kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

প্রতিরোধ থেকে বিজয় যাত্রা

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



প্রতিরোধ থেকে বিজয় যাত্রা

বিজয়ের মাস শুরু হয়েছে। একাত্তর বাংলাদেশের প্রাণভোমরা। একাত্তরকে ভুলে গেলে বাংলাদেশকে ভুলে যাওয়া হয়। তাই সারা বছর নানা কিছু আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে ব্যতিব্যস্ত রাখলেও ডিসেম্বর এলেই সব কিছুকে ছাপিয়ে একাত্তরের চিত্রটা মনের ভেতর জ্বলজ্বল করে ওঠে। একাত্তর থেকে ২০২০, ৪৯ বছর। সে সময়ের চিন্তা-ভাবনা ও প্রত্যাশার সঙ্গে বর্তমানকে মেলাতে গেলে প্রচণ্ড হোঁচট খেতে হয়। মনে হয়, বাস্তবতা সত্যিই বড় কঠিন। তাই থাক আজ সেসব কথা, একাত্তরে ফিরে যাই। উত্তেজনা আর শিহরণে ভরা ছিল পুরো ডিসেম্বর মাস। ৪৯তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, একাত্তরে আহরিত শক্তি, আদর্শ, দর্শন এবং তার থেকে তৈরি হওয়া চেতনা আগামী শত বছরেও বাংলাদেশকে সঠিক পথ দেখাবে। সুতরাং বাংলাদেশকে নিয়ে কেউ যদি নিজ হৃদয় সমৃদ্ধ করতে চায়, তাহলে তাকে একাত্তরের দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। এত বড় সমৃদ্ধ ইতিহাস পৃথিবীর আর কোনো দেশের নেই। ৯৩ হাজার দখলদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং তা যেভাবে ঘটেছে, যেভাবে আমাদের বিজয় দিবস এসেছে, তা সত্যিই পৃথিবীতে বিরল। বড় দুটি উদাহরণ দিই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থাৎ আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয় ১৭৭৫ সালে এবং ১৭৮৩ সালে তার সমাপ্তি ঘটে। আট বছর যুদ্ধ চালিয়েও দখলদার ব্রিটিশ বাহিনীকে তারা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে পারেনি। ১৭৮৩ সালে ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার আমেরিকার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের সব সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। ভিয়েতনামের স্বাধীনতাযুদ্ধ বলা যায় আমাদের চোখের সামনে হয়েছে। প্রায় ২০-২১ বছর যুদ্ধ করেও প্রথমে ফ্রান্স এবং আমেরিকান দখলদার বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিজয় দিবস পায়নি। ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তিচুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয় এবং ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল ভিয়েতনাম পরিপূর্ণভাবে স্বাধীনতা লাভ করে। অমেরিকা-ভিয়েতনাম কেউই দখলদার বাহিনীকে সারেন্ডার করাতে পারেনি।

সুতরাং একাত্তর অনন্য, আমাদের জন্য বিশাল ও অফুরান্ত গৌরবের জায়গা। একাত্তর হঠাৎ করে আসেনি। এক দিনের ডাকে বা এক ঘোষণায় একাত্তর শুরু হয়নি। ঘোষণার মালিকানা সাড়ে সাত কোটি মানুষ দিয়েছিল তাঁকে, যিনি ২৩ বছর নিজের জীবন, যৌবন, ঘর-সংসার, পরিবার-পরিজনের সব দুঃখ-কষ্ট উপেক্ষা করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে বাঁকে বাঁকে একেক করে বড় বড় ফাউন্ডেশন বা শক্ত ভিত্তি তৈরি করে তারপর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, যাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের স্থপতি এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। ২৬শে মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে সমগ্র বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান, যে যুদ্ধের ছোট-বড় সব কৌশল তিনি বাতলিয়ে দেন ৭ই মার্চের ভাষণে। সশস্ত্র যুদ্ধটা প্রথমে শুরু করে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী। তারপর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৬শে মার্চ থেকে ঢাকা শহরসহ সারা দেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ইপিআর অর্থাৎ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (বর্তমানের বিজিবি) বাঙালি সদস্যরা, পুলিশ এবং তখন বাংলাদেশে অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলো অনেক স্থানে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয়। ২৬-২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কুমিরায় ইপিআর সদস্য কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধে পাকিস্তানের ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল শাপুর খানসহ ১৫২ জন নিহত হয়। ইপিআর ও স্থানীয় কয়েক শ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে ৩০-৩১ মার্চ কুষ্টিয়ার যুদ্ধে পাকিস্তানের ২৭ বালুচ রেজিমেন্টের কম্পানি কমান্ডার মেজর এস এম শোয়েবসহ ১৬৫ জন নিহত হয়, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গাড়ি ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জাম মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। ২৮ এপ্রিল আখাউড়ায় গঙ্গাছড়া যুদ্ধে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাই মোস্তফা কামাল অসাধারণ দৃষ্টান্তমূলক বীরত্ব প্রদর্শন করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার মোস্তফা কামালকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে। ২০ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের মহালছড়িতে বুড়িঘাট যুদ্ধে একই রকম বীরত্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শাহাদত বরণ করেন ইপিআরের ল্যান্স নায়েক মুন্সি আবদুর রউফ। তিনিও বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পান।

প্রতিরোধ পর্ব পেরিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে গেরিলা ও কনভেনশনাল—দুই কৌশলেই দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলতে থাকে। এপ্রিলের ১০ তারিখ থেকে মে-জুলাইয়ের প্রথম ভাগের মধ্যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ঘোষণা, প্রবাসী সরকার গঠন, সারা দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ হওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিকসহ সব ফ্রন্টে পরিপূর্ণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা মে মাস থেকে দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকেন। গ্রামগঞ্জে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আগস্ট-সেপ্টেম্বর আসতেই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তারা বাংকারবদ্ধ হয়ে পড়ে, ভয়ে অতি প্রয়োজন ছাড়া বাংকার থেকে বের হতো না। এই সময়ের মধ্যে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে নভেম্বরের শুরু থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমান্তের সব দিক থেকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ এবং অবস্থান নিয়ে নেয়। স্প্রিং রোড টু ভিক্টরি, অর্থাৎ বিজয়ের ভিত্তিটা চূড়ান্তভাবে তৈরি হয়ে যায়। গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী, যার সার্বিক কমান্ডার নিযুক্ত হন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় আর্মি কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অসীম দূরদৃষ্টির অধিকারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চাচ্ছিলেন আনুষ্ঠানিক যুদ্ধটা পাকিস্তান প্রথম শুরু করুক। ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র জানতে পারে, ইন্দিরা গান্ধী যখন অন্য কোনো রাজ্যে দিল্লি থেকে দূরে থাকবেন, তখনই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষণা করবে। সুতরাং ডিসেম্বরের ৩ তারিখে জনসভায় যোগদানের জন্য দুপুরের পরেই ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় চলে আসেন। ওই দিন সন্ধ্যায়ই পশ্চিম ফ্রন্টে ভারতের ছয়টি বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তান আক্রমণ চালায়। বিশেষ বিমানে এক দল যুদ্ধবিমানের পাহারায় ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে পৌঁছান এবং চলমান পার্লামেন্টে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেন।

যশোর, কুমিল্লা, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ—চারদিক থেকে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর ওই রাতেই আক্রমণ শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত বিজয় যাত্রা। সব দিক থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী লেজ গুটিয়ে ঢাকার দিকে পালাতে শুরু করে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজি দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, পাকিস্তানি সৈন্যরা ইসলাম ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছে, একজন সৈনিক বেঁচে থাকতে তারা পশ্চাদপসারণ করবে না। কিন্তু যশোর সেনানিবাসের প্রায় তিন হাজার সেনা একটি গুলি ফায়ার না করে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর মাত্র তিন দিনের মাথায় বিকেলের রান্না খাবার ফেলে ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিশৃঙ্খলভাবে পালাতে শুরু করে, কেউ খুলনার দিকে, আবার কেউ মাগুরা হয়ে ঢাকার দিকে।

পবিত্র ধর্ম নিয়ে চরম ভণ্ডামি আর মিথ্যাচারের চরম পরিণতি তাদের ভোগ করতে হয়েছে। ইয়াহিয়া খানের একান্ত পরামর্শদাতা ও তথ্যমন্ত্রী ছিলেন মেজর জেনারেল শের আলী খান। হুসেন হাক্কানি লিখিত ‘পাকিস্তান বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’ গ্রন্থের ৫৫ পৃষ্ঠায় বর্ণনায় আছে, শের আলী খান সৈনিকদের সমাবেশে বলতেন, তিনি দৈনিক পাঁচবার আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং আল্লাহর নির্দেশমতো সব কাজ করেন। ধর্ম নিয়ে এত বড় ভণ্ডামি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো মানুষ করেছে বলে জানা যায় না। সুতরাং ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর অগ্রযাত্রা বিশ্বের সামরিক ইতিহাসের মধ্যে দ্রুততম গতিতে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। ৩ ডিসেম্বর শুরু হয়ে মাত্র ১৩ দিনের মাথায় পাকিস্তানি বাহিনীর লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্য বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ৩ ডিসেম্বরের পর একের পর এক বিজয়ের খবর আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রচার হতে থাকে। মাঠের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সে এক সময় ছিল। অভূতপূর্ব, বাধাহীন অনুভূতি। চারদিকে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান—উল্লাস আর আনন্দে যেন বুক ফেটে যাবে আর কি। পাকিস্তানি সেনারা পালাবার সময় গাদ্দার বলে গালি দিয়ে রাজাকার-আলবদরদের গাড়ি থেকে লাথি মেরে ফেলে রেখে চলে যায়। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে এসে আবার ওই রাজাকার-আলবদর, পাকিস্তানিদের ভাষায় গাদ্দারদের উত্তরসূরিরা মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। একাত্তরের ত্যাগ, বীরত্ব ও চেতনার মাধ্যমে বিশাল শক্তি রয়েছে, সেটা যদি নতুন প্রজন্মের মনের গহিনে প্রোথিত করা যেত, তাহলে আজকে একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠীর নতুন হুমকি শুনতে হতো না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা