kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বিশ্বজনীন সেবা পাওয়ার অধিকার

অনলাইন থেকে

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কভিড-১৯ মহামারি গোটা মানবসভ্যতাকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক কোটি ৪৫ লাখ সংক্রমণ এবং দুই লাখ ৮২ হাজার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ১৯১৮ সালের পর এটাই সবচেয়ে মারাত্মক মহামারি হতে যাচ্ছে।

শ্রমজীবী শ্রেণির আর্থিক পতন খুবই মারাত্মক। যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার রকেটগতি পেয়েছে, মার্চের ১৪ তারিখের পর এ পর্যন্ত আরো চার কোটি ৫৪ লাখ লোক নিজেদের বেকার দাবি করেছে। অন্তত ছয়জনের একজন, যারা মহামারির আগে সকার ছিল, এখন তাদের কোনো কাজ নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিবরণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক নিম্নগতি, বিশেষ করে ভাড়ায় থাকা লোকজনের জন্য বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে; তারা সাধারণত নিম্ন আয়ের লোক এবং কাজ করে ঘণ্টাভিত্তিতে, তাদের চাকরি মহামারির কোপে পড়েছে। চার কোটির মতো লোক অর্থাৎ ৪৩ শতাংশের মতো নিজস্ব আবাসহীন লোক সম্ভবত এ বছরের শেষ নাগাদ উচ্ছেদ হবে। খাবারের জন্য লাইন কয়েক প্রজন্ম ধরে দেখা যায়নি, এখন মাইল-দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো লাখ লাখ লোক হুমকিগ্রস্ত এবং তাদের অনেকে সম্ভবত টিকে থাকবে না।

এসব কিছুই সম্পূর্ণভাবে এড়ানো যেত। যুক্তরাষ্ট্রে নৃশংস কভিড-১৯-এর সংক্রমণ এবং তাতে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম হতে পারত। কী করে জানা গেল? জানলাম-বুঝলাম চীনকে দেখে; যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চার গুণেরও বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে মৃত্যু সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যুহারের দেশগুলোর ৫০ ভাগের এক ভাগ মাত্র (সংক্রমণ ৪৬ হাজার ৩৯৮ এবং মৃত্যু চার হাজার ৬৩৪ জন)! যুক্তরাষ্ট্রে যে এত মৃত্যু ঘটল তার ব্যর্থতার দায় অনেকের—প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস, দুটি বড় রাজনৈতিক দল এবং অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। চীন কী করে কভিড-১৯ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চেয়ে বিস্ময়কর রকমের ভালো করল! তারা নাগরিকদের কাজে যেতে দিল, স্কুলে যেতে দিল, রেস্টুরেন্টে যেতে দিল, থিয়েটারে যেতে দিল, খেলাধুলায় অংশ নিতে দিল, সুইমিং পুলে জমায়েত হতে দিল, অথচ যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউন অব্যাহত আছে। এ গল্পটি না হয় অন্য সময় বলা যাবে।

বিপজ্জনক মহামারির সময়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক কঠোরদশা এবং নানা বিপত্তি কি খুব জরুরি? এ প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর হলো ‘না’।

পাঁচটি মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া যেত, যা যুক্তরাষ্ট্রে কভিডের উৎপাত বন্ধ করতে পারত এবং এখনো এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে সংকট অনেকটাই দূর করা সম্ভব। সেগুলো হলো—

এক. যতক্ষণ মহামারি অব্যাহত থাকবে, ততক্ষণ সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এতে প্রয়োজনীয় সব স্বাস্থ্যসেবা থাকবে, শুধু কভিড-সম্পর্কিত সেবাই নয়। মহামারিকালে কারো কোনো স্বাস্থ্যসেবা নিতে দেরি করা উচিত নয়। এমন বিশ্বজনীন সেবা পাওয়া অধিকারের মধ্যে পড়ে। এটার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের জরুরিদশা থাকুক বা না থাকুক। মহামারিকালে বিশ্বজনীন ও বিনা মূল্যের সেবা গ্রহণে অস্বীকার করা আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল।

দুই. যতক্ষণ মহামারি আছে, ততক্ষণ প্রত্যেকটা বয়স্ক লোক ও শিশুকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে (এক হাজার ডলার বা বেশি) টাকা দেওয়া দরকার। কোয়ারেন্টিনের সফলতা নির্ভর করে লোকজন যখন ঘরে থাকবে, তখন সে টাকা খরচের সামর্থ্য রাখে কি না তার ওপর। এ ক্ষেত্রে কোনো মিনস-টেস্টিং (অর্থ খরচের সামর্থ্য সাপেক্ষে পরীক্ষা) না থাকা উচিত। প্রদেয় টাকার কিছু অংশ সরকার দাবি করতে পারে সেই সব লোকের কাছ থেকে (স্পেশাল ট্যাক্সের মাধ্যমে), যারা ধনী।

তিন. সব ধরনের ঋণ, রেন্ট ও মর্টগেজের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ আরোপ করা দরকার। এটা শুধু মহামারির সময়ে আহরিত সম্পদের বিষয়ে নয়, বরং মহামারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই সব চার্জ সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। মহামারির শেষে আবার পেমেন্ট শুরু করা যাবে; কোনো পেমেন্টই যেন বাদ না যায়। তখন কোনো বাড়তি বেক-পেমেন্ট দাবি করা হবে না।

চার. কোনো করপোরেট-বেইল আউট নয়। মহামারিকালে অন্য সবার মতো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও সরকারের পক্ষ থেকে যে বিশেষ মাসিক পেমেন্ট দেওয়া হবে তার ওপর টিকে থাকার সামর্থ্য থাকা উচিত।

পাঁচ. বেশির ভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকের উচিত নাগরিকদের দেওয়া (তাদেরও) সরকারের মাসিক খরচের টাকার ওপর ভরসা করে টিকে থাকা এবং তারা পারবে বলেই মনে হয়। রেন্ট বা লোন পেমেন্ট দিতে বলে সংকটের সময়ে ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকদের ভারাক্রান্ত করা যাবে না। তারা এবং তাদের কর্মচারীরাও সরকারের কাছ থেকে মাসিক টাকা পাবে। কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে যদি এ ব্যবস্থা যথেষ্ট না হয়, তাহলে তারা আপৎকালীন মঞ্জুরির জন্য আবেদন করতে পারে। তবে কোনো বড় ব্যবসা যদি টিকে থাকতে সমস্যায় পড়ে, তাহলে সেটিকে পড়তে দেওয়াই উচিত অথবা সেটিকে জাতীয় করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলতে দিতে হবে।

রেন্ট আসলে কোনো মূল্য তৈরি করে না। এটা বিদ্যমান সম্পদ এক হাত থেকে আরেক হাতে স্থানান্তর মাত্র। কাজেই মহামারিকালে রেন্ট স্থগিত রাখলে রিয়েল ইকোনমির জন্য তা ক্ষতিকর নয়। বিপরীতে রিয়েল গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস কম উৎপাদিত হলে অর্থনীতি নেতিবাচকভাবে আক্রান্ত হয়।

কভিড-১৯ মহামারিতে ব্যর্থ পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, লোকজনকে দুর্দশায় পড়তে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের তুলনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। চীনে প্রতি লাখে ০.৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি লাখে মৃত্যু হয়েছে ৭৭.১৯ জনের, অর্থাৎ ২২৭ গুণ বেশি মৃত্যু হয়েছে। যে অর্থনৈতিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্র পড়েছে তা সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব ছিল। কভিডের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক পতন ঠেকাতে যা করণীয় দরকার ছিল তা হলো, মহামারিকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করা। কিছু কিছু দেশ তা করে দেখিয়েছে। ট্রাম্প এবং রিপালিকানরা জাতীয় নেতৃত্বের কোনো লক্ষণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের নির্দোষ বলা কঠিন। ওবামার আমলের পুরো সময় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমেছে। উহানে মহামারির ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা চীনই আগে আমলে নিয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা তখন ব্যস্ত ছিল তাদের ব্যর্থ অভিশংসনের উদ্যোগ নিয়ে; তারা বরং স্বাস্থ্য খাতের জন্য তৎপরতা দেখাতে পারত। দুটি করপোরেট পার্টিই আসলে ঘুমিয়ে ছিল, কেউ দায়িত্ব বোধ করেনি।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা