kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

চার উপায়ে মধ্যম আয়ের দেশ হতে পারে বাংলাদেশ

উইলিয়াম পেসেক

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চারটি উপায় বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। কভিড-১৯ সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সম্ভবত সবচেয়ে বিস্ময়কর দেশ।

গত মে মাসের কথাই বলা যাক। তখন দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির অর্থনীতি নিয়ে ভালো কোনো খবর ছিল না। ঘনবসতিপূর্ণ নগরী, নাজুক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থার কারণে সরকার এই বিপদ সামাল দিতে প্রস্তুত নয় বলেই মনে হচ্ছিল। একটা বিপর্যয় ঘটবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।

কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি। সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশটিতে করোনাভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ছয় হাজার ৩০০ জনের। সংখ্যাটি আমার নিজের শহর নিউ ইয়র্কের কুইন্সের চেয়ে এক হাজার কম। এ বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতকেও ছাড়িয়ে যাবে।

গত মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মাথাপিছু আয়ের নিরিখে ভারতের ওপরে স্থান দিয়েছে বাংলাদেশকে। বিষয়টি নরেন্দ্র মোদির জন্য অস্বস্তির কারণ। একসময় হেনরি কিসিঞ্জার যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই দেশই এ অর্জন করছে। শেখ হাসিনার অধীনে ১১ বছরে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে, সে কথাই বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের অর্জন। মনে রাখতে হবে, এই কাজটি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভয়াবহ বাণিজ্যযুদ্ধের সময়।

২০১৭ সাল থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে সর্বাধিক উপকৃত হয়েছে ভিয়েতনাম। ৯ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ভিয়েতনামের লোকজন ও সরকারব্যবস্থার সঙ্গে চীনের প্রচুর মিল রয়েছে। বলা যায়, ওয়াশিংটন বনাম বেইজিং লড়াইয়ে ‘মিনি চায়না’ হিসেবে খ্যাত ভিয়েতনাম লাভবান হয়েছে।

অন্যদিকে হাসিনা সরকার ধীরেসুস্থে নিম্ন মজুরির বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে নতুন গন্তব্যে পরিণত করেছে, বহুজাতিক কম্পানিগুলো এখন চীন থেকে সরে আসার ব্যাপারে ভাবতে পারে। খুব বেশি দূর যেতে হবে না, ফাস্ট রিটেইলিংয়ের বিষয়গুলো দেখলেই হবে। বাংলাদেশের ‘সবার জন্য পোশাক’ ব্র্যান্ড ক্রমবর্ধমান হারে উদ্যোক্তা-নিয়োগকারী বাড়াচ্ছে। সবেমাত্র শুরু। বর্তমান সাফল্য কাজে লাগিয়ে আরো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করতে পারবে বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তনের বিরল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার যদি সামাজিক সূচকগুলোর (দারিদ্র্য হারসহ) উন্নতি অব্যাহত রাখতে পারে, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক করতে আরো শ্রম দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ অনেক গতিশীল হবে। বাংলাদেশ তার মাথাপিছু আয় এখনকার এক হাজার ৯০০ ডলারের চেয়ে অনেক বাড়াতে পারবে।

বাংলাদেশ যেসব প্রক্রিয়ায় মধ্যম আয়ের মর্যাদা লাভের প্রয়াসকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং আরো বেশি কম্পানিকে প্রলুব্ধ করতে পারে, তার চারটি উপায় হলো—

এক. ব্যবসা করার কাজটি সহজতর করা। ভিয়েতনামকে বহুজাতিক কম্পানিগুলোর সিইওরা পছন্দ করে। কারণ ওই দেশে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কম। ভিয়েতনাম কিন্তু মনে করে, বিদেশিদের কাছে অন্য বিকল্পও আছে। বিদেশিরা যাতে অন্য দেশে চলে না যায়, সে চেষ্টা করে তারা। এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়ায় বিশ্বব্যাংকের ব্যাবসায়িক পরিবেশের তালিকায় ভিয়েতনামের র্যাংক ৭০, বাংলাদেশের ১৬৮। মাথাপিছু আয়ে ১০ হাজার ডলারের কাছাকাছি যেতে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পারবে না ক্যামেরুন বা মিয়ানমার।

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন আহসান মনসুর বলেন, অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করার পাশাপাশি ব্যবসাসূচকের মান ভালো করার জন্য বাংলাদেশকে অনেক কাজ করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। আর এসব কাজ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন ও দক্ষতা বাড়ানো।

দুই. আর্থিক সংস্কার করতে হবে। শেখ হাসিনা উন্নয়ন খাতে অনেক কিছু করলেও তাঁর সরকার ব্যাংক সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনে বড় ধরনের ভুল করেছে। কেনিয়া থেকে এই উদাহরণটি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এর কারণে হিতে বিপরীত হতে পারে। কুঋণে জর্জরিত দেশটির এ খাতে আরো খারাপ অবস্থা হতে পারে।

জুনের মধ্যে নন-পারফরমিং ঋণ মোট ঋণের ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ একটা অবস্থা। তবে ভালো খবর হলো, হাসিনার সরকার করপোরেট বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে। ব্যাংক অর্থায়নের ওপর কম্পানির নির্ভরশীলতা কমানোর মধ্যে আশাব্যঞ্জক বিষয় রয়েছে। ভিয়েতনামকে ধরতে হলে আরো কিছু করতে হবে।

তিন. মানবপুঁজিতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ দরকার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের জন্য ভালো খবর হচ্ছে, এই দেশ পাকিস্তানের মতো নয় এবং ভারতের বর্ধমান সাম্প্রদায়িক জটিলতার প্রভাব থেকে মুক্ত। জেন্ডার সাম্যতাও বাংলাদেশে ভালো।

চীন থেকে অপসৃয়মাণ কর্মসংস্থান সুবিধা ভারতের বদলে যাতে বাংলাদেশে আসে তা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উত্পাদনশীল খাতে তৎপরতা বাড়াতে হবে। ভিয়েতনামের এগিয়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো, তারা আগেরকার এশিয়ান টাইগারদের পথ অনুসরণ করে তাদের শ্রমের মান উন্নয়ন করেছে। পূর্ব এশিয়ার মডেলটি ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ বেশি ভালো করে অনুসরণ করছে। মানবপুঁজিতে বড় বিনিয়োগ ঢাকার উন্নয়নপ্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করবে।

চার. অর্থনীতিকে ডিজিটাইজ করা দরকার। ফেব্রুয়ারিতে করোনাভাইরাস সব কিছু বদলে দেওয়ার আগে আমি মোবাইল ব্যাংকিং সেনসেশন বিকাশের সহপ্রতিষ্ঠাতা কামাল কাদিরের সঙ্গে একটি দিন কাটিয়েছি। পাঁচ কোটি গ্রাহকের এ খাতে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন ও জ্যাক মার অ্যান্ট গ্রুপ সহায়তা করছে।

বিকাশের দ্রুত বিকশিত হওয়া হাসিনা সরকারের জাতিকে ডিজিটাইজ করার পদক্ষেপের অংশ। তার মানে, ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত না থাকা প্রায় ৫০ শতাংশ বয়স্ক লোককে আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। এর আরেকটি মানে হলো, দিল্লিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র পরাশক্তি নয়।

 

লেখক : টোকিওভিত্তিক পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক ও ‘জাপানাইজেশন : হোয়াট দ্য ওয়ার্ল্ড ক্যান লার্ন ফ্রম জাপান’স লস্ট ডিকেডস’ গ্রন্থের রচয়িতা

সূত্র : সাউথ এশিয়ান মনিটর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা