kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

কিশোরদের নৈতিক ও পারিবারিক যত্ন জরুরি

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কিশোরদের নৈতিক ও পারিবারিক যত্ন জরুরি

দেশের অনেক কিশোর সামাজিক অবক্ষয়জনিত কারণে ক্রমেই ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। ইদানীং পত্রপত্রিকায় ‘কিশোর গ্যাং’ বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো খবর আসছে। কিশোরদের এমন অপরাধসংক্রান্ত খবর আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে আমরা নিজেরাই এর দায় এড়াতে পারি না। কয়েক বছর ধরে দেশে যে কিশোর গ্যাং কালচার তৈরি হয়েছে এবং এর সঙ্গে যেসব কিশোর জড়িত, তার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন কিছু নয়। এসব কিশোর তাদের পরিবার থেকে কোনো ধরনের শাসন-বারণ এবং নীতিনৈতিকতার শিক্ষা পায়নি বা পাচ্ছে না। অভিভাবকরা তাদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার থেকে শাসনের বদলে পাচ্ছে প্রশ্রয়। তাদের নামে কেউ অভিযোগ জানালে উল্টো তার মুখ বন্ধ করা হচ্ছে ক্ষমতা ও টাকার দাপটে।

সম্প্রতি ব্ল্যাকমেইল করে কিশোরীদের ধর্ষণ ও হত্যার মতো কয়েকটি ঘটনা আমাদের ব্যথিত এবং শঙ্কিত করেছে। যত দিন সমাজ থেকে দুর্নীতি, অবৈধ অর্থ, অপরাধীকে প্রশ্রয় দান বন্ধ না হবে, যত দিন আইনের কঠোর প্রয়োগ না হবে, যত দিন অভিভাবকরা সচেতন না হবেন, তত দিন এ ধরেনের অপরাধ বাড়তেই থাকবে—সেটি মোটামুটি নিশ্চিত করে বলা যায়। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় যে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সমাজে নানা অসংগতি রয়েছে। নিজেদের সংস্কৃতি থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে আমাদের দেশের কিশোররা। তাদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে। কিশোর বয়সে হিরোইজম ভাব থাকে। আবার কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘গ্যাং কালচার’ গড়ে উঠছে। পাশাপাশি ইদানীং আমরা অনুধাবন করছি যে মাদকের ভয়ংকর নেশা দেশের কিশোর এবং তরুণসমাজের একটি বড় অংশকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে চলেছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও কিশোর ও তরুণদের ইয়াবা আসক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে সহজেই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে সম্ভাবনাময় তরুণ ও কিশোররা।

একটি শিশুর বেড়ে ওঠা, সুশিক্ষা লাভ, সভ্য এবং মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন হওয়ার প্রাথমিক শিক্ষালয় তার পরিবার। এ শিক্ষার শিক্ষক তার মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য। তারপর স্কুলের শিক্ষক, সমাজের সৎসঙ্গ শিশুটিকে সভ্য মানুষে পরিণত হতে ভূমিকা রাখে। আমাদের সমাজে এখন এমনসব অঘটন ঘটছে, যা কল্পনাও করা যায় না। আমাদের পরিবার ও সমাজে নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের যে চরম অবক্ষয় চলছে, এসব ঘটনা তার বহিঃপ্রকাশ। যেসব কিশোর এমন পাশবিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, তাদের পারিবারিক নৈতিক শিক্ষায় ঘাটতি রয়ে গেছে। তাদের অভিভাবকরা সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারেনি।

বর্তমান সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় কিশোর ও তরুণরা মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটারনির্ভর হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউব থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অ্যাপের মাধ্যমে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে। এতে কিশোর-কিশোরীরা প্রভাবিত হচ্ছে। আমাদের দেশে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে কথা বলা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না। বহু বছর ধরেই আমাদের রাজনীতিতে বিভাজন ও হিংসা-বিদ্বেষ চলে আসছে। এই বিভাজন এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে সরকারি দল যেমন বিরোধী দলকে সহ্য করতে পারে না, তেমনি বিরোধী দলও সরকারি দলকে সহ্য করতে পারে না। আবার বর্তমান সময়ে সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ দাপট ও প্রভাব কিশোরদের অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে। যেকোনো অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতার যোগসূত্র লক্ষ করা যায়। বলা বাহুল্য, ক্ষমতার এই বাড়াবাড়ি ও বিভাজন সমাজকেও বিভক্ত করে দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে অপরাধী নির্বিঘ্নে অপরাধ করার দুঃসাহস দেখায়। ফলে রাজনৈতিক শক্তিই অপরাধ বৃদ্ধিও মূল ক্রীড়নক হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে থাকে।

বর্তমান সময়ে কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কিশোর এবং তরুণ শ্রেণি ভয়ংকর সব অপরাধে জড়াচ্ছে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বনের কথা বললেও তা এখনো চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে দায়িত্বশীলতার কিছুটা ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

সার্বিক বিচারে মোটা দাগে বলা যায়, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই কিশোর অপরাধের চিত্র ক্রমেই বেড়ে চলেছে। শুধু গণমাধ্যম ব্যবহার করে সামাজিকভাবে সচেতন করে তোলাই নয়, এ বিষয়ে আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করার সময় এসেছে। কিশোরদের সচেতনতা সৃষ্টি এবং নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে মূলত পরিবার নিজ উদ্যোগে এগিয়ে না এলে অন্য কোনো উদ্যোগে সেটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা