kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

সরকার ও জরুরি সহায়তা কর্মসূচি

পল ক্রুগম্যান

১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হয়তো দৃশ্যমান বস্তুগুলোর কারণে এটা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমসংকোচনশীল বুদবুদ দশা কেন হয়েছে সে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানা খুব কঠিন। আমি খুশি, জানুয়ারির ২০ তারিখের পর আর ভাবতে হবে না, তার নট-এট-অল বিউটিফুল মনে কী চলছে তার বিষয়ে। তবে মনে হয়, তাকে দেখতে কেমন দেখায় সে ব্যাপারে তিনি সচেতন হয়েছেন। গলফ খেলতে খেলতেই দেখেছেন তিনি। তখন লাখ লাখ বিপন্ন পরিবার তাদের ‘বেকারত্ব ভাতা’ হারিয়েছেন।

যুক্তি যা-ই হোক, রবিবার তিনি একটি ইকোনমিক রিলিফ বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যার ফলে (অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে) সেসব বেনিফিটের মেয়াদ কয়েক মাসের জন্য বাড়বে। এতে শুধু যে কর্মহীন লোকেরা স্বস্তি পাবে তা নয়; স্টক মার্কেট ফিউচারসও বেড়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকস ২০২১ সালের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাপ করে রেখেছে।

একটি বছর শেষ হলো। বসন্তে আমরা যে শিক্ষা পেয়েছি সে শিক্ষার একটি সেকেন্ড ডেমনস্ট্রেশন দিয়ে তা শেষ হয়েছে। কী শিক্ষা আমরা পেয়েছি বসন্তে? আমরা বুঝেছি, সংকটের সময়ে অসহায় মানুষের মাঝে সরকারি সহায়তাদান ভালো একটি বিষয়। যারা সহায়তা পাচ্ছে শুধু তাদের জন্য নয়, বরং গোটা জাতির জন্যই এটা ভালো। একটু ভিন্নভাবে দেখলে বলা যায়, ২০২০ সাল হচ্ছে সেই বছর, যে বছর রিগ্যানিজমের মৃত্যু ঘটেছে।

রিগ্যানিজম সম্পর্কে আমি যা বলতে চাই তা হলো, এটি ভুডু ইকোনমিকসেরও বেশি কিছু; এ কথার অর্থ হচ্ছে, কর কর্তনের (ট্যাক্স কাট) জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে এবং তা সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে! যাই হোক, এসব কথা কেউ বিশ্বাস করে না, গুটিকতক গুনিন জাতীয় লোক আর বদ্ধমূল বিশ্বাসের লোক ছাড়া; তাদের সঙ্গে আছে পুরো রিপাবলিকান পার্টি।

আমি বড় পরিসরে কিছু বলতে চাচ্ছি। যারা অভাবে আছে তাদের জন্য সহায়তা সব সময় ব্যাকফায়ার করে, এমন একটা ধারণা আমাদের সমাজে আছে। সাধারণ মানুষের জীবন উন্নত করার একটাই উপায় আর সেটা হলো ধনীকে আরো ধনী করতে হবে এবং সুবিধা চুইয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে—এমন ধারণাও আছে। এ ধারণা মোড়কবন্দি হয়েছে রোনাল্ড রিগ্যানের বিখ্যাত উক্তিতে; তাঁর উক্তির সবচেয়ে ‘ভীতিকর’ কথাগুলো ইংরেজিতে এ রকম : ‘আই এম ফ্রম দ্য গভর্নমেন্ট, অ্যান্ড আই এম হেয়ার টু হেল্প।’

ভালো কথা। ২০২০ সালে সরকার সহায়তা করার জন্য ছিল এবং সহায়তা সরকার দিয়েছেও।

এ কথা সত্য, কিছু লোক ছিল যারা ট্রিকলডাউন পলিসির পক্ষে ওকালতি করেছে, এমনকি এ মহামারির সময়েও। ট্রাম্প বারবার জোর দিয়েছেন পে-রোল ট্যাক্সকাটের জন্য। সংজ্ঞা অনুযায়ী চাকরিহীন লোকদের সহায়তা করার জন্য এ ব্যবস্থার কিছুই করার নেই। এমনকি নির্বাহী আদেশে ট্যাক্স কালেকশন কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার ব্যবস্থাও নেই।

নতুন রিকভারি প্যাকেজে বিজনেস মিলের (মিটিংয়ে আপ্যায়ন) জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের ট্যাক্স ব্রেক রাখা হয়েছে, যেন দুপুর বেলার আয়েশি বা নবাবি খাবার (ব্যবসায়ী ও আইনজীবীদের জন্য) মহামারিতে যে মন্দাদশা দেখা দিয়েছে তার একটা ফায়সালা।

অসহায় বা অভাবগ্রস্ত মানুষদের সহায়তার নামে রিগ্যান স্টাইল বিরূপ মানসিকতাও রয়েছে। কিছু কিছু রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদ আছেন, যাঁরা বলছেন যে বেকার বা কর্মহীনদের সহায়তা দেওয়া আসলে বেকারত্বের পরিবেশ তৈরি করা—শ্রমিকদের চাকরির সুযোগ গ্রহণে অনিচ্ছুক করে তোলার মাধ্যমে তা করা হয়।

সব মিলিয়ে বিষয়গুলো কিছু মাত্রায় দুঃখজনক হলেও এ কথা বলা যায় যে মারাত্মক একটি ভাইরাসের কারণে লকডাউনে যেতে বাধ্য হওয়া একটি জাতির প্রকৃত প্রয়োজনের বিষয়ে মার্কিন অর্থনৈতিক নীতি কার্যত বেশ ভালো সাড়া দিয়েছে। কর্মহীনদের প্রতি সহায়তা এবং বিজনেস লোন, যা মাফ করে দেওয়া হয়েছে, সেসব যদি পে-রোলের জন্য ব্যবহার করা হতো, তাহলে ভোগান্তি কমত। বেশির ভাগ পূর্ণবয়স্ক লোককে সরাসরি চেক দেওয়া বেস্ট টার্গেটেড পলিসি ছিল না বটে, তবে এটা পারসোনাল ইনকামকে বেগবান করেছে।

বড় বড় সরকারি হস্তক্ষেপে কাজ হয়েছে। লকডাউন থাকা সত্ত্বেও (যার ফলে ২২ মিলিয়ন চাকরি অস্থায়ীভাবে দূরীভূত হয়ে গেছে) যতক্ষণ সরকারি সহায়তা অব্যাহত ছিল, ততক্ষণ দারিদ্র্য সত্যি সত্যি নিম্নগামী হয়েছে। এসবের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান নেতিবাচকতা ছিল না। আমি এরই মধ্যে উল্লেখ করেছি যে কর্মহীনদের সহায়তা করার কারণে শ্রমিকরা (যখন কাজ বা চাকরি প্রাপ্য হয়েছে) কাজ গ্রহণ করা থেকে বিরত হয়েছে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, এপ্রিল থেকে জুলাই মাস সময়ে এমপ্লয়মেন্ট বেড়েছে। ওই সময়ে ৯ মিলিয়ন লোক কাজে ফিরেছে; প্রণোদিত সুবিধাবলি (এনহ্যান্সড বেনিফিট) তখনো সক্রিয় ছিল। বিশাল অঙ্কের সরকারি ধারকর্জ বিরূপ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করেনি। ইন্টারেস্ট রেট কম ছিল, মূল্যস্ফীতিও স্থির ছিল।

সরকার সহায়তার জন্য ছিল এবং সত্যিই সহায়তা করেছে। একটাই সমস্যা ছিল, সরকার অতি দ্রুত সহায়তা কর্মসূচি বাতিল করেছে। এই সহায়তা অব্যাহত রাখা উচিত ছিল, কারণ এখনো করোনাভাইরাস প্রচণ্ড বিক্রমে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। যাই হোক, দুই দলের মনের ইচ্ছা গোপনে স্বীকৃত হয়েছে—সেকেন্ড রেসকিউ প্যাকেট আইনে পরিণত করার বিষয়ে তারা একমত হয়েছে। ধরে নেওয়া যায়, ট্রাম্প মিনমিন করলেও এই আইনে সই করবেন।

২০২০ সালে আমরা যে সহায়তা দিয়েছি, ব্যাপকহারে টিকাদানের পরও তা অব্যাহত রাখা উচিত। গত বসন্তে আমাদের যে শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল তা হলো, পর্যাপ্ত তহবিল নিয়ে সরকারি সহায়তা কর্মসূচির কাজ শুরু হলে দারিদ্র্য অনেক কমতে পারে। মহামারি শেষ হতে না হতেই এই শিক্ষা আমরা কেন ভুলে যাব?

আমি যখন বলি, রিগ্যানিজম ২০২০ সালে অক্কা পেয়েছে, তখন আমি এ কথা বলি না যে ‘ইউজুয়াল সাসপেক্টস উইল স্টপ মেইকিং দ্য ইউজুয়াল আর্গুমেন্টস।’ ভুডু ইকোনমিকস আধুনিক রিপাবলিকানদের মগজে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে এবং তা কর কর্তনে মগ্ন বিলিয়নেয়ার ডোনারদের কাছে খুব কার্যকর ব্যবস্থা মনে হয়। অপ্রচলন বা ভিন্ন রকম ঘটনাবলির উপস্থিতিতে এসব যুক্তি উবে যাবে। ২০২০-এর শিক্ষা হচ্ছে এই, সংকটকালে এমনকি স্বাভাবিক সময়েও সরকার সাধারণের জীবন উন্নত করার ব্যাপারে অনেক কিছু করতে পারে। কোনো সরকার যদি এই দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানায় তাকেই বরং বেশি ভয় পাওয়া উচিত।

লেখক : সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কের গ্র্যাজুয়েট সেন্টারের অধ্যাপক; অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত

সূত্র : দি নিউ ইয়র্ক টাইমস

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা