিবীক্ষণসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো ঢেলে সাজানোর সময় হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নতুন করে সংস্কার করার সময় এসেছে। ঠিক এ রকম একটা সময়ে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।

আমরা এখন অনুন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যাব। উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার তিনটি শর্ত ছিল—মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা দূরীকরণ। বাংলাদেশ কিন্তু মোটামুটি তিনটা শর্তই পালন করেছে। মাথাপিছু আয় মোটামুটি ভালো করেছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন একেবারে চমৎকার না হলেও সন্তোষজনক। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা না কাটলেও কিছুটা স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ তিনটি শর্ত পালনে এগিয়ে গেলেও এগুলো টেকসই ও দৃঢ় হয়নি। যেমন—ভঙ্গুরতা দূর করার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, কভিড-১৯ এসে তিনটি অর্জনকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা কিছুটা বেড়েছে। অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ যথাযথভাবে যে কাজটি করেছে, সেটা হলো ২০২৬ পর্যন্ত আমাদের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ স্থগিত করেছে। এর আগে নেপাল এ ধরনের অনুরোধ করেছিল। মালদ্বীপও করেছিল। মালদ্বীপ ওপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ সময় নিয়ে খুব ভালো করেছে। না হলে বাণিজ্যে বৈশ্বিক সুবিধাগুলো থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম। কারণ উন্নয়ন থেমে গেলে আমরা বাণিজ্যিক ছাড় (কনসেশন) পেতাম না। যেমন—ওষুধ উৎপাদনে আমাদের প্রপার্টি রাইটস মানতে হয় না, সে সুযোগটা হারাতাম। এখন উন্নয়নশীল দেশের উত্তরণ স্থগিত করার পাশাপাশি আমাদের প্রস্তুতিটাও দ্রুত শুরু করতে হবে। এ জন্য আমি আমাদের ছয়টি প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেছি।

প্রথমটা হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন। এ জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা ও উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দৃশ্যত আমাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। তবে রাজনীতিতে অসন্তোষ ও অসহিষ্ণুতা আছে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে এখনো বহু কাজ বাকি আছে।

দ্বিতীয় হলো প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো দুর্বল। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে এখন আলোচনা হয়। এটির কর্মতৎপরতা ও শক্ত অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন এখন। অন্যান্য রেগুলেটরি বডির অবস্থাও ভালো নয়। আইসিটি রেগুলেটরি বডি নিয়ে নানা কথা হয়। পাশাপাশি উৎসাহদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তথা এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো, বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট—এগুলোর ভূমিকাও দুর্বল। প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন করতে না পারলে আমাদের প্রস্তুতি ভালো হবে না।

তৃতীয়ত, স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও অপচয় রোধ। সরকারি কাজে প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কাজে স্বচ্ছতা আনতে হবে। এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ হবে এবং দুর্নীতিজনিত অপচয় রোধ হবে। আমরা দেখে থাকি, তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। ব্যাংকসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই এটা দেখা যায়। এখন তো ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দুর্নীতি প্রবেশ করেছে। এর থেকে বের হয়ে আসার উপায় হচ্ছে সর্বত্র স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।

চতুর্থত, মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্বারোপ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো আমরা তেমন উন্নতি করতে পারিনি। সামাজিক জ্ঞানস্তরের উন্নয়নের জন্য, কল-কারখানা বা শিল্পায়নের জন্য, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য—অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট খাতগুলোর জন্য আমাদের শিক্ষা দর্শনটা কেমন হবে, কোন খাতে কী পরিমাণ শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল আমাদের দরকার—এই বিষয়টি আমরা আজও ঠিক করতে পারিনি। ফলে গণহারে বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার বন্যা বয়ে গেলেও শিক্ষার মান ও কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর স্বাস্থ্য হলো মানবসম্পদের একটা বিরাট অংশ। কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়নের জায়গা থেকে আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করিনি। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুরতা করোনা মহামারি এসে আমাদের দেখিয়েছে।

পঞ্চমত, আয়, সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য দূরীকরণ। আমাদের আয়ের বৈষম্য বাড়ছে। সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য আরো বেশি। এখন হয়তো বলা যাবে যে দরিদ্র মানুষগুলোও হাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, ঘরে ঘরে টিভি দেখে। কিন্তু যদি আপেক্ষিকভাবে দেখেন যে সমাজের ওপরের মানুষগুলোর অবস্থা কী, তাহলে পার্থক্যের বিশালতা চোখে পড়বে। এই পার্থক্যই সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি করে।

ষষ্ঠত, জন-অংশগ্রহণ ও সামাজিক দায়িত্ব। সরকারি কাজে স্থানীয় প্রয়োজনীয়তাকে অগ্রাধিকার এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ আজও নিশ্চিত করা যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন বলতে আমরা এখনো কিছু দেখি না। এখনো ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, উন্নয়ন কেন্দ্রীভূত। গণতন্ত্রের আরেকটা রূপ হলো সরকারি পরিকল্পনা ও কাজে জনগণের অংশগ্রহণ। তাতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। এর পাশাপাশি জনগণেরও কিন্তু দায়িত্ব আছে। আমাদের মধ্যে এখনো সামাজিক দায়িত্বশীলতা তেমন গড়ে ওঠেনি। অন্যের মঙ্গল চিন্তা, সামষ্টিক কল্যাণের মানসিকতা—এসব বৃদ্ধি করতে হবে। মহামারিকালে মাস্ক পরতে না চাওয়ার মানসিকতা থেকেই সামাজিক দায়িত্বের মানুষের প্রতি উদাসীনতা স্পষ্ট দেখা যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়ন এখন চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে আমরা ভালো অবস্থায় আছি এবং উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সন্ধিক্ষণে রয়ে ছিল বলে আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো আরো বেশি। তাই আমাদের করণীয় নির্ধারণে যেমন দেরি করা যাবে না, তেমনি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে, দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা