kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৩ বছর

মো. জাকির হোসেন

২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৩ বছর

আজ পার্বত্য শান্তিচুক্তি ২৩ বছরে পদার্পণ করল। দুই দশকব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। শান্তিচুক্তির পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরেনি। ইতি ঘটেনি সংঘাত ও অশান্তিরও। সবুজ পাহাড় প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হচ্ছে। শান্তিচুক্তির পর কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পাকিস্তান শাসনামলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এই সংঘাতের সূচনা হয়। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট বন্যায় সেখানকার প্রায় এক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। নিজেদের ভূমি ফিরে না পাওয়ায় অসন্তোষ ছিল পাহাড়িদের মধ্যে। হাজারো পরিবার ভারতে চলে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্বায়ত্তশাসন ও নিজস্ব আইন পরিষদ গঠন, পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ কয়েক দফা দাবি উত্থাপন করেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর সরকার যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশ মেরামতের কাজ করছে, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগানে ব্যস্ত, সে সময় স্বায়ত্তশাসন ও নিজস্ব আইন পরিষদ গঠনের মতো দাবির প্রতি মনোযোগ দেওয়া যৌক্তিকভাবেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্টি হয় অসন্তোষ। নিজেদের অধিকার রক্ষায় ১৯৭৩ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। তাদের সামরিক সংগঠন ছিল শান্তিবাহিনী। শুরু থেকেই দুটি মতাদর্শে ভাগ হয়ে যায় জনসংহতি সমিতি। মানবেন্দ্র লারমার নেতৃত্বে ছিল বামপন্থী লারমা গ্রুপ, অন্যদিকে প্রীতিকুমার চাকমার নেতৃত্বে ছিল জাতীয়তাবাদী প্রীতি গ্রুপ। ১৯৭৭ সালে শান্তিবাহিনী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এরপর সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামকে ২৪তম ডিভিশনের জিওসির অধীনে আনে। পাল্টা হামলা শুরু করে। সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৭৯ সালে গোষ্ঠী মালিকানাধীন জমিকে খাসজমি ঘোষণা করে সেখানে বাঙালি বসতি স্থাপনের কার্যক্রম নেয় জিয়া সরকার। উচ্ছেদ হয় বহু পাহাড়ি পরিবার। ১৯৯১ সালে বাঙালির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় মোট জনসংখ্যার ৪৮.৫ শতাংশে, যা ১৯৭৪ সালে ছিল ১১.৬ শতাংশ। আশির দশকে শান্তিবাহিনী সামরিক দিক থেকে সংগঠিত হতে শুরু করে। ১৯৮৩ সালে প্রতিদ্বন্দ্ব্বীদের হামলায় নিহত হন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। তাঁর ছোট ভাই জোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) দলের নেতৃত্বে আসেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ইচ্ছায় পার্বত্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে জেএসএসের চুক্তি হয়। চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে জেএসএস ও সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে চলছে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ।

জেএসএসের শীর্ষ নেতা সন্তু লারমার অভিযোগ শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। আর এ জন্য তিনি সরকারকেই দায়ী করে আসছেন। চুক্তি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ সরকার মানতে রাজি নয়। সরকারের তরফ থেকে একটি অভিযোগ জনসংহতি সমিতির কাছে—সরকারের প্রধান শর্ত ছিল শান্তির জন্য অস্ত্র সমর্পণ; এই শর্ত গত ২২ বছরেও তারা পূরণ করেনি। তা সত্ত্বেও চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের কাজ শেষ হয়েছে। ১৫টি ধারার আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ৯টি ধারা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকার সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করেছে, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং নিয়ন্ত্রণাধীন ৩৩টি দপ্তর-সংস্থার মধ্যে রাঙামাটিতে ৩০টি, খাগড়াছড়িতে ৩০টি এবং বান্দরবানে ২৮টি হস্তান্তর করা হয়েছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গঠন করা হয়েছে ভূমি কমিশন। প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩টি উপজাতি শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা এবং ৭২৫ জনকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শান্তিচুক্তির পর দুই হাজার ৫২৪ জনের বিরুদ্ধে ৯৯৯টি মামলার তালিকার মধ্যে ৮৪৪টি মামলা যাচাই-বাছাই করে ৭২০টি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছে। একটি পদাতিক ব্রিগেডসহ ২৩৮টি নিরাপত্তা বাহিনী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংসদ উপনেতার নেতৃত্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল-২০১০ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। ক্ষুদ্র তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির ক্ষেত্রে নৃগোষ্ঠীর লোকদের নির্ধারিত কোটা অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৃগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় পদে নৃগোষ্ঠীর মধ্য থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে জারীকৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। ভূমিবিষয়ক আইন ও বিধিমালা ছিল না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন ২০০১ প্রণয়ন এবং ২০১৬ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিকভাবেও উন্নয়ন হয়েছে। অনেক উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বাজেট ছিল ৫০.৫৭ কোটি টাকা, আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ হয়েছে ৯১৫.৮৩ কোটি টাকা। তিন পার্বত্য জেলায় দুই হাজার ৮৯৯ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্গম হওয়ার কারণে যেখানে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়, এ রকম পাঁচ হাজার ৫০০টি পরিবারকে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। শান্তিচুক্তির আগে পার্বত্য অঞ্চলে মাত্র ২০০ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। রুমা ও থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদীর ওপর কোনো সেতু ছিল না। এখন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাস্তা ও বিভিন্ন আকারের সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। শান্তিচুক্তির পর এক হাজার ৫৩২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে এবং প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের রয়েছে। শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে টেলিযোগাযোগ, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের আওতা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হয়েছে, যা শান্তিচুক্তির আগে ছিল না বললেই চলে। চুক্তির আলোকে পার্বত্য জেলায় কৃষি, স্বাস্থ্য, নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি বেশ কিছু এলাকা পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি চালু রয়েছে। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় দারিদ্র্য বিমোচন তথা জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েক শ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এর পরও নাখোশ নৃগোষ্ঠীর নেতারা। সন্তু লারমা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেন না। এলাকায় ভোটার হননি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রও নেননি। যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে জেএসএসের অভিযোগ, তা হলো, ভূমি সমস্যার সমাধান, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন, পরিষদগুলোকে যথাযথ ক্ষমতা দেওয়া, স্থানীয় পুলিশ বাহিনী গঠন, বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের বিষয় সুরাহা, সম্পূর্ণ বেসামরিকীকরণ (অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প ও সেনাবাহিনীর চলতি অপারেশন ‘উত্তরণ’ প্রত্যাহার), আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং পাহাড়ি প্রকৃতির সুরক্ষা।

পার্বত্য সমস্যার মূল হচ্ছে ভূমি সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র লড়াইয়ের সময় প্রায় ১৩ হাজার পাহাড়ি পরিবার ভারতে চলে গিয়েছিল। প্রায় ৯৩ হাজার পরিবার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হয়েছিল। অন্যদিকে প্রায় চার লাখ ভূমিহীন বাঙালিকে পাহাড়ে পুনর্বাসন করা হয়। পাহাড়ি মানুষের অভিযোগ, তাদের জমিতেই বাঙালিদের বসতি স্থাপন করা হয়েছে। পাহাড়িদের দাবি, চুক্তির আওতায় গঠিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন প্রকৃত মালিকদের জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় এবং বিতর্কে প্রায় দুই দশক চলে গেছে। অবশেষে আইনটি সংশোধনের পর কমিশন নতুন করে গঠিত হয়েছে। কমিশনের কাছে জমি ফেরত চেয়ে ২২ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। ভূমি বিরোধের সুরাহা হওয়ার সঙ্গে শুধু জীবন-জীবিকার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভোটার হওয়ার বিষয়। পাহাড়িরা জমি ফিরে পেলে নিশ্চিত হবে সে কোন এলাকার ভোটার হবে। অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী অউপজাতীয় অর্থাৎ পুনর্বাসিত বাঙালিদের ভোটার হতে হলে পাহাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। ভূমির মালিকানা নিরঙ্কুশভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। নয়তো তারা স্থায়ী বাসিন্দার স্বীকৃতি পাবে না। তালিকা করার এই বিধি নিয়ে বাঙালির প্রবল আপত্তি। তাদের দাবি, পুনর্বাসিত বাঙালিরা পাহাড়ে একাধিক প্রজন্ম পার করেছে। এখানে তারা ভোটার হবে না কেন? তাদের আরেকটি যুক্তি হলো, সংসদ এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটার তালিকায় পুনর্বাসিত বাঙালিরা অন্তর্ভুক্ত। তাহলে জেলা পরিষদের জন্য স্থায়ী বাসিন্দার শর্তযুক্ত আলাদা ভোটার তালিকা কেন প্রয়োজন? স্থানীয় বাঙালি সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা তাই চুক্তির কিছু বিষয়ে সংশোধনসহ এর বাস্তবায়ন দেখতে চান। শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ। চুক্তি অনুযায়ী স্থানীয় পাহাড়ি ও অউপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দারা প্রত্যক্ষ ভোটে জেলা পরিষদ নির্বাচন করবেন। নির্বাচিত এই প্রতিনিধিরা আঞ্চলিক পরিষদকে নির্বাচিত করবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত জেলা পরিষদগুলোর জন্য কোনো ভোটার তালিকা হয়নি। নির্বাচনও হয়নি। চুক্তির ২২ বছর পরও পাহাড়ে শান্তি ও আস্থা ফেরেনি। সেখানে পাহাড়ি-বাঙালি স্বার্থের সহিংস সংঘাত চলমান। কাঙ্ক্ষিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য (২০১৬) বলছে, পাহাড়ে দরিদ্র ও চরম দরিদ্র মানুষের হার জাতীয় হারের দ্বিগুণ। আর সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৬-২০) দলিলে আছে, সব ধরনের উন্নয়ন নির্দেশকের নিরিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। সরকারের গৃহীত প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যের হার কমে আসবে সন্দেহাতীতভাবে।

শান্তিচুক্তিতে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের প্রতিফলন হয়নি, এমন কথা বলে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কিছু নেতা শান্তিচুক্তি গ্রহণ না করে তখনই নতুন দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠন করেছিলেন। ২০০৭ সালে জেএসএস ভেঙে তৈরি হয় জেএসএস-এম এন লারমা দল। আর ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ ভেঙে তৈরি হয় ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক দল। এই চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পাহাড়ের সবুজ গালিচা রক্তাক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পাহাড়ি নেতারা চুক্তির বাস্তবায়নের ধীর গতিকে রক্তপাতের কারণ হিসেবে অভিহিত করলেও প্রকৃতপক্ষে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্ত ঝরছে পাহাড়ে। আঞ্চলিক দলগুলো এত দিন নিজেদের মধ্যে হামলার ঘটনাগুলো সীমাবদ্ধ রেখেছিল। সম্প্রতি বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে ভোট শেষে ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে উপজেলা সদরে ফেরার পথে দুই নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ সাতজনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে চারজন আনসার সদস্যও ছিলেন। অন্যদিকে গত বছরের আগস্টে রাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর নিয়মিত টহল দলের ওপর একই দিনে দুটি হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সন্দেহের তীর আরাকান আর্মি নামে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দিকে। তার মানে, নতুন নতুন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আবির্ভূত হচ্ছে পার্বত্য সংঘাতের দৃশ্যপটে। পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।

সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চুক্তির সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, সরকার ও শান্তিচুক্তির পাহাড়ি পক্ষের মধ্যে কিছুটা আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাত্র সাতটি বৈঠকের মাধ্যমে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধে একটি শান্তিচুক্তি করা সম্ভব হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, খোলা মন নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই আস্থার সংকট কাটিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা