kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সত্যের দর্শন জেগে উঠুক আপন শক্তিতে

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সত্যের দর্শন জেগে উঠুক আপন শক্তিতে

সততা ক্রমেই অসত্যের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। কথাটা মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু মিথ্যা নয়। সৎ ব্যক্তিরা অসৎ ব্যক্তিদের দ্বারা অসৎ প্রমাণিত হচ্ছে। আর অসত্রা নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে নিজেদের সুরক্ষিত রাখছে। তাদের অসততা প্রমাণ করার মতো ক্ষেত্র কেউ তৈরি করতে পারছে না। অন্তর্নিহিত দর্শন দিয়ে বিষয়টির যৌক্তিকতা প্রমাণ করা যেতে পারে। তার পরও দর্শনের পেছনে দর্শন থাকে, ভাবনার বাইরে ভাবনা থাকে। কারণ পৃথিবীতে ধ্রুব সত্য বলে হয়তো কিছু নেই। সব কিছুই আপেক্ষিক। বাস্তব, কাল্পনিক কিংবা আপেক্ষিক—সব কিছু বাদ দিলেও এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, সত্য প্রতিদিন মিথ্যার কাছে হার মানতে বাধ্য হচ্ছে। ক্রমাগত হারতে হারতে সত্য তার জীবনীশক্তি হারিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। কিন্তু কেন?

এর অনেক কারণ ও তার ব্যাখ্যা আছে। মানুষ এখন মিথ্যাকে সত্য বলে মানতে শুরু করেছে। সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। যেমন—একজন মানুষ যদি বলে ‘আমি মিথ্যাবাদী’। মানুষটি প্রকৃতই সত্য বলছে কি না মানুষ তা যাচাই করে দেখছে না। বরং সেটিকে সত্য বলে মেনে নিচ্ছে। আবার সে মানুষটি যখন নিজেকে সত্যবাদী বলে দাবি করছে, সবাই সেটাকে সত্য বলে মেনে নিচ্ছে। সেটাকে যাচাই করে দেখছে না। বিপরীত প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। যেমন—লোকটা যখন নিজেকে মিথ্যাবাদী বলছে, মানুষ সেটাকে মিথ্যা হিসেবে মেনে নিচ্ছে। আবার মানুষটি যখন নিজেকে সত্যবাদী বলছে, মানুষ সেটিকে মিথ্যা হিসেবে দেখছে। মানুষে মানুষে পারস্পরিক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রকৃত সত্য তার গতিপথ হারাচ্ছে।

একটা চোর ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ল। সবাই চোরটাকে বলছে তুমি চুরি করেছ। কিন্তু চোরটা কিছুতেই সেটি মানতে রাজি নয়। সে বলছে, আমি আমার ক্ষুধা নিবৃত্ত করার জন্য এসেছি। সে বলছে, আমি ক্ষুধার্ত, আমি চোর নই। আর অন্যেরা বলছে, তুমি চোর, চুরি করতে এসেছ। এখানে কে সত্য কথা বলছে, কে মিথ্যা কথা বলছে, তা গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। যদি ধরে নিই, লোকটা চোর ছিল এটি মুখ্য বিষয় হয়, তাহলে লোকটা যে ক্ষুধার্ত ছিল এটি গৌণ হয়ে যাবে। অন্যভাবে যদি বলা হয় লোকটি ক্ষুধার্ত ছিল, তখন লোকটির মৌলিক চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে, আর চোর বিষয়টি গৌণ হয়ে যাবে।

এখন প্রকৃত সমাজসংস্কারক নেই। গভীর চিন্তাশীলতার কদর নেই। দর্শন ও মনস্তত্ত্বের কোনো স্থান নেই। বিষয়টিকে আরেকভাবে ভাবা যায়। দর্শন তত্ত্বটা খানিকটা ভিন্ন। আগের চোরটা ছিল অশিক্ষিত। এখন শিক্ষিত একজন মানুষের কথা ভাবা যেতে পারে। স্যুট-প্যান্ট পরা, জুতাটাও মহামূল্যবান। হাতের ঘড়িটা দুর্লভ। হাতে দুলছে প্রযুক্তির সবচেয়ে আধুনিকতম মোবাইল ফোন। গাড়ির সংখ্যাও কম নয়। যে গাড়িটা হাঁকিয়ে বেড়ান সেটা পৃথিবীর দু-চারজনের থাকতে পারে। সম্পদ আর সম্পদ। প্রাচুর্যের শেষ নেই। লোকটা সরকারি চাকরিজীবী। লোকটার চাকরির আগে কিছুই ছিল না। হঠাৎ করেই লোকটা সম্পদশালী হয়ে উঠেছে। লোকটার যত অর্থ-সম্পদ বেড়েছে, সমাজে লোকটার তত কদর বেড়েছে। লোকটা সরকারি চাকরি করে এত অর্থ পেল কোথায়—কারো কোনো প্রশ্ন নেই। বোঝার চেষ্টা নেই। তাহলে কি মানুষ অবৈধতাকে বৈধতা হিসেবে দেখছে।

মানুষ যখন অর্থের পরিমাণ দিয়ে মানুষকে বিচার করে তখন একধরনের আবরণ মানুষের মনস্তত্ত্বে তৈরি হয়। দর্শন যৌক্তিকতাকে হারায়। ধরা যাক লোকটা দুর্নীতিবাজ। চোরটা অশিক্ষিত ছিল আর দুর্নীতিবাজ লোকটা শিক্ষিত ছিল। শিক্ষা তবে কি মানুষকে বেশি দুর্নীতিবাজ বানায়। যদি সেটাই হয়, তবে শিক্ষার কোনো একটা জায়গায় ঘাটতি আছে। সেটা বের করা দরকার। চোরটা গণপিটুনিতে মরেছে আর দুর্নীতিবাজ লোকটার খুব বেশি হলে জেল-জরিমানা হতে পারে। চোরটা বিচার পায়নি, দুর্নীতিবাজ লোকটা বিচার পাবে। আইনের অনেক ফাঁকফোকরও পাবে। কে বেশি দোষী ছিল—চোরটা নাকি দুর্নীতিবাজটা। যদি ধরে নেওয়া যায় চোরটা দোষী কম ছিল কিন্তু চরম শাস্তি পেল। আর দুর্নীতিবাজ লোকটা দোষ বেশি করে কম শাস্তি পেতে পারে। আবার শাস্তি না-ও হতে পারে। এখানে আইনের ও মানসিকতার কোথাও একটা অপূর্ণতা আছে, যেটা খুঁজে দেখা দরকার। আরেকটা দর্শনগত ধারণা ভাবা যেতে পারে। হয়তো সেটা বাস্তব। যেমন—কোনো একটা প্রতিষ্ঠানে একটা মানুষ সততার সঙ্গে কাজ করতে চায়। যদি ধরে নিই সেই প্রতিষ্ঠানের সবাই দুর্নীতিবাজ, তাহলে ওই একটা লোক কি তাদের সঙ্গে পেরে উঠবে। লোকটা কি তার সততা ধরে রাখতে পারবে। লোকটাকে কোনো একটা কাল্পনিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে দোষারোপ করা হলে লোকটা একা যতই বলুক সে সত্যবাদী। যারা দুর্নীতিবাজ ও সংখ্যায় বেশি তারা কি তাকে সত্যবাদী বলবে। কখনোই না। বরং সেলাকটা মন্দ লোকদের সাক্ষ্য-প্রমাণে অসৎ হবে, আর অসৎ লোকেরা মন্দ করেও সৎ থাকবে। ঠিক উল্টো ঘটনাটা আমরা চাই। সেটা কিভাবে সম্ভব তা ভেবে দেখা দরকার। হুমায়ুন আজাদ জীবনের গভীর উপলব্ধি থেকে বলছেন, এখানে অসৎ লোকেরা জনপ্রিয়, সৎ মানুষেরা আক্রান্ত। এই ভাবনার পরিবর্তন ঘটুক। সততার শক্তি জেগে উঠুক আপন শক্তিতে। কেননা সত্যই সৃষ্টি। সৃষ্টি যেখানে দাঁড়ায় সেখানেই নতুন সভ্যতা গড়ে ওঠে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা