kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

সবার জীবনগ্রাহ্য উন্নতি চাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সবার জীবনগ্রাহ্য উন্নতি চাই

তাহলে এখন আমাদের উপায় কী? নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা? কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করবে? লাগাম কার হাতে? সবাই তো ছুটছে। এবং প্রতিযোগিতাটা কে কার আগে যাবে সেটা ঠিক করারই। ল্যাং মারতেও কুণ্ঠা নেই। আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের বিপন্নদশা বৃদ্ধি পাবে। জাতিসংঘ বলছে, ২০২১ সালে একটা মানবিক বিপর্যয় দেখা দেওয়ার শঙ্কা। পরস্পরকে দোষারোপের কোনো অবধি থাকবে না। চীন ছাড়িয়ে যাবে আমেরিকাকে। খরগোশটি ভাববে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তাই কচ্ছপটি এত দূর গেছে, এবার এক দৌড়ে কচ্ছপকে সে ছাড়িয়ে যাবে। আমেরিকানরা বলেছিল, করোনার জন্য সব দায়িত্ব চীনেরই; দায়িত্ব যতটাই হোক, উদ্ভব তো চীন থেকেই। এখন তো আরো জানা যাচ্ছে, চীন ভাইরাস সংক্রমণের খবরটা লুকিয়ে রাখার তালে ছিল। আবার আশ্চর্য, চীন এখন এও বলছে যে ভারত ও বাংলাদেশই নাকি রোগটি ছড়ানোর জন্য দায়ী। পেছনে নিশ্চয়ই রাজনীতি আছে। যা-ই ঘটুক, উন্নতির কারণে পৃথিবী যে শান্ত থাকবে না সেটা নিশ্চিত। চীন তো এখন চাঁদেও হাত রাখার আয়োজন করছে। পুঁজিবাদে এই নবদীক্ষিতকে থামায় কে?

এককালে আশা করা হয়েছিল, বিজ্ঞানের কারণে পৃথিবী প্রাচুর্যে ভরে যাবে। বিজ্ঞান সে কাজ করছিল বৈকি। উৎপাদনের ক্ষেত্রে, চিকিৎসার বেলায়, যোগাযোগের ব্যাপারে বিজ্ঞান যেসব পরিবর্তন এনেছে সেগুলো বৈপ্লবিক। কিন্তু বিপ্লব ঘটেনি মালিকানার পুরনো জায়গাটায়। মালিকানা রয়ে গেছে সেই মুষ্টিমেয়র হাতেই, বিজ্ঞানকে যারা ব্যবহার করেছে নিজেদের আজ্ঞাবহ হিসেবে। বিজ্ঞানের সাহায্যে তারা মানুষ মারার নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছে এবং সেগুলো প্রয়োগ করেছে, বিশেষভাবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধে। বিজ্ঞানকে এখন লাগানো হচ্ছে পৃথিবীর জন্য বিপদ ডেকে আনার মারাত্মক কাজটিতে।

এরই মধ্যে কথিত চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার আগেই, ওই বিপ্লবের আগমন বার্তা পৌঁছে গেছে। মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এক ‘ভার্চুয়াল’ জগতে। ভার্চুয়াল বলতে এত দিন জানতাম ‘যথার্থ’কে, ‘প্রকৃত’কে; এখন ভার্চুয়ালের অর্থটা দেখছি দাঁড়িয়েছে ‘অবাস্তব’। ছবি, শব্দ, লেখা ইত্যাদির সাহায্যে একটা জগৎ তৈরি করা হচ্ছে, যেটা কৃত্রিম। কিন্তু সেটাই গ্রাস করে নিতে চাইছে বাস্তব জগত্টাকে। রিয়াল বুঝি বা হারিয়ে যাবে ভার্চুয়ালের মুখগ্রাসের ভেতরে। মানুষ ছায়ার সঙ্গে কথোপকথন করবে, ভাববে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারটা উঠে যাবে। যে অস্পৃশ্যতাকে এতকাল ধরে আমরা ভীষণ ঘৃণা করে এসেছি, ধিক্কার দিয়েছি, যেটাকে উপড়ে না ফেলার জন্য ক্ষমতাসীনদের নিন্দা করেছি, সেই অস্পৃশ্যতা এখন সর্বজনীন, বৈধ ও আদরণীয় হয়ে উঠছে। করোনাকালে কোলাকুলি তো অবশ্যই, হাতে হাত মেলানোও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে; রাষ্ট্রপ্রধানরা রিয়াল জগতে ক্বচিৎ মিলিত হলে হাত না মিলিয়ে এখন কনুই মেলাচ্ছেন, কনুই দিয়ে গুঁতাগুঁতি করে যেন ঘুসাঘুসির ইচ্ছাটাকে দমনে রাখছেন। জানি, করোনা একসময়ে নিয়ন্ত্রণে আসবে, ভ্যাকসিন এসে গেছে; কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা পুরনো সেই কোলাকুলির স্তরে শারীরিকভাবে যদি বা ফিরে আসেও, তবু মানসিকভাবে ফিরে আসাটা যে ক্রমাগত কঠিন হতে থাকবে সেটা নিশ্চিত। বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, বিচ্ছিন্নতা বাড়তেই থাকবে। প্রতিযোগিতা নির্মম না হয়ে পারে না; যদি না পৃথিবীটা বদলায়।

ওদিকে উন্নতি তো হতেই থাকবে। আর তার ধরনটা যে কী দাঁড়াবে সে নিদর্শনও যত্রতত্র দেখা যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান এলাকায় ক্ষুদ্র একটি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। ম্রো তাদের নাম। চিম্বুক পাহাড়ের নিচে থাকে, জুম প্রথায় চাষবাস করে। তাদের ওই এলাকাটার ওপর চোখ পড়েছে উন্নয়নকারীদের, অনেককাল আগে রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত কবিতাটিতে জমিদারবাবুটির যেমন চোখ পড়েছিল উপেনের দুই বিঘার ওপর। ম্রোদের বসবাসের এলাকায় পাঁচতারা হোটেল ও বিনোদন পার্ক হবে, সব ধরনের আমোদ-প্রমোদের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হবে, দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আসবেন, এলাকাটা আর পশ্চাৎপদ থাকবে না, পরিপূর্ণরূপে আধুনিক হয়ে যাবে। তবে ম্রোদের ছয়টি গ্রাম আর তাদের থাকবে না, হয়ে যাবে একেবারে আন্তর্জাতিক। ম্রোরা যেখানে পারুক যাক, মরুক কি বাঁচুক সেটা তাদের নিজেদের ব্যাপার। তা ম্রোদের অপরাধটা কী? সে প্রশ্নের জবাব, তারা দুর্বল। জবাব দেওয়ার প্রয়োজনই নেই। প্রতিবাদ? ম্রোরা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা শক্তিতে অকিঞ্চিৎকর, সংখ্যায় সামান্য, তাদের সাধ্য কী উন্নতির প্রাচীর ভেদ করে নিজেদের বক্তব্যকে বাইরে নিয়ে যায়। তাদের পক্ষের মানুষ? খুবই অল্প। কেননা ওখানে মুনাফার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, উল্টো লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে অল্পস্বল্প গুঞ্জন উঠবে হয়তো; কিন্তু ওঠার পরপরই তা মিলিয়ে যাবে। যাঁরা গুঞ্জন তুলবেন, তাঁরা হয়তো ভাববেন মস্ত কাজ করেছি, লাইক দিয়ে দিয়েছি।

কেবল ভার্চুয়ালের বলে নয়, আরো কিছু শব্দের অর্থ বদলে গেছে। যেমন র‌্যাডিক্যাল। র‌্যাডিক্যাল বলতে একসময় ‘উগ্র’ বামপন্থীদেরই বোঝানো হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর শব্দটির অর্থ আমূল পাল্টে গেল, যারা উগ্র ডানপন্থী তারাই র‌্যাডিক্যাল হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ল। এখন তো দেখছি জঙ্গিদেরও র‌্যাডিক্যাল বলা হচ্ছে। তারাও নাকি ‘বৈপ্লবী’। কোনটা বিপ্লব আর কোনটা প্রতিবিপ্লব ঠিক থাকছে না, গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এসব শব্দের অর্থ আমরা ঠিক করি না, ঠিক করে দেন আমাদের মুরব্বিরা। তবে আমাদের আওয়াজগুলো তাঁরা যে শুনতে পান না এমন নয়। গোয়েন্দা আছে। অক্সফোর্ডের অ্যাডভান্সড লারনার্স ডিকশনারি তাদের ২০১৯ সালের নতুন সংস্করণে উপমহাদেশে প্রচলিত কয়েকটি শব্দের জন্য জায়গা করে দিয়েছে। শব্দগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘চামচা’, আরেকটি ‘চোপ’। চামচা অর্থ লিখেছে কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে এমন লোক। অর্থ ঠিকই আছে। তবে সেটা এককথায় প্রকাশ করা যেত। সেটি হলো চাটুকার। চাটুকার পৃথিবীর সব দেশেই আছে, যেমন আছে তেলাপোকা। কিন্তু চাটুকারদের উৎপাত উপমহাদেশে খুব বেশি। রাজা-বাদশাহদের চাটুকার ছিল; এখন চাটুকার পাওয়া যায় সরকারের এবং পুঁজিবাদী উন্নতিরও। বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এদের উপস্থিতি খুবই দৃশ্যমান। ওই অভিধানে ‘চোপ’ শব্দের অর্থ বলা হয়েছে রূঢ়ভাবে কাউকে কথা থামাতে বলা। অর্থ সঠিক। চোপ বলা হরদম চলছে। কিন্তু সেটা কর্তারাই শুধু বলার অধিকার রাখেন। চোপ বলে ধমক দেওয়া দরকার চাটুকারদের। বলা হয় না। কর্তারা চাটুকারদের ভারি পছন্দ করেন।

আবারও সেই প্রশ্ন, তাহলে? এভাবেই কি বিশ্ব উন্নত হতে থাকবে, হতে হতে পাহাড়ের সেই চূড়ায় গিয়ে পৌঁছবে, যেখান থেকে ফেরার উদ্যম ও পথ কোনোটাই আর অবশিষ্ট থাকবে না, পতন ঘটবে গভীর উপত্যকায়? কবির সেই যে প্রশ্ন, স্বর্গ কি হবে না কেনা, তার জবাবটা কি নেতিবাচকই রয়ে যাবে শেষ পর্যন্ত? তা স্বর্গ জিনিসটা আসলে কী? কোথায় থাকে সে? অবস্থানটা কী ভৌগোলিক, নাকি মানসিক? ভূগোলে তো তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আদর করে কাশ্মীরকে একসময় ভূস্বর্গ বলা হতো, সেখানে তো এখন রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। ধর্মীয় স্বর্গ পরলোকের; কিন্তু ইহলোকেও স্বর্গ আছে, আর সেটা অন্য কোথাও নয়, মনের ভেতরেই, এমনটা বলা হয়েছে। কিন্তু নরককেও তো তাহলে মনের ভেতরই খুঁজতে হয়।

ইহলোকের স্বর্গ হচ্ছে একপ্রকারের সম্পর্ক। নরকও তাই। স্বর্গীয় সুখের মতো নারকীয় যন্ত্রণাও আসে সম্পর্ক থেকেই। সম্পর্কগুলো ছড়িয়ে রয়েছে—গৃহে, দেশে, বিশ্বময়। সম্পর্ক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির; ব্যক্তির সঙ্গে পরিবেশের, প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণীর এবং ব্যক্তির নিজের ভেতরেও একাংশের সঙ্গে অপরাংশের। সম্পর্কগুলোর প্রতিটির ক্ষেত্রেই কিন্তু দ্বন্দ্ব চলছে। সে দ্বন্দ্বে সুখের জয় হলে তা স্বর্গীয় হবে এমন আশা, দুঃখের জয়ে নরক যন্ত্রণার শঙ্কা। উন্নতির পুঁজিবাদী ধরনটা স্বর্গসুখ আনছে না, আনছে নারকীয় যন্ত্রণা। আর সে যে ক্ষান্ত হবে তাও নয়, যন্ত্রণা শুধুই বাড়ছে, নরক সমগ্র বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সংকুচিত করে দিচ্ছে স্বর্গসুখের সম্ভাবনাকে। ভাবখানা এই রকমের যে আগামী দিনে নরকই সত্য হবে, স্বর্গ পরিণত হবে সুখের অতীত স্মৃতিতে।

তাহলে? উপায় কী? সংস্কারে কি কুলাবে? না, মোটেই কুলাবে না। প্রয়োজন হবে মৌলিক পরিবর্তনের। এককথায় উন্নতির ধারাটাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে ফেলা চাই। উন্নতির মালিকানাটা করা চাই সামাজিক। সবার জন্য, সবার জীবনগ্রাহ্য উন্নতি চাই। শুধু এক দেশে নয়, চাই পৃথিবীর সর্বত্র।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা