kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বিদায় বস

রামেন্দু মজুমদার

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদায় বস

কবে কখন থেকে আমরা পরস্পরকে ‘বস’ বলে সম্বোধন করতাম, আজ আর তা মনে পড়ে না। যদিও প্রায় একই সময়ে আমরা করাচিতে কাজ করতাম, একই পেশায় ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, তখন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও আলী যাকেরের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। এমনকি দেখা হয়নি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও। সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশে সূচনা হলো এক বন্ধুত্বের, দিনে দিনে তা গভীরতর হয়েছে। তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গেই কি ছিন্ন হবে সে বন্ধন? না, আমাদের সম্পর্কের সুখস্মৃতি বয়ে বেড়াব যত দিন আমি বেঁচে থাকব।

আলী যাকের। এক পরিপূর্ণ জীবন। যেখানে হাত দিয়েছেন, সোনা ফলেছে। পেশাগত জীবনে তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানকে পৌঁছে দিয়েছিলেন শীর্ষে। অন্যদিকে তাঁর ভালোবাসার জায়গা নাটকেও তিনি একটা বিশাল অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

যাকের বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর মঞ্চে নাটক করা শুরু করেন আরণ্যকের হয়ে। তারপর যোগ দেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে। বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ দিয়ে যে যাত্রা শুরু, তা থেমে গেল দ্বিতীয়বার প্রযোজিত ‘গ্যালিলিও’তে।

বিশাল দেহের অধিকারী হওয়ায় তাঁর একটা সুবিধা হয়েছিল। যখনই মঞ্চে প্রবেশ করতেন, দর্শকের দৃষ্টি তাঁর দিকেই নিবদ্ধ থাকত। ‘ম্যাকবেথ’, ‘টেমপেস্ট’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’, ‘গ্যালিলিও’ কিংবা ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ নাটকগুলোর প্রধান চরিত্র যেন তাঁর জন্যই তৈরি হয়েছিল। কী অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে তিনি এই ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

আমরা থিয়েটার থেকে একটা নাটকের পরিকল্পনা করেছিলাম। মার্কিন নাট্যকার এ আর গার্নির ‘লাভ লেটারস’-এর বাংলা রূপান্তর করে দিয়েছিলেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম—‘প্রেমপত্র’। এ নাটকটির দুটি চরিত্র। আলী যাকেরকে অনুরোধ করেছিলাম পুরুষ চরিত্রটি করতে আর ফেরদৌসী মজুমদার করবেন নারী চরিত্রটি। যাকের খুব আনন্দের সঙ্গে সম্মত হয়েছিলেন। নির্দেশনা দেওয়ার কথা ত্রপা মজুমদারের। তাঁর বাসায় নাটকটি পড়া হলো এবং মহড়ার দিনও নির্ধারিত হলো। কিন্তু হঠাৎ করে আবার তাঁর শরীর খারাপ করায় আমরা নাটকের কাজ স্থগিত রাখলাম। সে বছর দুয়েক আগের কথা। আমরা চাইনি তাঁকে ছাড়া নাটকটি করতে। মাসখানেক আগে সারা যাকের যখন বললেন, যাকেরের পক্ষে আসলে নাটক করা আর সম্ভব হবে না, তখন আমি ফোন করে যাকেরকে বললাম, “বস, আমরা কি ‘প্রেমপত্র’ নাটকটা করার প্রস্তুতি নিতে পারি? আপনার যখন শরীর ভালো হবে, তখন আপনি করবেন।” তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই, শুরু করুন, আই উইল জয়েন ইউ।’ জয়েন আর করা হলো না।

আজ যখন আলী যাকের ও তাঁর সাত সহযোদ্ধার অমর কীর্তি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হলো, তখন বিউগলের করুণ সুর আমাদের হৃদয় যেন বিদীর্ণ করে দিল। যাকেরের জীবনে একটা গৌরবের অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন আমৃত্যু। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করেননি কোনো দিন। যখনই সুযোগ পেয়েছেন, আমাদের সঙ্গে প্রতিবাদী সভা-সমাবেশ-মিছিলে যোগ দিয়েছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁকে পেয়েছি সামনের সারিতে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের দাবিতে অনুষ্ঠিত গণ-আদালতে অংশ নেওয়ার জন্য যে ২৪ জন বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যাকের ছিলেন তাঁদের অন্যতম।

আলী যাকের প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন টেলিভিশনে অভিনয় করে। মঞ্চে তিনি বেশির ভাগই সিরিয়াস চরিত্র করেছেন; কিন্তু টিভিতে উল্টো। হুমায়ূন আহমেদের লেখা দুটি ধারাবাহিক নাটকে তাঁর অভিনয়ের স্মৃতি দর্শক কোনো দিন ভুলতে পারবে না। একসময় টিভি নাটকের ‘মামা’ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে তিনি জাতীয় মামা হয়ে উঠেছিলেন।

বেশ কয়েকটি শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্রেও তিনি তাঁর অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তরুণ নির্মাতাদের চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল; কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততার কারণে সময় দেওয়া সম্ভব হতো না।

দীর্ঘদেহী আলী যাকেরের মনটা ছিল শিশুসুলভ। তাঁর চরিত্রে ছিল শিশুর সারল্য। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিবেশে সময় কাটাতে দারুণ পছন্দ করতেন। একটা প্রধান শখ ছিল ছবি তোলা। পেশাদারি দক্ষতার সঙ্গে ছবি তুলতেন। কত ক্যামেরা আর কত ধরনের লেন্স যে তাঁর সংগ্রহে ছিল, তা বলার নয়। একই রকম সংগ্রহ ছিল লেখার কলম আর চশমার। থরে থরে সাজানো সব কলম আর চশমা তাঁর টেবিলে। আসলে জীবনে উপার্জন করেছেন প্রচুর এবং তাঁর আনন্দের জায়গাগুলোতে অর্থ ব্যয় করতে কোনো কার্পণ্য করেননি। জীবনকে তিনি উপভোগ করেছেন। কিন্তু মারণব্যাধি তাঁর শেষ জীবনটাকে ওলটপালট করে দিল। এত কষ্ট তাঁর নিশ্চয়ই পাওনা ছিল না। কিন্তু বিধিলিপি বোধ হয় খণ্ডানো যায় না।

জানি, জীবন থেমে থাকে না। তাইতো রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নিয়ে গাইতে চাই :

‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।

তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা