kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বাঁচার জন্য মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাঁচার জন্য মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা প্রয়োজন

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত শতাধিক বছর আগে ‘মাটি’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘কুহু ও কেকা’য় অন্তর্ভুক্ত। সেই কবিতায় মাটিকে তিনি জীবন্ত সত্তার সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, ‘মাটি তো নয়—জীয়ন কাঠি, কণায় কণায় জীবন তার/মাটির মাঝে প্রাণের খেলা, মাটিই প্রাণের পারাপার।’ আসলে এক অর্থে মাটি তো জীবন্ত এক সত্তাই। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এ বছর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের (৫ ডিসেম্বর ২০২০) প্রতিপাদ্যে মাটিকে জীবন্ত হিসেবে বিবেচনা করে তাকে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘মাটিকে জীবিত রাখি, মাটির জীববৈচিত্র্য রক্ষা করি’ (কিপ সয়েল অ্যালাইভ, প্রটেক্ট সয়েল বায়োডাইভার্সিটি)।

আসলে মাটি মূলত জড় পদার্থ হলেও তা জীবন্ত সম্পদের মতোই। মাটির নিচেই বসবাস করে পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ জীববৈচিত্র্য। প্রায় ৯০ শতাংশ জীব—জীবনের প্রায় পুরোটা কিংবা কোনো একসময় মাটিতেই কাটিয়ে দেয়। মাটিতে বসবাসকারী অণুজীব মাটিতে কার্বন জমা হতে সাহায্য করে ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এই সব অণুজীব মাটিতে মিশে যাওয়া নানা ধরনের দূষিত পদার্থ নষ্ট করে মাটিকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। মাটিতে বসবাসকারী অণুজীব দিয়েই প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মাত্র তিন ইঞ্চি পরিমাণ মাটিতে এক হাজার ট্রিলিয়ন জীব বাস করতে পারে।

শুধু অণুজীব নয়, মাটিতে আরো অনেক জীব—বিশেষ করে বিভিন্ন প্রজাতির কৃমি, ক্ষুদ্র সন্ধিপদযুক্ত প্রাণী (ক্ষুদ্র মাকড় ও পতঙ্গ) ও কেঁচো মাটির অশেষ উপকার করে থাকে। লক্ষ কোটি অণুজীব আর এই সব ক্ষুদ্র প্রাণী মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য সম্মিলিতভাবে মাটির নিচে কাজ করে। প্রতিটি জীবদল মাটি ভালো রাখার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কাজ সম্পাদন করে।

পৃথিবীতে মাথাপিছু ক্যালরির এক বিরাট অংশ আসে মাটিতে প্রত্যক্ষভাবে তৈরি বিভিন্ন প্রকার শস্য থেকে। অনেক আমিষ জাতীয় খাবারের উৎস (গরু, ভেড়া, ছাগল) পরোক্ষভাবে মাটির ওপরই নির্ভরশীল। হিসাব করে দেখা গেছে, মাথাপিছু ক্যালরির প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আসে মাটি থেকে। সেই অর্থে মাটি ও মানুষের সম্পর্ক মা ও সন্তানের মতো। মাটির ক্ষতি হওয়ার অর্থই হচ্ছে আমাদের মায়ের ক্ষতি হওয়া। চূড়ান্তভাবে আসলে আমাদেরই ক্ষতি হওয়া। প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস লিখেছে, ‘পৃথিবীতে খুব দ্রুত মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার সংবাদ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃসংবাদ। পুষ্টিকর ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন ভালো ও সুস্থ মাটি।’

বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩৮ শতাংশ ভূপৃষ্ঠ কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। জাতিসংঘের মৃত্তিকা সম্পদ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে (২০১৫) মাটি নষ্ট হওয়াকে পরিবেশ ও কৃষির জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে অভিহিত করা হয়েছে। অনুপযুক্ত চাষ তথা কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে বন ধ্বংস ও অতি চারণজনিত কর্মকাণ্ড মাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া, কার্বন ধারণের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া ও মাটির জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় বাস্তুতন্ত্রে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—মাটির উপরিভাগ ক্ষয়, জৈব পদার্থ হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, শক্ত রূপ ধারণ, ছিদ্র বন্ধ হওয়া ইত্যাদি কারণে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। ভূমি ব্যবহার পদ্ধতির পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে মাটির জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়াসহ মাটির বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান ঠিক থাকছে না। ফলে মাটি তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলছে।

কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে, নানা রকম অজৈব ও জৈব পদার্থ প্রাকৃতিকভাবে মিশেই সৃষ্টি হয়েছে মাটির। বিভিন্ন প্রকার খনিজ পদার্থ, অণুজীব, জীব, বাতাস, পানি ও জৈব পদার্থের (কার্বন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন) নির্দিষ্ট পরিমাণ ও তাদের জীবন্ত মিশ্রণে তৈরি হয় স্বাস্থ্যকর মাটি। কিন্তু বর্তমানে এই স্বাস্থ্যকর মাটির আকাল দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই ধরনের ফসল চাষ (মনোক্রপ), অতি কর্ষণ, আচ্ছাদন ফসল (কাভার ক্রপ) না রাখা, বালাইনাশক/কীটনাশক ব্যবহার, কৃত্রিম স্যার প্রয়োগ ইত্যাদির কারণে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে।

এ ছাড়া শিল্প-কলকারখানা, খনি, কৃত্রিম স্যার, বালাইনাশক/কীটনাশক, রং, নর্দমার ময়লা কাদা, বর্জ্য পানি, পোড়ানো কয়লার অবশিষ্টাংশ, পেট্রো-কেমিক্যালস ইত্যাদি উৎস থেকে বিভিন্ন পদার্থ (পারদ, ক্যাডমিয়াম, তামা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, লোহা, দস্তা, জিংক, টিন, ম্যাগনেসিয়াম, সিসা, কোবাল্ট) মাত্রাতিরিক্তভাবে মাটিতে মিশে যাওয়ার ফলে সেই মাটি দূষিত হয়ে পড়ছে। অণুজীব, উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জন্য তা হচ্ছে ক্ষতির কারণ। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে প্লাস্টিকও মাটি দূষণের উৎস হয়ে উঠেছে। বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য সংস্থা বলছে, ‘মাটিকে দূষিত করার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের ভবিষ্যেক দূষিত করছি।’

বাংলাদেশে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে মাটির স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কিছু প্রকাশনা ও প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে করা হয়েছে। এই সব প্রকাশনা ও প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাটির স্বাস্থ্য ভালো নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন বিদেশি দুজন বিশেষজ্ঞের সহায়তায় দেশে ধান চাষের জন্য মাটির উর্বরতাবিষয়ক একটি পর্যালোচনা প্রবন্ধ গত বছর (২০১৯) প্রকাশ করেছে। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশে ৩৯ থেকে ৫২ শতাংশ এলাকায় মাটির উর্বরতা কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি উপাদান গন্ধক ও দস্তার পরিমাণও দেশের ৪০ শতাংশ এলাকায় কম বলে এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় মাটিতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ভ্যানাডিয়াম, সিসা, ক্রোমিয়াম, নিকেল ইত্যাদির মতো পদার্থের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। দেশের মাটিতে পাঁচ মিলিমিটার থেকেও কম দৈর্ঘ্যের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার (মাইক্রোপ্লাস্টিক) অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এই সব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মাটিতে বসবাসকারী জীবকুলের জন্য ক্ষতিকর।

সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্তিকাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইটিপিএস (ইন্টারগভর্নমেন্টাল টেকনিক্যাল প্যানেল অন সয়েল) সুস্থ মাটির সংজ্ঞা সংশোধন করেছে। ‘সুস্থায়ীভাবে উৎপাদনক্ষম, জীববৈচিত্র্যময় ও স্থলজ পরিবেশগত সেবা প্রদানে সক্ষম মাটি’কে আইটিপিএস সুস্থ মাটি বলে অভিহিত করেছে। এই সংজ্ঞাকে বিবেচনায় নিলে মাটিতে জৈব ও অজৈব পদার্থের পরিমাণ নির্ণয় করার সঙ্গে সঙ্গে তার জীববৈচিত্র্য শনাক্ত ও তাদের প্রাচুর্য নির্ণয় করার বিষয়ও চলে আসে। কিন্তু এই কাজ করতে গেলে যত ধরনের বিশেষজ্ঞ এবং যে ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন তা আমাদের দেশে নেই। যেমন মাটিতে বসবাসকারী পূর্বে উল্লিখিত অগণিত প্রজাতির কৃমি, ক্ষুদ্র সন্ধিপদযুক্ত প্রাণী (ক্ষুদ্র মাকড় ও পতঙ্গ) ও কেঁচোসহ সব ধরনের অণুজীব শনাক্ত করার মতো বিশেষজ্ঞ ও অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। একদিনে তা তৈরি হবেও না। তবে নীতিগতভাবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলে কয়েক বছরে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে এগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেই মোতাবেক কাজ করা প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা