kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

মত ও মন্তব্য

আয়েশা সিদ্দিকার লড়াই

হারুন হাবীব

২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আয়েশা সিদ্দিকার লড়াই

নারী যখন বিমানের ককপিটে বসেন, ট্রেনের ড্রাইভার হন, বাস ও ট্রাক চালান, হাতে রাইফেল তুলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্য হন, তখন এসবকে আমরা ব্যতিক্রম মনি করি। কেউ কেউ আবার পুলকিত হই এই ভেবে যে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। নারীরা এগিয়েছেন সত্য; কিন্তু সে অগ্রসরতা সার্বিকভাবে নারীর এগিয়ে যাওয়ার মানদণ্ড নয়। কারণ সামগ্রিকভাবে নারীরা আজও পিছিয়ে, পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়া কেটে সমতালে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ বা মানসিকতা আজও আমাদের সমাজ রপ্ত করতে পারেনি। মোটকথা সম-অধিকারের কথা লেখা থাকলেও নারীদের অধিকারের প্রশ্নে বিস্তর ফাঁক রয়ে গেছে এখনো।

আমার আজকের লেখাটা উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকাকে নিয়ে। গণমাধ্যমে যখন তাঁর লড়াইয়ের বিবরণ পড়ি, ভিডিওতে যখন এই লড়াকু নারীর যুক্তি শুনি, তখন আমার মনে হয়, সম-অধিকারের ন্যায্য দাবি বুকে নিয়ে যে মানুষ অগ্রসর হন, তাঁকে সাধুবাদ দেওয়ার মাঝে নিজেরও গৌরব আছে। না, বড় কোনো পদ বা পদবি নয়, দেশের আইন মেনে ফুলবাড়ীর মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা দেশের প্রথম নারী কাজি বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হওয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এযাবৎকালের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ায়নি সরকারি মহল, এমনকি সায় দেননি আদালতও। কিন্তু এসব হতাশায় দমেননি আয়েশা সিদ্দিকা। দৃঢ়চিত্ত এই নারী বলেছেন, সরকার ও হাইকোর্টে বঞ্চিত হলেও তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যাবেন, আইনের শেষ ধাপ পেরিয়ে তাঁর ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা চালাবেন। আমার বিশ্বাস, তাঁর এই চেষ্টার প্রতি সমাজের বিবেকবানদের অভিনন্দন আছে, আশীর্বাদ আছে।

এই যে মানুষ, যিনি অন্ধকারের বন্ধ্যত্ব খুলে সমাজকে আলোর মুখ দেখাতে এগিয়ে আসেন, তাঁর আচরণকে হয়তো বেশির ভাগ মানুষ স্পর্ধা বলবেন; কিন্তু এই স্পর্ধার মাঝে লুকিয়ে আছে একটি বড় লড়াই, যা মঙ্গলের। শহরের মানুষরাই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করেন, অসত্য নয় এ উচ্চারণ। কিন্তু গ্রামে কিছু মানুষ থাকেন, নাগরিক সমাজে যাঁদের অবস্থান নিতান্ত নগণ্য, তাঁদেরই কেউ কেউ কখনো কখনো চোখ খুলে দেন রাষ্ট্রের, সমাজের। তা না হলে ফুলবাড়ীর দারুল সুন্নাহ সিনিয়র সিদ্দিকিয়া মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস করা ৩৯ বছরের আয়েশা এমন দৃঢ়চিত্ত হতে পারেন কী করে? ব্যক্তিগত জীবনে স্বামীর মতোই একজন হোমিও চিকিৎসক আয়েশা। ছোটবেলা থেকে বিয়ের অনুষ্ঠানে কাজি বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে বিয়ে পড়াতে দেখে তাঁর ইচ্ছা জাগে, যদি তিনিও একদিন কাজি হতে পারতেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা পূরণে অনেক বাধা। তিনি যে নারী, পুরুষ না। নারী তো কাজি হতে পারে না! দেশে এখন পর্যন্ত একজনও মেয়ে কাজি নেই! কেন নেই? যে কাজ পুরুষরা পারে, তা নারীরা পারে না কেন? সেখান থেকেই শুরু হয় আয়েশার লড়াই।

এর পর থেকে বহুবিধ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু হয় আয়েশা সিদ্দিকার। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন দেশে কোনো নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজি নেই। কিন্তু তন্নতন্ন করে এই বাস্তবতার পেছনে কোনো আইন বা যুক্তি খুঁজে পান না আয়েশা। অতএব, তাঁর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে একবার তিনি ফুলবাড়ীয়া পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন। ঘটনাটা ২০১৪ সালের। শিক্ষাগত থেকে অন্য সব যোগ্যতা থাকায় যাচাই-বাছাই শেষে লাইসেন্স মঞ্জুরির স্থানীয় উপদেষ্টা কমিটি যে তিনজনের নাম আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়, তার প্রথমেই ছিল আয়েশা সিদ্দিকার নাম। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় একজন নারীকে কাজি বানাতে বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স দিতে রাজি নয়। কারণ এ রকম অনুমোদন তারা আগে কখনো দেয়নি। অতএব, বাতিল হয় আয়েশার নাম। পুরুষ একজনকে নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়।

স্বভাবতই আইন মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন না আয়েশা সিদ্দিকা। সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তিনি উচ্চ আদালতে যান। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন। হাইকোর্টের সেই পূর্ণাঙ্গ রায় সম্প্রতি প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে।

আয়েশা সিদ্দিকা তাঁর যুক্তিতে অটল। কারণ ২০০৯ সালে আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা বিধিমালার কোথাও বলা হয়নি যে শুধু পুরুষরাই কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন। মন্ত্রণালয়ের বিধিমালায় একজন কাজির যেসব যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তার সবই তাঁর আছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানেই নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই লড়াকু নারীর আরো প্রশ্ন : বাংলাদেশে রাজনীতি, বিচারাঙ্গন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মতো কাজেও যেখানে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে বিয়ে নিবন্ধনের কাজটিতে কেন নারীকে ‘অযোগ্য’ করে রাখা হবে? কোন যুক্তিতে? আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও তিনি মনে করেন, ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে একজন নারীকে তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

উল্লেখ্য, কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রার কোনো সরকারি পদ নয়। একটি নির্দিষ্ট এলাকার বিয়ের জন্য একজন কাজি/রেজিস্ট্রার বা নিবন্ধক থাকেন, যিনি সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে নির্ধারিত ‘ফির’ বিনিময়ে বিয়ে নিবন্ধনের কাজ সম্পাদন করেন। ২০০৯ সালে আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিধিমালায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা আছে। সেখানে শর্ত দেওয়া হয়েছে, একজন প্রার্থীকে স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদরাসা বোর্ডের নিবন্ধিত মাদরাসা থেকে কমপক্ষে আলিম পাস হতে হবে। বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। তিনি যে এলাকার কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে চান, সেখানকার বাসিন্দা হতে হবে। আয়েশা সিদ্দিকার প্রশ্ন হচ্ছে, এই তিন শর্তের সবই পূরণ করার পরও তাঁর আবেদনে সাড়া দেওয়া হলো না কেন?

গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, আয়েশার লাইসেন্সের আবেদন খারিজ করে দিয়ে ২০১৪ সালে আইন মন্ত্রণালয় বলে : ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।’

কিন্তু আয়েশা সিদ্দিকা এই ‘সম্ভব নয়’-এর কারণ খুঁজতে চান। অতএব, তিনি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। হাইকোর্ট রুলও জারি করেন। কিন্তু গত বছর সেই রুল খারিজ হয়ে গেলে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয় : প্রাথমিকভাবে দুজন মুসলিম যুগলের মধ্যে বিয়ে পড়ানোই একজন নিকাহ নিবন্ধকের কাজ, যা মূলত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আরো বলা হয় : শহরাঞ্চলে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান না থাকায় সম্প্রতি মসজিদে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে শারীরিক কিছু পরিস্থিতির কারণে একজন নারীর পক্ষে মাসের কোনো একটা সময় মসজিদে যাওয়া সম্ভব হয় না। ওই সময় একজন নারী বাধ্যতামূলক দৈনন্দিন প্রার্থনা থেকেও বিরত থাকেন। আরো বলা হয় : শারীরিক এই অযোগ্যতা ধর্মীয় অনেক কার্যক্রম করতে তাকে অনুমতি দেয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিয়ে মুসলমানের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যা ইসলামের রীতি-নীতি অনুযায়ীই হওয়া উচিত।

কিন্তু এ প্রসঙ্গে আয়েশা সিদ্দিকার যুক্তি ফেলে দেওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, একজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ হচ্ছে বিয়ে নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রি করা, বিয়ে পড়ানো নয়। সাক্ষীদের সইসাবুদসহ একজন কাজি বা রেজিস্ট্রার শুধু আইনসম্মতভাবে বিয়ে নিবন্ধন করেন। আর একজন মৌলভি বা যিনি ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তিনি ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়িয়ে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে আয়েশার আরো যুক্তি হচ্ছে : মেয়েদের নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় বাধাও নেই। নিকাহনামায় বরের স্বাক্ষর, কনের স্বাক্ষর, বরের উকিলের স্বাক্ষর, কনের উকিলের স্বাক্ষর, ইমামের স্বাক্ষর, নিকাহ রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরের আলাদা আলাদা ঘর আছে। সরকারের মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে কাজি বা রেজিস্ট্রার বিয়ের এই আইনি আনুষ্ঠানিকতাই পালন করেন মাত্র, তাহলে একজন নারী কেন নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না? এই লড়াকু নারী আরো বলেন, মেয়েদের ‘পিরিয়ড’ বা মাসিক কোনো অযোগ্যতা হতে পারে না। এটি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিষয়।

আমি আইনের লোক নই, তবে যুক্তির লোক নিঃসন্দেহে। আয়েশা সিদ্দিকার যুক্তিগুলো আমার কাছে তাই অগ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। কারণ বিয়ে বা নিকাহ নিবন্ধক বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের মূল কাজ বিয়ের দালিলিক দায়িত্ব বা নিবন্ধন সম্পন্ন, বিয়ে পড়ানো নয়। বিয়ে পড়ান কোনো আলেম, যিনি ধর্ম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। আর বিয়ে পড়ানোর আনুষ্ঠানিকতাগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাড়িতে হয়ে থাকে, মসজিদে নয়। মসজিদে হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। তাই একজন যোগ্যতাসম্পন্ন নারীর পক্ষে কাজি বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হতে বাধা থাকবে কেন?

আয়েশা সিদ্দিকা জানিয়েছেন, তিনি হাইকোর্টের রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি বলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হয়তো আপিল করবেন তিনি। ফলাফল কী হবে, তা সর্বোচ্চ আদালতই নির্ধারণ করবেন। তবে এই নারী আশা করেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে তিনি সুবিচার লাভ করবেন। নারীর সম-অধিকারের লড়াইয়ে আয়েশা জয়ী হোন, আমরা এ আশাই করি।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও কলামিস্ট

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা