kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

জাদুকরী ব্যক্তিত্ব বিচারপতি মুর্শেদ

রাজিয়া বেগম

১১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাদুকরী ব্যক্তিত্ব বিচারপতি মুর্শেদ

কিছু মানুষ ইতিহাস তৈরি করেন এবং কিছু মানুষ এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন, যা সুনির্দিষ্ট দিকে তাদের পরিচালিত করে। সৈয়দ মাহবুব মুর্শেদ এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি এই দুটি বিষয়কেই একত্র করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সুস্পষ্ট। তাই ইতিহাসবিদরা বিশেষ করে বিচারপতি মুর্শেদকে তাঁর দৃঢ়চেতা ও সাহসী মনোভাব নিয়ে বিচারের রায় প্রদানের জন্য মনে রাখবেন। তাঁর রায়গুলো ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ও তাঁর মৌলিক গণতন্ত্র অনুসারী সরকারের স্বৈরতন্ত্রের জন্য কাঁটা হয়ে উঠেছিল। দেশপ্রেমের নীতি অনুসরণ করার জন্য মুর্শেদ ‘জীবন্ত ইতিহাস’ হয়ে আছেন।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি সেই সময়ের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে বড় বাধা থাকা সত্ত্বেও নির্ভয়ে আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখেছিলেন। সাংবিধানিক প্রশ্নে তাঁর সাহসী রায় ঘোষণার মাধ্যমে বিচারপতি মুর্শেদ নিজেকে শুধু জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং স্বাধীন ও নির্ভীক হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন। নানাভাবে তিনি ছিলেন জনগণের ন্যায়বিচার লাভের আশ্রয়স্থল।

বিচারপতি মুর্শেদ ১৯৫৯ সালে মার্শাল ল সরকারের বিরুদ্ধে প্রথমে আঘাত করেন। তিনি ইপিডিও বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা করেছিলেন। এই কারণে অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ বেকায়দায় পড়েন। মন্ত্রীদের কয়েকজনও অপসারিত হয়েছিলেন। বিচারপতি মুর্শেদ এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আদালত যা মীমাংসা করে তা ক্ষমতার অপব্যবহার নয়।’ আবু মাহমুদ মামলায় গভর্নর মোনেম খানকে তলব এবং একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। বিচারপতি মুর্শেদ তখন গভর্নরের আইনজীবীদের বলেছিলেন, ‘গভর্নরকে বলুন আমার আদালত ন্যায়বিচারের স্থান, ভীতিসঞ্চারের কক্ষ নয়।’ এটা হচ্ছে তাঁর সাহসিকতার নজির। বিচারপতি মুর্শেদের রায়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল পান মামলায় দেওয়া রায়, যা আন্তর্জাতিক আইনবিদদের মতে আইনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা রায়।

তাঁর বাবা ছিলেন বাংলার প্রথম বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর মা হচ্ছেন শেরেবাংলা ফজলুল হকের ছোট বোন। তিনি তৎকালীন কলকাতার মেয়র জাকারিয়ার একমাত্র সন্তানকে বিয়ে করেছিলেন। সৈয়দ মাহবুব মুর্শেদ স্কুলে বা প্রেসিডেন্সি কলেজ বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় বরাবরই একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে স্বাক্ষর রেখেছেন। পরে তিনি লিংকন ইন লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার হয়ে ওঠেন।

১৯৪২ সালে তাঁর মামা ফজলুল হককে সমর্থন করে লেখা তাঁর নিবন্ধ একই সঙ্গে ‘স্টেটসম্যান’ কলকাতায় ও ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, যা পাঠকদের মধ্যে সাড়া জাগায়। মুর্শেদের মানবতাবাদী মন তাঁকে ‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম’ গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পঞ্চাশের দশকে তিনি একজন বিচারকের দায়িত্ব পালনকালে রেড ক্রসের চেয়ারম্যান ছিলেন। এ ছাড়া তিনি সারা জীবন অনেক আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে জিন্নাহ যখন বলেছিলেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ মুর্শেদ তখন তাঁর মামা শেরেবাংলা এবং অন্যদের সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘না! না! না!’ মুর্শেদ ‘লিয়াকত-নেহরু’ চুক্তি প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার অবসান করা। ঢাকায় ফিরে তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদদের জানাজায় অংশ নেওয়ার পর মুর্শেদ তাঁর মামা শেরেবাংলার সঙ্গে মিছিলে শরিক হন। এই মিছিলে লাঠিচার্জ করা হয়েছিল। পুলিশ সেদিন মামা ও ভাগ্নে দুজনকেই কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখেছিল।

বিচারপতি মুর্শেদ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। সর্বোচ্চ মহলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি ১৯৬১ সালে সারা দেশে রবি ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের আয়োজন করেছিলেন।

১৯৫৪ সালে মুর্শেদ তাঁর মামার নেতৃত্বে আবুল মনসুর আহমদের সঙ্গে ঐতিহাসিক ২১ দফার খসড়া তৈরি করেছিলেন, যা তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করেছিল। ১৯৬৬ সালের দিকে অগাধ দেশপ্রেমের কারণে তিনি আবারও ঐতিহাসিক ছয় দফার খসড়া চূড়ান্ত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই ছয় দফার জন্য শেখ মুজিব লড়াই করে জেলে গিয়েছিলেন।

অনেক বর্ষীয়ান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, একই বছর কেবল প্রধান বিচারপতি মুর্শেদই তাদের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হওয়ার সাহস করেছিলেন। সে অনুষ্ঠানেই মুর্শেদ জেলখানায় আটক শেখ মুজিবের মতোই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য সাহসী ডাক দিয়েছিলেন।

১৯৬৭ সালের শেষের দিকে মুর্শেদ প্রধান বিচারপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি প্রথম যে কাজটি করেছিলেন তা হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করা। এ সময় সৈয়দ মাহবুব মুর্শেদকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার একমাত্র গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের শেষদিকে তিনি গণ-অভ্যুত্থানে যোগ দিয়েছিলেন। মূলত তাঁর কারণেই শেখ মুজিব প্যারোল ছাড়াই কারাগারের বাইরে এসেছিলেন।

ঐতিহাসিক গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করার সময় মুর্শেদ এক ব্যক্তির একটি ভোটের প্রস্তাব করেছিলেন, যা গৃহীত হয়েছিল। এ কারণেই পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে ৩০০ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অংশে ১৯৯টি আসন পেয়েছিল। এর আগে উভয় অংশে ১৫০টি আসনের সমতা ছিল। মুর্শেদের এক ব্যক্তির একটি ভোটের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে আরো সিদ্ধান্ত হয়, যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে তারা সরকার গঠন করবে।

সাংবিধানিক বিধি-বিধানের বিষয়ে তৎকালীন হাইকোর্ট বার ও আইনজীবীদের মধ্যে বিচারপতি মুর্শেদ যে শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করেছিলেন সে কারণে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে কোনো বিচারক জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর পদে শপথ পাঠ করাতে রাজি হননি বা সাহস করেননি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে তাঁর অস্বীকৃতি জানানো নজির হয়ে রয়েছে।

লেখক : গবেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত

বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা

মন্তব্য