kalerkantho

শুক্রবার । ২০ ফাল্গুন ১৪২৭। ৫ মার্চ ২০২১। ২০ রজব ১৪৪২

আজ জিতলেই সিরিজ জয়

ইকরামউজ্জমান

২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আজ জিতলেই সিরিজ জয়

করোনাভাইরাসের জন্য জাতীয় দল গত বছর (২০২০) ১১ মার্চের পর আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেনি। বঙ্গবন্ধু ক্রিকেট সিরিজ ২০২১ বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাধ্যমে ১০ মাস পর ওয়ানডে নতুন অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে গত বুধবার ফেভারিট হিসেবে খেলতে নেমে মানসিকভাবে দুর্বল, খর্ব দলগত শক্তি, অনভিজ্ঞ ও অপরিচিত ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে গঠিত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬ উইকেটে জিতে এগিয়ে গেছে। আজ দ্বিতীয় ম্যাচে জিতলেই সিরিজ জয়। বাংলাদেশ ক্যারিবীয় দলের বিপক্ষে সুস্পষ্ট সিরিজ জয় ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না। ম্যাচে গুরুত্ব হলো ওয়ানডে থেকে পয়েন্ট অর্জন। ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে পয়েন্ট যুদ্ধে জিততে হবে। বাংলাদেশ লো স্কোরিং ম্যাচে ৬ উইকেটে জিতেছে এটাই পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে। তবে বাংলাদেশ মাঠে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না এটি সত্যি। ক্যারিবীয় স্পিনাররা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ভুগিয়েছেন। বাঁহাতি অফ স্পিনার আকিল হোসেন তাঁর অভিষেক ম্যাচে ২৬ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন। বাঁহাতি এই স্পিনারের টার্ন, বাউন্স ও নিয়ন্ত্রণ চমৎকার। আমার মনে হয় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের প্রথম ম্যাচেই সতর্ক বার্তা দিয়েছেন ক্যারিবীয় স্পিনাররা। অন্যদিকে এক বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকার পর এই সিরিজের মাধ্যমে দলে ফিরে এসেছেন বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। দলে সাকিবের অন্তর্ভুক্তি শুধু দলগত শক্তি বৃদ্ধি করেনি, ‘ইউনিটের’ সবাই তাঁকে পেয়ে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত। সাকিব প্রথম ম্যাচেই ঝলছে উঠেছেন। ৮ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট। সাকিবের ইকোনমি ১.০৯। এটি তাঁর ক্যারিবীয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি রেকর্ড। এর আগে ১৬ রানে তিনি ৪ উইকেট নিয়েছিলেন। সাকিব পেসার হিসেবে ওয়ানডেতে ১৫০টি উইকেট পেলেন। ১২৭টি ম্যাচে ১৫৩টি উইকেট তাঁর। ফেরার ম্যাচে তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচও হয়েছেন। দেশের ক্রিকেটে সাকিব একজন ‘আইডল’।

অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিয়মিত ওয়ানডে এবং টেস্ট অধিনায়কদ্বয়সহ ১০ জন অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত পারফরমার করোনাভাইরাসের জন্য বাংলাদেশে আসতে চাননি। এ ছাড়া আরো দুজন একান্ত ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দল থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে খেলেছে প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দশ গুণ বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে। প্রথম ম্যাচেই ছয়জন ক্যারিবীয় অভিষিক্ত হয়েছেন। দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং জমজমাট হবে না—এটি অনেকের ধারণা। খেলাটা কিন্তু ক্রিকেট! রহস্য করতে পছন্দ করে। ক্রিকেটে পচা শামুকে পা কাটে। হিরো জিরো হয়। তীরে এসে তরি ডোবে।

 

গত ১০ ওয়ানডে ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আটটি। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে এবং একই বছর ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে সিরিজ জিতেছে। আর এই বিজয় তো পূর্ণশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। চলতি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত দুই দেশ মুখোমুখি হয়েছে ৩৮ বার, এর মধ্যে বাংলাদেশ জিতেছে ১৫টি আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২১টি ম্যাচে। আর দুটি ম্যাচ ফলহীন।

বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে ৩১ মার্চ ১৯৮৬ সালে শ্রীলঙ্কায়। প্রথম ওয়ানডে জিতেছে ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে ৬ উইকেটে, ১৭ মে ১৯৯৮ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ (৩-২) জিতেছে; এরপর ২০০৯ ও ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ২০১৫ সালে দেশের মাটিতে পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে স্বাধীন ও সাহসী ক্রিকেট খেলে সিরিজ জিতেছে। ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়েছিল তখন ওদের ক্রিকেটের অবস্থা ছিল নাজুক। বোর্ডের সঙ্গে খেলোয়াড়দের বিরোধ বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে। ক্রিকেট বোর্ড নতুন খেলোয়াড় নিয়ে দল গঠন করেছিল। বাংলাদেশ জিতেছে ওয়ানডে এবং টেস্ট সিরিজ। এবার আবার অনভিজ্ঞ ও নতুন খেলোয়াড় নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে এবারের প্রেক্ষাপট অবশ্য ভিন্ন। ক্রিকেটাররা করোনাভাইরাসের জন্য আসতে চাননি। আর তাই দুর্বল দল নিয়ে তারুণ্যের ওপর আস্থা রেখে লড়াই করা ছাড়া তো আর উপায় নেই। সেখানে বাংলাদেশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাঠে দিয়েছে উজ্জীবিত শক্তিশালী দল। বাংলাদেশের তো সিরিজ জয় ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর নামে নামকরণ সিরিজ জয় করতে না পারলে এটি হবে হতাশার কারণ। ক্রিকেটে প্রতিপক্ষকে সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই। দিনের খেলায় সামর্থ্যকে প্রতিফলিত করতে পারলে অনেক কিছুই সম্ভব।

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৩৭৭টি ওয়ানডের মধ্যে জিতেছে ১২৯টি, হেরেছে ২৪১টি, ৭টি ফলহীন। এই পরিসংখ্যান জাতি-চরিত্রের সঙ্গে যায় না। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। জয়ের অভ্যাস আর ইতিবাচক মানসিকতার কোনো বিকল্প নেই। ক্রিকেট ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। সামনের দিকে তাকানো ছাড়া উপায় নেই। পরিবর্তনের পথ ধরেই উন্নতি।

দল পুনর্গঠন একটি প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রয়োজনের তাগিদে লক্ষ্য সেট করে পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে হবে। সবাই তো আর সব সময়ের জন্য নয়। ‘রিপ্লেসমেন্ট’ তৈরি করতেই হবে। সব দেশে করে। বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তরুণ প্রতিভাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে তাদের প্রতি আস্থা রাখার মধ্যে নিহিত আছে ভবিষ্যতের ফলাফল। তবে সোনা চিনতে ভুল করা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ দেশের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু করা হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে দলে তারুণ্যের সুযোগ। মাঠের খেলায় জয় ছাড়া উপায় নেই। পয়েন্ট সংগ্রহ করতে হবে ২০২৩ বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে। যেটা আগেই উল্লেখ করেছি। ১৩৪ নম্বর খেলোয়াড় হিসেবে তরুণ পেসার হাসান মাহমুদের অভিষেক হয়েছে। তিনি প্রথম খেলায় ২৬ রানে তিনটি উইকেট নিয়ে তাঁর সামর্থ্যতা প্রমাণ করেছেন। জাতীয় দলে আজ আরেক পেসার শরিফুলকে দেখা যাবে। স্কিল দেখবার এখনই সময়—নতুনদের মাঠে নামিয়ে পরখ করা। আগামী মাসে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে তো এটি সম্ভব হবে না।

টিম কম্বিনেশন এবার চমৎকার। ব্যাটিংয়ে অনেক বেশি গভীরতা আছে। জয়ের জন্য ভালো ব্যাটিং বড় জরুরি। করোনার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১৫ জনের পরিবর্তে ১৮ জনের দল দিয়েছেন নির্বাচকরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে এবারের স্কোয়ার্ডে ছয়জন পেসার কেন! এর মধ্যে দুজন নবাগত। বাংলাদেশ দলে সাকিবসহ আছেন চারজন স্পিনার। এর মধ্যে একজন নতুন। ক্রিকেটকে তো সব সময় হিসাবের মধ্যে আটকে রাখা যায় না।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক, আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা