kalerkantho

রবিবার। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৬ ডিসেম্বর ২০২০। ২০ রবিউস সানি ১৪৪২

এসডিজি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা

এম হাফিজ উদ্দিন খান

২২ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এসডিজি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর (এসডিজি) মধ্যে ১৬ নম্বর লক্ষ্যটি হচ্ছে ‘শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান’। এই দফার মূল কথাটি হলো একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। একটা দেশে যদি শান্তি না থাকে, তাহলে উন্নয়ন ব্যাহত হয়, কৃত উন্নয়ন হারিয়ে যায়। তাই উন্নয়ন টিকিয়ে রাখার জন্য শান্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। আর শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ন্যায়বিচার দরকার। একটি সমাজে ন্যায়বিচার না থাকলে বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। আর শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং তা রক্ষা করার দায়িত্ব হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। তাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সমাজকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হয়। খেয়াল রাখা দরকার, শুধু শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়ই নয়, সমগ্র এসডিজি বাস্তবায়নের জন্যও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৭টি এসডিজি নির্ধারণ করে দিয়েছে। একনজরে এসডিজিগুলো হলো—১. দারিদ্র্য বিমোচন, ২. ক্ষুধামুক্তি, ৩. সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, ৪. মানসম্মত শিক্ষা, ৫. লিঙ্গসমতা, ৬. সুপেয় পানি ও পয়োনিষ্কাশন, ৭. সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, ৮. শোভন কর্মযজ্ঞ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ৯. শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামোর উন্নয়ন; ১০. আন্তর্মহাদেশীয় বৈষম্য বিলোপ, ১১. টেকসই নগর উন্নয়ন, ১২. পরিমিত ভোগ ও উৎপাদন, ১৩. জলবায়ু কর্মসূচি, ১৪. জলজ প্রাণী ও সম্পদের সংরক্ষণ, ১৫. স্থলজ প্রাণী ও সম্পদ সংরক্ষণ; ১৬. শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং ১৭. আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধি।

লক্ষ্যগুলোর ওপর একনজর তাকালেই বোঝা যায়, এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আলাদা ভূমিকাটা হলো, তাদেরকে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হয়। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে জাতিসংঘ কিছু উপলক্ষ্যমাত্রা এবং এর সঙ্গে কিছু সূচক নির্ধারণ করে দিয়েছে। ১৬ নম্বর লক্ষ্যমাত্রার উপলক্ষ্যমাত্রাগুলো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য কমিয়ে আনা; জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা; তৎপর, অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করা; সংবেদনশীল করা, জনসাধারণের তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, সহিংসতা মোকাবেলায় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং বৈষম্যহীন আইন ও নীতিমালা তৈরি ও প্রয়োগ।

এসডিজিতে যদিও সরকারি ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও ভুললে চলবে না। পরিবারকে বলা হয়, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অথচ পরিবারগুলোতে মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় কর্মক্ষেত্রে অনৈতিক কর্মকাণ্ড করা হলে পরিবারে তা লুকিয়ে রাখা হতো। একসময় গ্রামীণ বিচার-আচার বা সালিসি ব্যবস্থা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখত। এখন বিচারের বাড়তি চাপ পড়ছে আদালতের ওপর এবং সংঘাত-সহিংসতা কমাতে ব্যস্ত থাকতে হয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। পরিবারগুলোকে এখন বিবেচনা করা হয় অর্থ দিয়ে। পরিবারগুলোতে আগে যে বন্ধন ছিল তা নেই। আগে সমাজে পারিবারিকভাবে অবদান রাখার যে সুযোগ ছিল তা এখন বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে সমাজে নানা সংঘাত দেখা দিচ্ছে। এর বাইরে সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকাও সমাজে ক্ষীণ হয়ে আসছে। সব সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরোক্ষাভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানেরই সহায়ক। তাই শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উজ্জীবিত করা জরুরি।

যেকোনো ক্ষেত্রেই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান না থাকলে কিছু করা সম্ভব হয় না। আমরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা দেখছি। এখন নির্বাচনব্যবস্থাও ভেঙে পড়তে দেখছি। অথচ শাসনব্যবস্থায় যেন স্বৈরতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য যুক্ত না হয়, সে জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা রাখতে হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা হতাশাজনক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাজ হলো—১. শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের বিস্তার ও তাতে তাদের অভ্যস্ত করে তোলা এবং ২. দক্ষ জনশক্তি তৈরি। কিন্তু এর কোনোটাই যথাযথভাবে না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে দেখছি। নানামুখী শিক্ষাব্যবস্থা উল্টো সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করছে। এসডিজির একটিতে মানসম্মত শিক্ষার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু এই ভঙ্গুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রশাসন দিয়ে কিভাবে সম্ভব?

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর ৩ নম্বরে রয়েছে সুস্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণ। কিন্তু সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার যে দায়িত্ব আমাদের স্বাস্থ্য প্রশাসন ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর, তা যে কতটা ভঙ্গুর তা করোনাভাইরাস এসে দেখিয়ে দিল। মহামারির শুরুর দিকে সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থতা, লোকজনকে আইসোলেশনে রাখতে বাধ্য করতে না পারা, করোনা পরীক্ষার ন্যূনতম পরিমাণ কিটের অভাব, দ্রুত পরীক্ষা করতে না পারায় রোগের বিস্তার, ভেন্টিলেশনসহ করোনার চিকিৎসায় উপকরণ ও প্রস্তুতির ঘাটতি, করোনার ভয়ে সাধারণ চিকিৎসার অভাবে মানুষের মৃত্যু ইত্যাদি কদাকার চিত্র আমরা দেখলাম। এমন নয় যে আমাদের অর্থের অভাব ছিল কিংবা সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল। মূল সমস্যা ছিল আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।

আলোচ্য এসডিজির একটি উপধারায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংবেদনশীল করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সেবাগ্রহীতাদের প্রতি কতটুকু সংবেদনশীল? সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী গেলে কত দ্রুত বিদায় করা যায় সেই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বেসরকারি হাসপাতাল অতি বাণিজ্যিক হতে হতে শেষ পর্যন্ত সাহেদদের মতো লোকের হাতে চলে যেতেও দেখা গেল। থানা কিংবা আদালতে বিচারপ্রার্থীরা কিভাবে হয়রানির শিকার হন, সেটা প্রতিনিয়তই লক্ষ করা যায়।

এসডিজির ৫ নম্বর উপধারায় সব ধরনের দুর্নীতি ও ঘুষ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত করতে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে; কিন্তু আমরা যদি ঘুষ-দুর্নীতি হ্রাস করতে না পারি, তাহলে উন্নয়ন ধরে রাখতে পারব না। দুর্নীতি জিইয়ে রেখে কখনোই টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে না। প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতি দমনের জন্য যেসব ‘ইনস্টিটিউশনাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ দরকার তার সবই আমাদের আছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার অভাব রয়েছে। আমাদের ইনস্টিটিউশনাল অ্যারেঞ্জমেন্টের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, অডিটর জেনারেল অফিস, বিচারালয়, পুলিশ ও পার্লামেন্টারি কমিটি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান নিজেরা কতটুকু শক্তিশালী, সে বিবেচনা আমরা করি না।

একটা কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, আমরা যারা সুশাসন চাই, শাসনব্যবস্থার উন্নতি চাই, তারা পার্লামেন্টের তৎপরতায় সন্তুষ্ট নই। পার্লামেন্ট যদি কার্যকর না হয়, প্রশাসনকে যদি পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহি করতে না হয়, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা সম্ভব নয়। আমরা সরকারি ব্যয়, কেনাকাটা ও হিসাবসংক্রান্ত বিষয়ে যেভাবে পার্লামেন্টকে ‘নিষ্ক্রিয়’ ভূমিকা পালন করতে দেখি তাতে এমনটাই মনে হয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পার্লামেন্টের বড়সড় কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না।

বিচারব্যবস্থায় আমাদের ভয়ংকর ত্রুটি রয়ে গেছে। এসব ত্রুটি দূর করতে হবে। আমাদের অনেক আইন সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। আর শুধু আইন সংস্কার যথেষ্ট নয়। যেমন দ্রুত বিচার আইন একটা উদাহরণ। এটা সবার জন্য দ্রুত হয় না।

আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন থেকে হতাশা প্রকাশ করে আসছেন। ফলে নিশ্চিতভাবেই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এসডিজি বাস্তবায়নে শক্তিশালী পার্লামেন্ট, শক্তিশালী প্রশাসন, কার্যকর ও সংবেদনশীল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আপসহীন দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতি দৃশ্যমান হচ্ছে না। তাই এসডিজি বাস্তবায়ন কার্যক্রম যাঁরা সমন্বয় করছেন, তাঁদের উচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে মূল মনোযোগটা দেওয়া। প্রয়োজনে তাঁরা একটি ‘প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ কমিটি’ গঠন করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা দেখাতে না পারলে উন্নয়ন যেমন স্থায়ী হবে না, তেমনি এসডিজি বাস্তবায়নও দুরূহ হয়ে পড়বে। সুতরাং এই অর্থে বলা যায়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা হবে এসডিজি বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা