kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধীবান্ধব উদ্যোগ

ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধীবান্ধব উদ্যোগ

পৃথিবীর প্রায় ১০০ কোটির বেশি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর পূর্ণ ও সম-অংশগ্রহণের স্বপ্নযাত্রা নিয়ে প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস’। বহমান সমাজ ধারায় উন্নয়নের প্রতি ভাঁজে আঁচড় কাটার সুদীপ্ত শপথে বলীয়ান হয়ে নিজেকে আরো একধাপ এগিয়ে রাখতে চায় বিশ্বব্যাপী বসবাসরত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এই প্রতীক্ষিত দিনে। এই দিনকে সামনে রেখে তারা স্বপ্ন আঁকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে সব পর্যায়ে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রবেশগম্যতার সুনিশ্চয়তায় একদিন পৌঁছে যাবে স্বপ্নযাত্রার টেকসই সীমানায়। কিন্তু এ স্বপ্নযাত্রার শেষ কোথায়! এ প্রশ্নটা কভিড-১৯-এর পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষের অগ্রসরমাণ যাত্রা পথে। বিশ্বময় কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অগ্রগামিতা থমকে দাঁড়িয়ে আছে কোনো এক অচেনা-অজানা স্থির সময়ে। তবু আশায় বাঁচে মানুষ। একদিন কেটে যাবে আঁধার, আবারও ঘুরে দাঁড়াবে স্তব্ধ সময়! কিন্তু সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত কিংবা অরক্ষিত ও রোগবালাই প্রতিরোধক্ষমতা ভঙ্গুর প্রতিবন্ধী মানুষরা কি কভিড-এর সঙ্গে এ রকম এক অসম যুদ্ধে নতুন স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ নিতে পারবে?

পৃথিবী আজ আক্রান্ত কভিড-১৯-এ। এই নতুন বাস্তবতায় চলছে আমাদের সমাজব্যবস্থা। এখন চলছে কভিড-এর দ্বিতীয় ঢেউ। একটি শতভাগ নিরাপদ ও জীবন সুরক্ষাকারী কভিড টিকা বিশ্বের সব মানুষ হাতে পৌঁছার আগ পর্যন্ত নতুন বাস্তবতায় তাসাউফের মতো অটিস্টিক শিশুসহ সব ধরনের, বিশেষত এনডিডি (অটিস্টিক, বৃদ্ধি, ডাউন্স ও সিপি শিশু) শিশুদের অবস্থান আমাদের মতো একটি দেশে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটি ভাবার সময় এখনই। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জোর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। এ কারণে এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টিও নির্ধারণ করা হয়েছে সময়ের সঙ্গে বেশ মিলিয়ে ‘কভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করি, নতুনভাবে টেকসই বিশ্ব গড়ি।’ প্রতিপাদ্যে নতুন স্বাভাবিক জীবনে সমাজের সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সম্পৃক্তকরণ বলতে কভিডসংক্রান্ত বিশেষ উপায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সচেতনতার উদ্যোগ গ্রহণ, সব ধরনের উদ্যোগে প্রতিবন্ধী পরিবারকে সম্পৃক্তকরণ এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নে বিশেষ তাগিদ দেয়। কারণ প্রতিবন্ধী শিশু বা মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ অথবা স্পর্শের প্রতি অতিসংবেদনশীল অথবা প্রতিক্রিয়াশীল থাকার কারণে তাদের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত জ্ঞান অপ্রতুল; কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চঞ্চলতার কারণে প্রতিবন্ধী শিশুরা যত্রতত্র ছুটে বেড়ায় আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ময়লা-আবর্জনা, অপরিষ্কার জিনিস ধরার প্রবণতাও রয়েছে। এই সংকটের সময়ে যেখানে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষই সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়মাবলি মেনে চলতে বিস্তর ঝামেলার মুখোমুখি হচ্ছে, সেখানে প্রতিবন্ধীদের ঝুঁকি কতটুকু তা খুব বিস্তারিত বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কভিড-১৯-এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অধিকতর ঝুঁকিতে রয়েছেন। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে, যেমন—হাত ধোয়ায় বেসিন বা সিংক ব্যবহার করতে না পারা, অথবা দুই হাত একসঙ্গে ঘষার ক্ষেত্রে অসুবিধা, চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত সুবিধা না পাওয়া অথবা সামাজিক দক্ষতার অভাবের কারণে সামাজিক দূরত্ব (সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং) বজায় রাখতে না পারা, শারীরিক সহায়তা পেতে বিভিন্ন জিনিসকে স্পর্শ করা ইত্যাদি কারণে কভিড তাদের বিদ্যমান স্বাস্থ্যগত সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিবন্ধীর শ্বাসতন্ত্রের কার্যকারিতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কার্যকারিতা, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিস তাদের ঝুঁকির মাত্রা আরো একধাপ এগিয়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন সুরক্ষায় বিশেষ কিছু পরামর্শ প্রদান করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো, যত দূর সম্ভব লোকজনের ভিড় তাদের এড়িয়ে চলতে সহায়তা করা, অন্যদের সঙ্গে শারীরিক সংস্পর্শ (ফিজিক্যাল কন্টাক্ট) কমিয়ে নিয়ে আসা, প্রতিবন্ধী পরিবারে পরিষ্কারক সামগ্রী, ওষুধ বা মেডিক্যাল সামগ্রী মজুদ করে রাখা, প্রতিবন্ধীদের সহায়ক উপকরণ (চশমা, সাদাছড়ি, হুইলচেয়ার হাতল, খেলনা, ওয়াকার, থেরাপি যন্ত্র) বারবার জীবাণুমুক্ত করা। যদি বাড়িতে কারো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে প্রতিবন্ধী শিশুকে নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আক্রান্ত হলে টেলিফোনে পরামর্শ, খুদে বার্তা এবং ভিডিও বার্তায় সেবা গ্রহণ করা। সাধারণ মানুষের কভিডে আক্রান্ত হওয়া এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের, বিশেষত এনডিডি শিশুদের কভিডে আক্রান্ত হওয়া মারাত্মক পর্যায়ের ঝুঁকি বহন করে। প্রাক-বিদ্যমান স্বাস্থ্য শর্ত, স্বাস্থ্যসেবার অ্যাকসেস যোগ্যতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি—এর কোনোটিরই ব্যবহার কিংবা সেবাগ্রহণ এনডিডি শিশুদের একার পক্ষে গ্রহণ কিংবা বর্জন সম্ভবপর নয়। প্রতিবন্ধকতার অপসারণ, সমাজকে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অ্যাকসেসযোগ্য করে তুলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর কভিড-১৯ সংকটের প্রভাব এবং একটি অন্তর্ভুক্তযোগ্য, অ্যাকসেসযোগ্য এবং টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

 

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন, মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা