kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

একাত্তরের বাংলাদেশ চিরজীবী হোক

আবদুল মান্নান

২৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



একাত্তরের বাংলাদেশ চিরজীবী হোক

করোনাকালে আট মাস স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। নিত্যসঙ্গী পরিবারের তিনজন সদস্য, একটি ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন আর সৌজন্য সংখ্যা হিসেবে পাওয়া ডজনখানেক দৈনিক পত্রিকা। এই আট মাসে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি অনেক। পিঠাপিঠি বোনটি আমাদের ছেড়ে চলে গেল। তাকে দেখতেও যেতে পারিনি। অনেক শ্রদ্ধাভাজন আপনজনও ওপারে চলে গেলেন। শুধু ভারাক্রান্ত হয়েছি। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে যতই মনকে শক্ত রাখার চেষ্টা করি ততই চারদিকে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিজেকে চরমভাবে বিচলিত করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিত্যদিনের কার্যক্রম দেখে মনে হয় ওই একজন মানুষই একা একাত্তরের বাংলাদেশকে, যেই বাংলাদেশের জন্য তাঁর পিতা আজীবন লড়াই করেছেন, যে দেশটিকে স্বাধীন করার জন্য ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন, তা বাঁচানোর জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। কিন্তু সম্ভবত তিনি সব প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। যখন দেখি রাজপথে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে একটি চিহ্নিত শ্রেণির আস্ফাালন, তখন বুঝি এরা সবাই একজোট হয়েছে মুজিববর্ষে একাত্তরের সব অর্জন বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশকে আবার একটা মিনি তালেবানি পাকিস্তানে রূপ দিতে। এরই মধ্যে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কিছুটা আশকারা পাওয়া হেফাজতে ইসলামকে জামায়াতের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে। তাদের লড়াই নাকি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে নয়, তাদের লড়াই মূর্তির বিরুদ্ধে আর নাস্তিকদের বিরুদ্ধে। যখন এই সব ধর্মব্যবসায়ীর তাণ্ডবে একাত্তরের প্রজন্ম হতাশ এবং অনেকটা দিশাহারা, ঠিক তখনই জাতীয় সংসদে ঘটল এক অভাবিত ঘটনা। মুজিববর্ষ উপলক্ষে ডাকা হয়েছিল সংসদের বিশেষ অধিবেশন। এই অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গৌরবের ও সম্মানের বিষয়। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে হয়তো এই অধিবেশনে কথা বলতে আসতেন বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রনায়ক ও পণ্ডিত ব্যক্তি। কিন্তু তাঁরা না আসায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন বর্তমান সংসদের সদস্যরা। কিন্তু তাঁদের সার্বিক কর্মকাণ্ডে জাতি চরম হতাশ। এই অধিবেশনটা অনেক পরিকল্পিত হতে পারত। পারেনি। কারণ সংসদে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কথা বলার প্রস্তুতি তেমন কারো ছিল না। সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম তোফায়েল আহমেদ। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৫০টি মহিলা আসনসহ মোট ৩৫০ জন সদস্য আছেন। আমার সঙ্গে অনেকে দ্বিমত করতে পারেন হাতে গোনা যে কজন পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন তাঁর মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আর মইন উদ্দীন খান বাদল অন্যতম। বর্তমানে প্রয়াত। তাঁরা যখন কথা বলতেন তখন তা শোনার জন্য অনেকে হাতের কাজ বাদ দিতেন। এখন মাত্র একজন আছেন, তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে এই তালিকা থেকে বাদ রাখছি। এই অধিবেশনে একদিন বাজানো হয়েছিল ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। এদিন সংসদে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান উত্থাপিত হয়েছিল অনুমোদনের জন্য। এই দিনটির অধিবেশনে একজন অতিথি হিসেবে বাবার সঙ্গে আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। বাবাকে পাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী। আমরা একই পাড়ার বাসিন্দা ছিলাম।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বরের সংসদ অধিবেশনটা ঐতিহাসিক ছিল। কারণ এই দিন নতুন স্বাধীন দেশের জন্য প্রথম সংবিধান অনুমোদনের জন্য সংসদে উত্থাপিত হয়। পাকিস্তান ১৯৫৬ সালে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিল; কিন্তু বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই দেশে সামরিক আইন জারি হয়ে যায়, বাতিল করা হয় সেই সংবিধান। ভারতে সংবিধান গৃহীত হয় ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে। বাংলাদেশে সেই সংবিধান ৯ মাসের কম সময়ে গৃহীত হয়। সেদিন বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতা শুরু করেছিলেন এভাবে—‘জনাব স্পিকার সাহেব, আজ সাড়ে সাত কোটি বাঙালি তাদের শাসনতন্ত্র পেতে যাচ্ছে। বাংলার ইতিহাসে বোধ হয় এই প্রথম নজির যে বাঙালিরা তাদের নিজেদের শাসনতন্ত্র প্রদান করছে। বোধ হয় নয়, সত্যিই প্রথম।’ বঙ্গবন্ধুর সেই দিনের ভাষণটি কিছুটা তাঁর ৭ই মার্চের আদলে দেওয়া। তিনি বাঙালির দীর্ঘদিনের শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছিলেন। বিশদভাবে বর্ণনা করেছিলেন সংবিধানে বর্ণিত জাতীয় চার মূলনীতির তাৎপর্য। ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়...আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বৎসর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যভিচার...পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা চলবে না।’ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর জিয়া প্রথম যে অপকর্মটি করলেন তা হচ্ছে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে লেখা পবিত্র সংবিধান থেকে ১৯৭৭ সালে জাতীয় চার নীতির অন্যতম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ছেঁটে ফেলা। সেদিন জাতীয় সংসদে কেন বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র অংশটি বাদ গেল তার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজের মতো করে দিয়েছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকে বলেছেন, সরকারে আওয়ামী লীগ; কিন্তু ক্ষমতায় জামায়াত-বিএনপি। এই দিনের ঘটনা তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পুরো ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। ভাষণটি বাজানোর আগে এটি বঙ্গবন্ধুর প্রকাশিত বক্তৃতার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ায় কোনো সমস্যা ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে মূর্তি অবহিত করে এক ধরনের অর্ধশিক্ষিত কাটমোল্লা আর ধর্মব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তাঁদের বেশির ভাগই মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে তফাত বোঝেন না, তা কিন্তু নয়। তাঁরা নানাভাবে আশকারা পেয়ে এখন ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে ব্যস্ত। ২০০১ সালের কথা। সেবার আমার তৃতীয় দফায় হজ উপলক্ষে পবিত্র মক্কা নগরীতে যাওয়া। এই সময় আফগানিস্তান তালেবানের দখলে। অনিন্দ্যসুন্দর একটি দেশকে তারা মোটামুটি তখন ধ্বংস করে দিয়েছে। সাহায্য সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তান। একদিন তালেবান তস্কররা আফগানিস্তানের দুই হাজার বছরের পুরনো বামিয়ানের দুটি বিশাল বুদ্ধমূর্তি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিল। এই মূর্খরা জানে না যে একসময় এখানে গান্ধারা সভ্যতা বলে একটা সভ্যতা ছিল, যার বিস্তৃতি ছিল আফগানিস্তান থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বর্তমান পাকিস্তানে। এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধ ধর্মকে ঘিরে। সেটি খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ২০০ বছর আগে। সেই আফগানিস্তানে পরবর্তীকালে অনেক মুসলমান শাসনকর্তা বা সরকার এসেছে; কিন্তু কেউ এ ধরনের অপকর্ম করেনি। পবিত্র হেরেমে ফজরের নামাজ শেষ করে আসার পথে সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত এক কপি ইংরেজি দৈনিক ‘অ্যারাব নিউজ’ কিনে আনি। সেদিনের পত্রিকায় বেশ বড় করে বামিয়ানে বুদ্ধমূর্তি ভাঙা নিয়ে ‘This is not Islam’ শিরোনামে একটি উপসম্পাদকীয় ছাপা হয়, যাতে বলা হয় এমন একটি শিল্পকর্ম ধ্বংস করার নাম ইসলাম নয়। এই বুদ্ধমূর্তিতে কেউ পূজাও করছিল না।

সব ধর্মের মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, তা ইসলামে অনুমোদিত। পবিত্র কোরআনে ও হাদিসে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা সম্পূর্ণরূপে বারণ আছে। পবিত্র কোরআনে আছে, ‘বলুন হে কিতাবিরা! তোমরা তোমাদের দ্বিনে অন্যায় ১. বাড়াবাড়ি কোরো না ২. আর যে সম্প্রদায় ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে ও অনেককে করেছে এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।’ (সুরা মায়িদা : আয়াত ৭৭)। হাদিস শরিফে এই সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘লোকসকল! তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে দূরে থাকো। কেননা তোমাদের আগে বহু জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩০২৯, মুসনাদে আহমদ, ৩২৪৮, আল মুজামুল কবির, ১৫১৪০)

বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশই ভাস্কর্য আছে। ভাস্কর্যকে কেউ পূজা করে না, মূর্তিকে করে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। সারা দেশে ভাস্কর্য, তাও আবার রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্র। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সরস্বতীর ভাস্কর্য উপহার দিয়েছে। তুরস্কের বিখ্যাত ব্লু মস্কে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম কয়েক বছর আগে। ভেতরের দেয়ালে গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেলসহ সব ধর্মগ্রন্থ থেকে সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কী বলা আছে তুর্কি ও ইংরেজি ভাষায় তা বড় বড় করে বর্ণনা করা আছে। এমন একটা ঘটনা বাংলাদেশে ঘটলে এতক্ষণে মোল্লারা দেশটাকে ওলটপালট করে দিত। পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে জিন্নাহর ভাস্কর্য আছে। সমস্যাটা আসলে মূর্তি বা ভাস্কর্য নিয়ে নয়, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। এই ভাস্কর্য যদি মওদুদী বা গোলাম আযমের হতো, তাহলে কেউ টুঁ শব্দটি করত না। দেশের অনেক স্থানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার ভাস্কর্য আছে। তা নিয়ে কাউকে তেমন কোনো কথা বলতে শোনা যায় না।

কয়েক বছর আগে এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর্য ও সেনানিবাসে শিখা চিরন্তন ধ্বংস করার ঘোষণা দেওয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। বাংলাদেশে সম্প্রতি এক ধরনের ধর্মব্যবসায়ী ধর্মের নামে যা করছে তা তারা করার সাহস পেত না যদি না তাদের নানাভাবে আশকারা দেওয়া হতো। আশকার পেয়ে তারা এখন বাংলাদেশের মূলে আঘাত করার মতো ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। মূল কথা, কোনো কোনো প্রাণীকে বেশি আশকারা দিলে তারা আর জমিনে থাকতে চায় না। যে দেশ স্বাধীন করতে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, আড়াই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে সেই দেশকে কিছু ধর্মব্যবসায়ী আবার মিনি তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে না, তাও আবার জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে। সরকারকে এদের বিরুদ্ধে শক্ত হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের মতো বলতে হবে ‘The buck stops here’—আমার টেবিলেই সব কিছুর নিষ্পত্তি শেষ। একাত্তরের বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা