kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শতরং

ম্যারাডোনাকে নিয়ে আরেক ছত্র

মোস্তফা মামুন

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ম্যারাডোনাকে নিয়ে আরেক ছত্র

এক তরুণ বন্ধু বললেন, ‘সবই তো বুঝলাম; কিন্তু ম্যারাডোনা ফুটবলটা কেমন খেলতেন সেটা ঠিক বোঝা গেল না।’

‘কেন বোঝা গেল না...এত কথা! এত লেখা!’

‘তাতে তো আবেগ বেশি। ওর চরিত্রের অন্য মাত্রা নিয়ে অনেক কথা। আসল জায়গাটা নিয়ে আলোচনা অনেক কম। সেই ১৯৮৬-র দুই গোল বাদ দিলে সেভাবে বর্ণনা নেই।’

যে বা যারা লেখা পড়ে ম্যারাডোনাকে চিনতে চায়, ওদের চেনানো একটু কঠিন। তবু কথাটা মাথায় ধাক্কা দিল। আসলে কেমন ফুটবল খেলতেন ম্যারাডোনা!

ভেবে ভেবে মনে হলো সেই কথাটাই। সব সুন্দর, সব বোধকে কি ভাষায় ফুটিয়ে তোলা যায়! একটা জায়গায় গিয়ে কিছু শিল্পকর্ম বর্ণনায় আর ঠিক প্রকাশিত হয় না। অক্ষর তখন অর্থহীন অঙ্কন হয়ে থাকে। তৈরি হয় না সঠিক বাক্য। এ শুধু দেখার। বোঝার। অনুভবের।

কী করে বোঝাই যে অন্যরা যখন খেলত, আর তিনি তখন ছবি আঁকতেন। অন্যরা দিত শ্রমিকের শ্রম, তিনি বোলাতেন শিল্পীর তুলি। বাকিদের কাছে মাঠ ঘাসে ঢাকা সীমানা। তাঁর কাছে সুন্দরের ক্যানভাস। আর দশজন তাই মাঠে লড়াই করত। তিনি করতেন রাজত্ব। আর এভাবেই ম্যারাডোনা ১১-র ১ নন, একাই ১১। মাটির পৃথিবীতে ৬০ বছর কাটালেও উচ্চতাটা ছিল আকাশেরই তুল্য। মৃত্যুতে যেন ফিরলেন সেই আকাশেই। যোগ্য জায়গায়ই।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে একটা ছবি বেরিয়েছিল। প্র্যাকটিসে বল নিয়ে চলছেন তিনি। আর চলতে চলতে যেন বলের সঙ্গে সুখ-দুঃখের দু-একটা কথাও বলে নিচ্ছেন। সত্যি বললে, বলকে এমন পোষ মানাতে পারেনি আর কেউ। বল এতটা আপন করে নেয়নি আর কাউকেই। দৃষ্টি আকর্ষণের শুরুটাই জাগলিং করে করে। সেই প্রেম মাঠেও এমন নিয়ে এলেন যে বলে তাঁর প্রতিটি স্পর্শই হতো উদ্দেশ্যমণ্ডিত। তাঁর ফুটবল ভাবনায় জটিল; কিন্তু প্রয়োগে প্রাঞ্জল। ১৯৮২ বিশ্বকাপের ম্যাচই বোধ হয়। মাঝ মাঠের মতো জায়গায় খেলা হচ্ছে। ম্যারাডোনার দুদিকে যথারীতি দুই পাহারাদার। সতীর্থ একটা সরল ফরোয়ার্ড পাস খেললেন ম্যারাডোনাকে। বলটা তাঁর দিকে আসছে, দুই পাহারাদারও তৈরি হচ্ছেন, তিনি হঠাৎ করে গতি বাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন বলটার দিকে। তাই দেখ দুই মার্কারও গতি বাড়ালেন আর তখনই একটা লাফে পুরো উল্টো ঘুরে গেলেন, বল তখন তাঁর পায়ে, দুই পাহারাদার উল্টা দিকে ঘুরে খাবি খাচ্ছেন। ওঁরা তখনো মাঠে; কিন্তু চেহারার অসহায়ত্বে মনে হচ্ছিল মাঝ নদীতে।

পায়ের সঙ্গে মাথারও এমন যোগ ছিল। ছিল হৃদয়েরও। ১৯৯০ বিশ্বকাপে যখন আসেন, তখন মোটামুটি বিশ্বসেরা এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নেও পেলের আসন টলিয়ে দিয়েছেন। ওই বিশ্বকাপ জিততেই হবে এমন কোনো দিব্যি ছিল না। দলটাও এত সাদামাটা যে ফাইনালে ওঠাটাই ঢের। তবু হেরে গিয়ে এমন কান্না কাঁদলেন, যেন একটা শিশু, যার বহু সাধের খেলনা পুতুলটা কেউ কেড়ে নিয়ে গেছে। আমাজন থেকে অ্যান্টার্কটিকা সেই কান্নার রঙে এক হয়ে গেল। পৃথিবীর হৃদয় বলে যে অদৃশ্য জিনিসটা আছে তাতে এমনই টোকা দিলেন যে ফুটবল তখন পেছনের সারিতে। কান্না-আবেগ-মানবিকতাই তখন সূচিতে। আর তাই তিনি যেমন আনন্দের কল্লোল, তেমনি আবার ভূতুড়ে স্তব্ধতা। তিনি হৃৎস্পন্দন। আবার হৃদরোগও।

ম্যারাডোনা যে ড্রাগ নিলেন, ম্যারাডোনা যে শৃঙ্খলা মানতেন না—এটা চরিত্রে মাত্রা যোগ করলেও প্রশংসনীয় ব্যাপার নয় নিশ্চয়ই। কিন্তু আবার এই জিনিসটা খেয়াল করে দেখুন, যাঁর বিরুদ্ধে অত শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে কিন্তু কোনো সতীর্থ অভিযোগ করছেন না যে তিনি মাঠে তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। তারকাসুলভ ইগোতে দলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠা—যেটা আজকের দলীয় খেলার প্রধান সমস্যা, সেই ঝামেলা একবারও তৈরি করেননি; বরং কীর্তিতে যতই আলাদা হন, বাইরে তাঁদেরই একজন। ১১-র সাধারণ ১। অথচ তাঁর মতোই প্রবল ব্যক্তিত্বের ছায়া দিয়ে ১৯৯২ ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতার পর পায়ের মাটি হারান ইমরান। পুরো কৃতিত্বটা একার করতে গিয়ে সতীর্থদের এমন খেপিয়ে দেন যে অত দিনের রাজত্ব টলে যায়। আজও, প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেও সতীর্থদের কাছে ইমরানের সেই সম্মানের জায়গা পুনরুদ্ধার হয়নি।

উদাহরণ হতে পারেননি তরুণদের জন্য, আবার হয়েছেনও তো। শেষ পর্যন্ত এই যে করুণ পরিণতি, অসময়ের মৃত্যু, জীবনভর শারীরিক ভোগান্তি—এগুলো তো শেষ পর্যন্ত এ-ও জানায় যে এর পরিণতি কোনো না কোনোভাবে ভোগ করতে হয়। এবং কে জানে, এমন না করলে হয়তো মাঠের ফুটবলটাও আরো আলোকিত হয়। বুরুচাগা যেমন একবার শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে বলছিলেন, ‘ড্রাগ নিয়ে যদি এমন খেলতে পারে, তাহলে চিন্তা করুন ড্রাগ না নিলে কী হতো!’ ফুটবল দার্শনিক হয়ে ওঠা সতীর্থ ভালদানো ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘ম্যারাডোনা পৃথিবীকে দুটো মাদকের সন্ধান দিয়েছিল। একটা খেয়ে নিজে শেষ হয়ে গেছে, আরেকটা খাইয়ে পৃথিবীকে রঙিন করে রেখেছে।’

এই সৃষ্টি আর ধ্বংস, সুর আর অসুরের পিঠাপিঠি বেয়ে চলা আবার ট্র্যাজেডির নায়ক করে তোলে তাঁকে। যাঁর সব আছে; অথচ কিছুই নেই। পুরো পৃথিবী যাঁর নামে এক হয়, সেই তিনি কি না শেষ সময়ে প্রায় নিঃসঙ্গ। অসুস্থ, একাকী অবস্থায় পড়েও নাকি গিয়েছিলেন একবার। হাসপাতাল-ডাক্তার করা হয়নি সময়মতো। জীবনকে ইচ্ছামতো খেলার পরিণামই হয়তো। আবার অন্যদিক থেকে দেখলে জীবনকে তো কানায় কানায় ভোগও করে গেলেন। যাকে যা ইচ্ছা বলেছেন। নিষিদ্ধ সব আনন্দ নিজের করেছেন। নারীসঙ্গে বড় একটা বাছবিচার করেননি। দুনিয়াকে সৃষ্টিশীল আনন্দে ডুবিয়ে নিজেও ডুবেছেন আনন্দে। বলবেন, ধ্বংসাত্মক আনন্দ; কিন্তু তাঁর মতো করে তো তিনি উপভোগই করেছেন। জর্জ বেস্ট বলেছিলেন, ‘আমি আমার অর্ধেক টাকা মদ আর নারীর পেছনে ব্যয় করেছি।’ শুনে প্রশ্ন উঠল, ‘আর বাকি টাকা?’ বেস্টের উত্তর, ‘নষ্ট করেছি।’ তাঁর মতো করে তো এই উত্তরটা ঠিক। লৌকিক নিয়মে এটা তাঁকে পতনে নিয়ে গেছে; কিন্তু তাঁকে তো উপভোগ্যতা দিয়েছে। অন্যের ক্ষতি না করে কেউ যদি ঢালাও উপভোগের জীবনে পা বাড়ায়—তা কি খুব দোষের? হয়তো আমাদের সাধারণ সভ্যতায় সংজ্ঞায় তবু দোষের; কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা চ্যাম্পিয়ন এবং জিনিয়াস। তাদের বোধের বাউন্ডারিটাই অন্য। কোনো কোনো ক্রীড়াবিজ্ঞানী তো এ-ও বিশ্বাস করেন, এই খুল্লাম খুল্লা জীবন না কাটালে হয়তো তাদের সৃষ্টিশীলতা পুরো ডানা মেলতে পারে না।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে একজন এসে বলেছিলেন, ‘আমাকে কিছু টাকা দিন।’

‘কী জন্য?’

‘এই প্রশ্ন করছেন কেন? আপনি তো মাইকেল মধুসূধনকে নেশা করার জন্য টাকা দেন।’

বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, ‘তুমিও একটা মেঘনাদবধ লিখো। তোমাকেও টাকা দেব।’

মেঘনাদবধ যে লিখবে, যে ম্যারাডোনা হবে, ওর জন্য তো নিয়মটা অন্য হবেই।

পরস্পরবিরোধিতা ছিল। কালের কণ্ঠে শ্রদ্ধার্ঘ্য দেওয়া লেখাটায় সেটা লিখেছিও। বামপন্থী আন্দোলনকে যিনি সমর্থন করেছেন, সেই তিনি ড্রাগ লর্ডদের সঙ্গে কিভাবে সম্পর্ক করেন! ইউনিসেফে দুই হাত বিলিয়ে যে টাকা দেয়, সে আবার চশমখোর হয়ে বাণিজ্যের সব ফর্মুলা মেলায়। মেলে না যেন। আবার মেলেও তো। এই বিপরীতমুখিতার জন্যই তো হাতের গোলের অপকর্মের চার মিনিট পরই পায়ের জাদুমাখা গোলে ক্ষতিপূরণ হয়। স্বাভাবিক অঙ্কে চলেন না বলেই তো বার্সেলোনা ছেড়ে রিয়াল-জুভেন্টাসে যান না। যান নাপোলিতে, যা তখন পর্যন্ত মানে আমাদের ওয়ারী-রহমতগঞ্জ মাপের।

পেলের চেয়ে বড়, নাকি বড় নয়; মেসি তাঁকে ছাড়িয়ে যাবেন কি যাবেন না, ফুটবল চিন্তকরা আগামী দিনে এই হিসাব করবেন। যেমন এই তর্কও সমাজবিজ্ঞানীরা করতে পারেন, আত্মবিনাশী না হলে ম্যারাডোনার ফুটবল আরো ঝলমলে হতো, নাকি পুরো মাত্রায় বিকাশের জন্যই এই উপভোগ্যতা দরকার ছিল। বিতর্ক আর ভুল সুপারস্টারদের সামাজিকভাবে আরো গ্রহণযোগ্য করে কি না এই ফিসফিস করতে থাকা প্রশ্নও বড় হলো অসময়ের এই মৃত্যুতে।

চলে গিয়েও তাই ফুটবলে, সমাজে, সমাজবিজ্ঞানে রয়ে গেলেন। চলে যাওয়াই বা বলছি কেন? একজন সমর্থক লিখেছেন, ‘আমরা যাঁরা ম্যারাডোনার খেলা দেখে বড় হয়েছি, তাঁরা বেঁচে থাকতে ম্যারাডোনা মারা যান কী করে। আমরা বাঁচিয়ে রাখব ওকে।’

সেই হিসাবে মারা যাননি। চলেও যাননি। আসলে সীমা থেকে গেছেন অসীমে। মৃত্যুতে ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃতই হলো।

আর্জেন্টিনার পত্রিকাগুলো পরদিন শোকের চাদর মুড়ে বেরিয়েছে। ওলে পত্রিকা শিরোনাম করেছে, ‘১৯৬০-ইনফিনিটি’। এই বোধ হয় শেষ সত্য। তাঁর মৃত্যু বা মৃত্যুর তারিখ থাকতে পারে না। তিনি অশেষ। চিরকালীন।

জীবনে ছিলেন সর্বজনের। মৃত্যুতে হলেন চিরদিনের।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা