kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

ইতিহাস সৃষ্টির পথে

ইকরামউজ্জমান

১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইতিহাস সৃষ্টির পথে

ঘরোয়া ফুটবল মৌসুম শুরুর আগে দলগুলোর খেলোয়াড়দের গা গরমের মাধ্যমে চনচনে করা, নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য পরখ করে নেওয়ার জন্যই ১৯৮০ সাল থেকে আয়োজিত হচ্ছে ফেডারেশন কাপ। এবারে ৩২তম আসরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বসুন্ধরা কিংস। তারা ফেভারিট হিসেবেই খেলতে নেমেছিল। একটি দল নিজেদের সামর্থ্যের ক্ষেত্রে কত বেশি আত্মবিশ্বাসী হলে বলতে পারে, জয় ছাড়া ভাবনায় আর কিছু নেই। সম্মিলিতভাবে ইতিবাচক মানসিকতা একটি দলের অনেক বড় শক্তি। আর এই মনোভাবের জন্ম তো আর এমনি এমনি হয়নি, এর পেছনে আছে ক্লাব ম্যানেজমেন্টের পেশাদার উদ্যোগ, সুশাসন, শৃঙ্খলা ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য। যে দল জয়ের ক্ষুধায় ভোগে, সেই দলকে তো আটকে রাখা সম্ভব নয়। বসুন্ধরা কিংসের ‘প্লাস পয়েন্ট হলো দেশি ও বিদেশি পারদর্শী খেলোয়াড় সংগ্রহ। ক্লাবে এমন একটি পরিবেশ যেখানে খেলোয়াড়রা নিজেদের কাজের প্রতি ফোকাস ও দায়বদ্ধ। কৌশল, দক্ষতা, দৃঢ়সংকল্প, খেলার প্রতি মনোযোগ এবং তীব্র চাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্যদের অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা অনেক বিস্ময়ের জন্ম দিতে পারে। বসুন্ধরা কিংস অল্প সময়ের মধ্যে দেশের ফুটবলে একটি স্থান নির্ধারণ করেছে। নতুন ইতিহাস রচনা শুরু করেছে। দেশের ফুটবলে নতুন আবেদন, আকর্ষণ ও আবেগের জন্ম দিয়েছে। শুরু থেকেই ক্লাবটি অন্যদের থেকে ‘ডিফারেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বসুন্ধরা কিংস সাইফ স্পোর্টিংকে ১-০ গোলে ফাইনালে পরাজিত করেছে। তারা গত বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আর এর আগের বছর ফাইনালে (২০১৮) প্রথম খেলতে নেমে তাদের অর্জন ছিল রানার্স-আপ। চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আবাহনী। সেই আবাহনী এর পর থেকে এখন পর্যন্ত বসুন্ধরার বিপক্ষে লড়াইয়ে আর পেরে ওঠেনি। এবার তো সেমিফাইনালে আবাহনীকে সরিয়ে দিয়ে ফাইনাল খেলেছে বসুন্ধরা কিংস। এই আবাহনী কিন্তু ফেডারেশন কাপে ১১ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। এরপর আর ফাইনালে খেলতে পারেনি।

এবারের ফাইনালে উভয় দল উপহার দিয়েছে চিত্তাকর্ষক, গতিময় ও উপভোগ্য ফুটবল। ফাইনালে উভয় দলের খেলোয়াড়দের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়েছে! দেখেছি, খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তিমত্তা, আত্মবিশ্বাস, টেকনিক্যাল দক্ষতা ও কৌশলগত অবস্থান। ম্যাচ জেতার জন্য শুধু লড়াই করলে হবে না, ম্যাচ জিততে হলে ভাগ্যের সহায়তা লাগে। গোল করতে না পারলে ফুটবলে আধিপত্য দিয়ে কিছু এসে যায় না। গোলটি সুন্দর, না অসুন্দর এটি কেউ মনে রাখে না। গোল হয়েছে, এটাই মুখ্য। আর গোলই তো জেতায়। বিদেশের ও দেশের তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত সাইফ স্পোর্টিং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেই ফাইনালে উঠেছে। স্থানীয় তরুণ খেলোয়াড়রা একসঙ্গে দু-তিন বছর ধরে খেলছেন। এতে তাঁদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। তাঁরা কিন্তু ক্রমেই পক্ব হচ্ছেন। আমার বিশ্বাস, চলতি প্রিমিয়ার লিগে সাইফ স্পোর্টিং ভালো করবে। বেলজিয়ান কোচ যদি খেলোয়াড়দের ভেতরের বারুদ জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হন, তাহলে সাইফ স্পোর্টিংয়ের মাঠের লড়াইয়ে সব দলের বিপক্ষে ‘থ্রেট’ হয়ে দাঁড়ানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফুটবল ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনকে মেনে নিয়েই চলতে হবে।

ফেডারেশন কাপে বসুন্ধরার বিজয় এবং সাইফ স্পোর্টিংয়ের তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স স্পষ্ট একটি মেসেজ দিয়েছে। আর তা হলো দেশের ফুটবলে দল সমর্থন, দলের প্রতি দুর্বলতা, আনুগত্য, ভালোবাসা ও উন্মাদনার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে! মানুষ দলের সঙ্গে নিজেকে জড়ায় তখন, যখন ভালো খেলা আর বারবার বিজয় উপভোগ করার সুযোগ পায়। বসুন্ধরা সেটা পারছে। ২০১৮ সালে বড় ময়দানে এসে এরই মধ্যে ফেডারেশন কাপ (দুবার), স্বাধীনতা কাপ ও প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জয় করেছে। এরই মধ্যে মাথার ক্যাপে চারটি পালক সংযোজিত হয়েছে। ফেডারেশন কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় এএফসি কাপে খেলা নিশ্চিত হয়ে গেছে। এদিকে সাইফ স্পোর্টিং তরুণদের সংগ্রহ করে দক্ষ জহুরির সাহায্যে তাঁদের মেজেঘষে ছাঁচমাফিক তৈরি করার চেষ্টা করছে। এতে তারা ভালো ফলও পেয়েছে। অন্য ক্লাবগুলোও যদি এ ধরনের উদ্যোগ নেয় (এটা ক্লাবেরই কাজ), তাহলে দেশের ফুটবলে হতাশা দূর হতে সময় লাগবে না।

সময়োপযোগী বিকশিত হতে পেরেছে বলেই বসুন্ধরা কিংস দেশের ফুটবলে নতুন পাওয়ারহাউস হিসেবে চিহ্নিত হতে পেরেছে। সময়কে তারা গড়তে পারছে। ফুটবলে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ক্লাব ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া মানেই তো দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বৃহত্তর ফুটবলের প্রাণশক্তিতে অবদান রাখা।

ঘরোয়া ফুটবলে ক্লাব সমর্থন একটি বিরাট বিষয়। সমর্থক ও ভক্তদের মাঠের বাইরের শক্তি মাঠে অনেক বড় শক্তি। তাদের প্রত্যাশা শুধু জয় আর জয়। আর এটি ফুটবল মাঠে মাদকের মতো কাজ করে। ঢাকার ফুটবলে নব্বইয়ের দশকে আবাহনী ও মোহামেডানের কাছে সমর্থক ও ভক্তদের একটাই প্রত্যশা ছিল, যেভাবেই হোক মাঠে জিততে হবে। এই উন্মাদনা ফুটবলকে জমিয়ে রেখেছিল; কিন্তু ফুটবলের উন্নতিতে কি অবদান রাখতে পেরেছে?

ফেডারেশন কাপে আমরা কী পেয়েছি এই প্রশ্নটা উঠতেই পারে। স্থানীয় খেলোয়াড়দের কী ভূমিকা ছিল। বিদেশিরাই দলগুলোকে তো টেনে নিয়ে গেছেন। এটাই বাস্তবতা। জাতীয় দলে খেলবেন কিন্তু স্থানীয়রা। তাঁদের গোল করার তো অভ্যাস গড়ে উঠছে না। এর প্রতিকার কিভাবে হবে? ফুটবল পণ্ডিতরা কী ভাবছেন।

একসময়ের অন্যতম জনপ্রিয় দল মোহামেডান গত ১০ বছরে একবারও ফেডারেশন কাপের ফাইনালে উঠতে পারেনি। অথচ অতীতে এই ক্লাব ১০ বার কাপ জিতেছে। মোহামেডান লিগ শিরোপা শেষবারের মতো কখন জিতেছিল এটা খাঁটি ক্লাব সমর্থক ও ভক্ত অনেকেই হয়তো হঠাৎ করে বলতে পারবেন না। অথচ এই ক্লাব ১৯৫৭ সালে লিগ শিরোপা প্রথম অধিকারের পর আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। যুগ যুগ ধরে ভক্তদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ক্লাব মোহামেডানের সঙ্গে পাল্লা দিতে এসে পিছিয়ে গেছে। মোহামেডান এগিয়েই গেছে। সেই মোহামেডানের এখন কী অবস্থা! ১৯৪৮ সাল থেকে গত ৭২ বছরের ঢাকার ফুটবলের কী ট্রেন্ড ছিল। ১৯৪৮ সালে ঢাকার প্রথম বিভাগ সিলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভিক্টোরিয়া। পরের বছর ইপি জিমখানা। সেই পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের জয়জয়কার। এরপর ১৯৫৭ সালে মোহামেডানের শুরু। আর পেছন ফিরে তাকায়নি। প্রথমে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ান্ডারার্স, এরপর ভিক্টোরিয়া ও ইপিআইডিসি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফুটবলে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ মাঠে আবাহনীর আবির্ভাব। শুরু হলো আবাহনী-মোহামেডানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগ। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছে কয়েক যুগ। ২০০৭ সাল থেকে প্রিমিয়ার লিগের শুরু। সেখানে আর মোহামেডান নেই। আবাহনীর প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ জামাল ডিসি, শেখ রাসেল কেসি এবং সর্বশেষ বসুন্ধরা কিংস। ১৩তম পেশাদার ফুটবল লিগ শুরু হয়েছে। আর তাই কয়েক মাস অপেক্ষা।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। আজীবন সদস্য

বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন

মন্তব্য