kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কভিড-১৯ ও ইমিউন সিস্টেম

অ্যাঞ্জেলা রাসমুসেন

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কভিড-১৯ থেকে যারা সেরে উঠেছে, তাদের মধ্যে ইমিউন রেসপন্স গড়ে ওঠা বিষয়ক প্রচুর সাংঘর্ষিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিন লাখ ৫০ হাজারের বেশি লোকের মধ্যে অ্যান্টিবডির অবনতি ঘটতে দেখা গেছে; এটা হলে ইনফেকশনের পর কয়েক মাসের মধ্যে ইমিউনিটি দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়।

পরদিন আরেক সমীক্ষা বিপরীত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় : নিউ ইয়র্ক সিটিতে ৩০ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর বেশির ভাগ লোকের মধ্যে উচ্চমাত্রার ইমিউনোগ্লোবিন-জি অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এগুলো এমন ধরনের অ্যান্টিবডি, যা সাধারণত সার্স-কভ-২-কে (কভিড-১৯ এর জন্য দায়ী ভাইরাস) নিষ্ক্রিয় করে। স্বাভাবিকাবেই বিষয়টা বেশ গোলমেলে। সার্স-কভ-২ কি একটি সুপারভাইরাস, যা ইমিউন সিস্টেমকে পরাভূত করে? ইমিউন সিস্টেম আমাদের কার্যকরভাবে অনেক প্যাথোজেন (রোগ-ব্যাধি) থেকে রক্ষা করে। যারা কভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছে, তারা কি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাকারী ইমিউনিট আশা করতে পারে, নাকি পারে না!

সুখবর হচ্ছে, আমরা সম্ভবত সার্স-কভ-২ দ্বারা বারবার পুনরাক্রান্ত হব না, যতক্ষণ না আমরা সবাই করোনাভাইরাসে নির্মূল হয়ে যাই। কভিড-১৯ রোগী এবং প্রাণী-মডেলের বেশির ভাগের মধ্যে ইমিউন রেসপন্স ভাইরাল ইনফেকশনের ক্ষেত্রে গড়পড়তা ধরনের। প্রাথমিকভাবে শরীর উঁচু মাত্রার ইমিউনোগ্লোবিন-জি উৎপাদন করে; কিন্তু ইনফেকশন দূর হয়ে যাওয়ার পর সেই অ্যান্টিবডিগুলো বেজলাইন লেভেলে নেমে আসে। সেগুলো কিছু সেরোলজিক্যাল পরীক্ষায় নির্ধারণের মাত্রার নিচে থাকতে পারে।

অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয় বি-সেল দ্বারা; এগুলো হচ্ছে স্পেশালাইজড ইমিউন সেল, যারা নির্দিষ্ট টাইপের অ্যান্টিজেন বা ভাইরাল টার্গেট চিহ্নিত করতে পারে। যখন ইনফেকশন দূর হয়ে যায়, অ্যান্টিবডি উৎপাদনকারী বি-সেলগুলো প্লাজমা সেল না হয়ে (এরা বিপুল পরিমাণ সার্স-কভ-২ নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডিকে অপসারণ করতে পারঙ্গম) মেমোরি বি-সেল হয়ে উঠতে চায়। এই কোষগুলো ইমিউনোগ্লোবিন-জি অ্যান্টিবডির নিম্ন ধাপ তৈরি করে; গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এরা শরীরে কয়েক বছর ধরে থাকে। তারা যদি সার্স-কভ-২-এর কাছে পুনঃ উন্মোচিত হয়, তাহলে খুব দ্রুত প্লাজমা সেলে পরিবর্তিত হয় এবং ফের উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবডি উৎপাদন শুরু করে।

কোনো ইঙ্গিত নেই যে বেশির ভাগ কভিড-১৯ রোগী ইমিউন মেমোরি তৈরি করছে না এবং প্রাণীদের মধ্যে যারা সার্স-কভ-২ দ্বারা এক্সপেরিমেন্টালি ইনফেক্টেড, তারা ভাইরাসের হাই ডোজের পুনঃ চ্যালেঞ্জ থেকে সুরক্ষিত। বেশির ভাগ লোক, যারা কভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছে, তাদের দেহে (সংক্রমণের কয়েক মাস পরে) শনাক্তকরণযোগ্য নিষ্ক্রিয়কারী অ্যান্টিবডি থাকে। এর মানে সার্স-কভ-২-এর সংক্রমণ এমন ইমিউন রেসপন্স তৈরি করে, যা সুরক্ষামূলক, অন্তত কয়েক মাসের জন্য। কত দিন এ সুরক্ষাব্যবস্থা টিকবে তা নির্ধারণ করার জন্য আমাদের কাছে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো চয়েস নেই। সার্স-কভ-২ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে এক বছরেরও কম সময় ধরে এবং ইমিউনের স্থায়িত্ব সমীক্ষার জন্য অপেক্ষা করা ও প্রত্যক্ষ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

উপরন্তু অ্যান্টিবডিই ইমিউন সিস্টেমের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়, টি-সেলও ইমিউন রেসপন্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরা দুই ধরনের—সহায়ক টি-সেল, যারা ইমিউন রেসপন্স সমন্বয় করে ও ইমিউনোলজিক্যাল মেমোরিকে সহজতর করে এবং হন্তারক টি-সেল, যারা সংক্রমিত কোষকে হত্যা করে। আগের সমীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে, সার্স-কভ-২ সংক্রমণ হলে জোরদার টি-সেল রেসপন্স তৈরি হয়।

উল্লেখ্য, কিছু লোকের, যাদের কখনো কভিড-১৯ হয়নি, তাদের আগেকার (সাধারণত ঠাণ্ডা লাগার সমস্যা) করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত কারণে মেমোরি টি-সেল থাকতে পারে, যা সার্স-কভ-২-এর সঙ্গে ক্রস-রিঅ্যাক্ট করে। এটা এ কথাই নির্দেশ করে যে লোকজনের মধ্যে কিছু সুরক্ষাব্যবস্থা অস্তিত্বমান রয়েছে। উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ, সার্স-কভ-২-এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরিতে টি-সেলের ভূমিকা অনেকটাই অজানা এবং এটা সমীক্ষার একটি বিষয়। টি-সেল একা সম্পূর্ণ ইমিউন প্রটেকশন তৈরি করতে পারে না। তবে এগুলো ইমিউন মেমোরির গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রিবিউটর।

এই সেলগুলোর রেসপন্স আরো বলে যে সার্স-কভ-২ এমন কোনো ব্যত্যয়ী ভাইরাস নয়, যার ইমিউন এড়ানোর জাদুকরী ক্ষমতা আছে। সার্স-কভ-২ কিছু অ্যান্টিভাইরাল রেসপন্সকে অবদমিত করতে পারে। সম্ভবত এ কারণে কিছু লোকের মধ্যে মারাত্মক পর্যায়ের কভিড-১৯ দেখা দেয়। এটা আমাদের ইমিউন প্রতিরক্ষার জন্য অঝুঁকিপূর্ণ নয়।

এখন কিছু পুনঃ সংক্রমণের ঘটনাও ঘটছে, তবে বর্তমানে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে এই সংক্রমণ সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আংশিক ইমিউনিটির লোকজনের মধ্যে পুনঃ সংক্রমণ ঘটতে পারে। এটা সম্ভব। এটা হলে হালকা-পাতলা রোগ হবে। অবশ্য এটা এখনো অপরীক্ষিত হাইপোথিসিস। হাইপোথিসিস হলেও এটা মনে করা উচিত হবে না যে ইমিউনিটি অকার্যকর এবং ভবিষ্যতে সার্স-কভ-২-কে প্রতিহত করার আশা নেই।

অন্যদিকে প্রাণীদের ওপর গবেষণায় ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রাপ্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য হচ্ছে, সম্ভাব্য ভ্যাকসিনগুলো এমন মাত্রায় অ্যান্টিবডি লেভেল তৈরি করতে পারে, যা সর্বোচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবডিসহ রোগীদের সুস্থ করার সমতুল্য; এই অ্যান্টিবডিগুলো টেকসই।

ভ্যাকসিনগুলো হয়তো সংক্রমণের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, তারা স্থায়ী সুরক্ষা দেবে। বাস্তবে আমাদের নীতিতে, প্রমাণভিত্তিক জনস্বাস্থ্য কৌশলে অপর্যাপ্ততা রয়েছে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম বলা চলে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করছে; বরং রাজনীতিকরা সময়মতো সাড়া দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

লেখক : ভাইরোলজিস্ট, জর্জটাউন সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ সায়েন্স অ্যান্ড সিকিউরিটির সঙ্গে যুক্ত

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য