kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শেখ হাসিনার আলোকবর্তিকা

হায়দার মোহাম্মদ জিতু

১২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শেখ হাসিনার আলোকবর্তিকা

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় প্রায়ই ট্যাংক-গোলাবারুদের আনাগোনা দৃশ্যমান হয়। আবার ওই সব দানবাকৃতির ট্যাংক-বারুদের সামনে শিশু-পথচারীদের ইট-পাটকেল, প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানোর খবরও শোনা যায়। আদতে এ ধরনের মারণাস্ত্রের সামনে এসব ছোট ছোট প্রতিরোধ-প্রতিবাদ মোটেও কিছু নয়। কিন্তু এই ছোট ছোট প্রতিরোধ-প্রতিবাদই ইঙ্গিত করে মানসিকভাবে ওই আগ্রাসী শক্তি এখনো তাদের জয় করে নিতে পারেনি। এই ধরনের ছোট ছোট প্রতিবাদের নাম ইনফ্রা পলিটিকস, যা বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষরা কালে কালে করে আসছে।

বাঙালির গৌরব মুক্তিযুদ্ধকে প্রাথমিকভাবে এই ইনফ্রা পলিটিকসের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেখানে তৎকালীন সামরিক জান্তা সরকার ছিল আগ্রাসী শক্তির ভূমিকায়। আর বাঙালি ছিল প্ল্যাকার্ড-পোস্টার, মিছিল এবং রক্ত উৎসর্গের ভূমিকায়। কিন্তু স্পর্ধার বিষয় এই যে বাঙালিকে বেশিদিন ক্ষুদ্র বা পরনির্ভর হয়ে থাকতে হয়নি। আর এর কারণ এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাঙালির প্রদীপ্ত প্রত্যয়ের প্রবাদপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর একক নেতৃত্বসাহসে বাঙালি তাঁর ইনফ্রা পলিটিকসের মোহনাকে শক্তিমত্তা বা জয়ের নোঙর পর্যন্ত নিয়ে গেছে।

তবে এই এত বড় শক্তি এবং শক্তি জোটের সমর্থনেও পরাজয়, এই কলঙ্ক তারা এখনো ভুলতে পারেনি। ফলাফল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় পরবর্তী সময়েও তাদের বলতে শোনা গেছে, এ দেশ তলাবিহীন ঝুড়ি হবে। অর্থাৎ এই দেশ কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। অথচ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী একক নেতৃত্বে বাঙালি আজ সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজয়ের পথে।

সাম্প্রতিক সময়ে করোনা পরিস্থিতিই তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বৈশ্বিক এই মহামারির সংক্রমণ রোধ এবং তার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এমন স্বাভাবিক ও নান্দনিক পর্যায়ে অব্যাহত রেখেছেন যে তা আজ বিশ্বদরবারে প্রশংসিত। ভিন্নভাবে বললে, পিতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে হওয়া মুক্তিযুদ্ধের ‘ব্যাটল অব শিরোমণি’ যেমন আজও বিশ্বের রণকৌশল বিদ্যায় পাঠ্য, তেমনি শেখ হাসিনার করোনা পরিস্থিতি সামাল এবং খাদের কিনার থেকে দেশকে উন্নয়নের উদাহরণ করে তোলার পরিক্রমণও আজ সবার কাছে আলোচ্য ও গবেষণাযোগ্য।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট ছিল। গ্রাম তো দূরের কথা, শহরের সব স্থানে বিদ্যুৎ ছিল না। দেশে আজ শেখ হাসিনার সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৩ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে। শুধু তা-ই নয়, ২০৪১ সাল নাগাদ এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। অথচ বিদ্যুতের এই ডাইনামিক ব্যবহারকে না বুঝেই ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকে ২০০১ সালে বিএনপি কমিয়ে করে ফেলে সাড়ে তিন হাজার!

শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ নিতে জানেন। আর তাই যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক বিএনপি-জামায়াতের বিদ্যুৎ কারচুপিকে হটিয়েও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে শতভাগ বিদ্যুত্ব্যবস্থার আওতায় আনতে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নারী অগ্রযাত্রায় শেখ হাসিনার আলোকবর্তিতা আরো অনন্য। এই কিছুদিন আগেও ভারতীয় প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বাংলাদেশের উন্নয়নকে নান্দনিক বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই উন্নয়নে তিনি যে বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তা হলো বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নারীদের স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে। নারী-পুরুষের এই যৌথ উন্নয়নচিন্তার আরেক ফলাফল যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০৩২ সালের ভেতর বাংলাদেশ ২৫তম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হতে চলেছে এবং সেটা ১৯৩টি দেশের সঙ্গে লড়াই করে।

তবে এ-ও সত্য যে এই অগ্রযাত্রাকে শকুনের মতো গিলে ফেলতে পারে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য এবং বিশৃঙ্খলা। কারণ উন্নয়নের পাশের গলিতেই ধ্বংসের অবস্থান। সে হিসেবে শেখ হাসিনার চলার পথ বেশ বন্ধুর। কারণ ঐতিহাসিকভাবে তাঁর কাছে-দূরে শত্রু সংখ্যা কম নয়। তা ছাড়া দীর্ঘদিনের স্বৈরতন্ত্র এবং উগ্রতা পৃষ্ঠপোষকতায় মস্তিষ্কে-মস্তিষ্কে যে কুসংস্কার গুঁজেছে সেটাকেও না হটিয়ে উপায় নেই। যদিও এ কাজটি খুব কঠিন নয়। সে জন্য প্রয়োজন দেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তাঁর জাতির পিতাকে সব বয়স উপযোগী করে পৌঁছে দেওয়া।

তবে এই পথ নির্বাচনেও আরো কৌশল প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, টুইটারে এক কদম লিখেই অনেকে দায়িত্ব শেষ করে ফেলেন। কারণ সেখানে তাঁর মত প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সহমত, একমত এবং বাহবা পেয়ে যান। অর্থাৎ তাঁর মতেরই ইকো হয়। কিন্তু এটা মূলত ওপরের লেয়ার বা শ্রেণির কাজ। কারণ তাঁর বন্ধু তালিকায় তাঁর অনুসারীরাই আছেন। কাজেই এতে যে সম্পূর্ণভাবে জনগণের ইন্টারনাল ইকো হয় না এটাও পরিষ্কার। আর এই দায়সারা সুযোগটাকেই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কাজে লাগাচ্ছে।

বাঙালি আজও পুঁথিপাঠ, বাউল গানে অনুরণিত হয়। পথনাটক, গীতি নাট্যের মাধ্যমে প্রাণিত হয়। কাজেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি রসবোধের সেই বাঙালিয়ানাকে ধারাবাহিক প্রবাহে ফিরিয়ে আনতে পারলেই বাঙালির স্থায়ী বিজয় অর্জন সম্ভব। যেখানে ধর্ম এবং উগ্রতার লেবাসে বাঙালির ঐতিহ্যগত মেলবন্ধনের সংস্কৃতিকে কেউ আক্রমণ করতে পারবে না।

 লেখক : প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ

[email protected]

 

মন্তব্য