kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৬ নভেম্বর ২০২০। ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

সেলাই করা খোলা মুখ

অসাম্প্রদায়িক সারদা স্যারের জন্য মন কেমন করে

মোফাজ্জল করিম

২০ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



অসাম্প্রদায়িক সারদা স্যারের জন্য মন কেমন করে

গত কয়েকদিন ধরে অসাম্প্রদায়িকতা ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি নিয়ে কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের কথায় হঠাৎ কেন জানি ‘পাগলা সাঁকো নাড়াসনে’ কথাটি মনে পড়ছে। আমাদের অন্যতম প্রধান গৌরবের ধন হচ্ছে আমাদের দেশের অসাম্প্রদায়িক চারিত্র্য, আমাদের ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃভাবাপন্নতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য মায়া-মমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। আমি যখন উনিশ শ পঞ্চাশের দশকে স্কুলের ছাত্র ছিলাম, তখনই বগুড়া জিলা স্কুলের সারদাবাবু, অখিলবাবু, মণীন্দ্রবাবু ও নোয়াখালী জিলা স্কুলের ক্ষিতীশবাবু, যশোদাবাবুদের কাছ থেকে, সর্বোপরি আমার অতিশয় ধর্মপরায়ণ আব্বা-আম্মার কাছ থেকে শিখেছিলাম : মানুষের আদি ও অকৃত্রিম পরিচয় সে মানুষ। বগুড়া জিলা স্কুলের সারদা স্যারের কথা আজ বিশেষভাবে মনে পড়ে। তিনি বা তাঁর সহকর্মী তাজমিলুর রহমান সাহেব যে আচার-আচরণে, কথায়বার্তায় শুধু অসাম্প্রদায়িক ছিলেন তা নয়, তাঁরা অপত্যস্নেহে আমাদের ভেতর আমাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা জাগিয়ে তুলেছিলেন। আজ সারদাবাবুর স্মৃতিতর্পণ করার উদ্দেশে এই লেখা।

২.

প্রায় সত্তর বছর আগে দেখা ছবিটি আজো আমার মানসপটে জ্বলজ্বল করে : ধবধবে সাদা ধুতি, সাদা হাফ শার্ট পরিহিত ব্যাক ব্রাশ করা চুল, প্রশস্ত ললাটের গৌরকান্তি আমাদের স্যার সারদা কিঙ্কর মজুমদার মহাশয় জিলা স্কুল মাঠের পূর্ব দিক থেকে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছেন। তখনো কালীপদদা বা ভবানীদা স্কুল বসার শেষ ঘণ্টা বাজাননি। স্যার মাঠ পাড়ি দিয়ে এসে হেডমাস্টার স্যারের কামরার লাগোয়া সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে এলেন, যাবেন পাশের টিচার্স কমনরুমে। স্যারকে দূর থেকে দেখলেই আমাদের দুষ্টুমি-দস্যিপনা কোথায় পালিয়ে যেত। কোনোদিন কোনো ছাত্রের গায়ে হাত তোলেননি অথচ ওই সাধারণ বাঙালির চেয়ে অবয়বে ঈষৎ দীর্ঘদেহী অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটিকে দূর থেকে দেখলেই আমরা এক ধরনের ভীতিমিশ্রিত শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে একেবারে সুবোধ বালকটি হয়ে যেতাম। আবার স্যার যখন টমসন হলের অপরিসর মঞ্চে তাঁর কোনো ছাত্রের গাওয়া গানের সঙ্গে নিমীলিত নেত্রে তবলাসঙ্গত করতেন, তখন মনে হতো জগৎ-সংসার তাঁর চেতনা থেকে লোপ পেয়ে গেছে, ওই মুহূর্তে তাঁর একমাত্র ধ্যানধারণাই ছিল যেন ছাত্রটির গাওয়া গানটির সুমধুর পরিবেশনা।

সেই আমলে (১৯৫০-৫৪) বগুড়া জিলা স্কুলের শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণ ছিলেন আমাদের দুই প্রিয় শিক্ষক : বাবু সারদা কিঙ্কর মজুমদার ও জনাব তাজমিলুর রহমান। সুসাহিত্যিক তাজমিলুর রহমান স্যার পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন একই স্কুলের হেডমাস্টারও ছিলেন। সারদা স্যার সম্বন্ধে জনশ্রুতি ছিল তিনি নাকি যৌবনের শুরুতে কোলকাতা না মুম্বাই কোথায় দু-একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। এর সত্যমিথ্যা যাচাই করার জন্য কোনোদিন এ ব্যাপারে স্যারকে জিজ্ঞেস করার দুঃসাহস হয়নি আমাদের। সেই আমলে এধরনের দুঃসাহস দেখানো ফিচলেমোর পর্যায়ে পড়ত। তবে স্যারদের অনেকেই অবশ্য ক্লাসে লঘু হাস্য-পরিহাসের দ্বারা পঠনীয় বিষয়কে হূদয়গ্রাহী করে তুলতেন।

তখন বগুড়া জিলা স্কুলে ক্লাস ফাইভ টু টেন এই কয়টি ক্লাস ছিল। আমি ওই স্কুলে পড়েছি ক্লাস ফাইভের শেষার্ধ থেকে নাইনের শেষার্ধ পর্যন্ত চার বছর (আগস্ট ’৫০ থেকে সেপ্টেম্বর ’৫৪)। আমার সরকারি চাকরিজীবী পিতার বদলিজনিত কারণে ক্লাস ওয়ান থেকে ম্যাট্রিক (এস এস সি) পর্যন্ত পড়তে পড়তে আমাকে চারটি স্কুলে নাম লেখাতে হয়। বগুড়া থেকে চলে যাই নোয়াখালী। যেন উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু। শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু বলছি না, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, সংস্কৃতি ও পরিবেশগত কারণেও দুই শহরের মধ্যে বেজায় ফারাক ছিল। নোয়াখালী সদরের মাইজদীকোর্ট শহরের যেখানে আমাদের বাসা ছিল সেই স্বল্প জনসংখ্যা অধ্যুষিত শহরে বাসার আশেপাশে কোনো সমবয়সী বন্ধুবান্ধব ছিল না আমার। বসতবাড়ি ছিল হাতেগোনা কয়েকটি। আর বগুড়া শহরের সুত্রাপুরের ঈদগাহ লেন ছিল ঠিক তার উল্টো। সেখানে কত বন্ধুবান্ধব, খেলার সাথী, হৈ-চৈ, মান-অভিমান, বাদ-বিসংবাদ। আসলে আমার শারীরিক মানসিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে বগুড়ায়। আমি এখন যতটুকু ভালো বা যতটুকু মন্দ তার প্রায় সবটুকুর গোড়াপত্তন হয়েছে বগুড়া শহরের ঈদগাহ লেনে এবং তার চেয়েও বেশি বগুড়া জিলা স্কুলে। আমার শৈশব-কৈশোরের মধুরতম সময় কেটেছে বগুড়ায়। আর বগুড়াও তখন শিক্ষাদীক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চায় সারা দেশের মধ্যে ছিল খুবই প্রাগ্রসর। আমার পরম সৌভাগ্য, অমন একটি শহরে, অমন একটি স্কুলে কেটেছে আমার শৈশব ও কৈশোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। শৈশবের কচি মনের প্রায় সবটুকুই দখল করে নিয়েছিল বগুড়া শহর। সেই ‘দখলিস্বত্ব’ আজ সত্তর বছর পরও ছেড়ে যায়নি ওই প্রিয় শহর। হয়তো যাবেও না কোনোদিন। আর যেতে চাইলেই তাকে যেতে দেবে কে!

তখন প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ফোর্থ পিরিয়ডে শুরু হতো বাংলা বিতর্ক অথবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যার ইংরেজি নাম ছিল ‘সোশাল’। এর ভেন্যু ছিল স্কুলের প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকেই হাতের ডানে যে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একতলা দালান সেটি। এটিই বহুল পরিচিত টমসন হল। জানি না এখনো হলটি আছে কিনা। হলের দক্ষিণাংশে স্থাপিত ছিল এক ফুটের মতো উঁচু নাতিবৃহৎ একটি স্টেজ, যার পাশেই স্ট্যান্ডের ওপর রাখা ব্ল্যাক বোর্ডে প্রতি সপ্তাহে রঙিন চক দিয়ে অনুষ্ঠানসূচী লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম আমরা দুই অতি উৎসাহী বন্ধু—আমি ও আমার সহপাঠী ফজলুল আলম। যেদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অর্থাৎ গানবাজনা, কবিতা আবৃত্তি, হাস্য-কৌতুক ইত্যাদি হতো, সেদিন সামগ্রিক নির্দেশনায় থাকতেন সারদা স্যার। তাঁকে প্রয়োজনবোধে সহায়তা করতেন তাজমিলুর রহমান স্যার ও ছোট ‘কেবলা’ (মৌলভী) মেহেদী স্যার। স্যারদের উপস্থিতি বোধ হয় বাধ্যতামূলক ছিল না, তাই অন্য স্যাররা খুব একটা থাকতেন না। তবে হেড স্যার ও সহকারী হেড স্যার সব অনুষ্ঠানেই থাকতেন।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন অনুষ্ঠান পরিচালক ও গান-আবৃত্তি ইত্যাদির প্রশিক্ষক সারদা স্যার। আর অনুষ্ঠানের দিন তাঁর প্রধান দায়িত্ব ছিল আগাগোড়া অনুষ্ঠানে তবলাসঙ্গত করা। সঙ্গীতচর্চা-আবৃত্তি-অভিনয় এগুলো বোধ হয় স্যারের রক্তের সঙ্গে মিশে ছিল। সে কারণে আমি ও সহপাঠী ফজলুল আলম, আমার বড় ভাই তফজ্জুল করিম খসরু, হেনা ভাই ও আরো সিনিয়র এনামুল হক বুলুভাই (বিটিভির ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ খ্যাত), আরো সিনিয়র সাইফুল ইসলাম ভাই (পরবর্তীকালে প্রখ্যাত প্রকৌশলী ও গায়ক) প্রমুখ স্যারের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলাম। তা একদিন গান-আবৃত্তি ইত্যাদির রিহার্সেলের সময় স্যার আমাদের একটি গানের কয়েক কলি গেয়ে শোনালেন। তাঁর সেই ভরাট গলার গান শুনে আমি রীতিমতো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। আজ প্রায় সত্তর বছর পরও গানটির প্রথম দুটি চরণ আমার শ্রবণেন্দ্রিয়ে মধুবর্ষণ করে : প-লা-শী, হায় পলা-শী/ এঁকে দিলি তুই জননীর মুখে কলঙ্ককালিমা রাশি। আজো যেন চোখ বুজলে দেখতে পাই স্কুলের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের সেই তেতলা ভবনের নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ছোট্ট রুমটিতে স্যার নিমীলিত নয়নে গাইছেন গানটি, আর আমরা আমাদের পরম পূজনীয় গুরুর কণ্ঠনিঃসৃত সেই সঙ্গীতসুধা মুগ্ধ বিস্ময়ে পান করছি।

ওই ধরনের এক রিহার্সেলের সময়ের আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। বায়ান্ন কি তিপ্পান্ন সালের কথা। সেই আমলে ম্যাট্রিক ক্লাসের জন্য বাংলা গদ্য ও পদ্যের দুটি পৃথক সঙ্কলন পুস্তক ছিল। বই দুটিতে গ্রন্থিত ছিল বাংলা সাহিত্যের সব নামকরা কবি-সাহিত্যিকের লেখা গল্প প্রবন্ধ ও কবিতা। এগুলোর মধ্যে গুটিকতক নির্বাচিত লেখা ম্যাট্রিকের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত থাকত। বাকিগুলো ছিল ফাউ। তো আমি আমার বড় ভাইয়ের সেই বই দুটির আগ্রহী পাঠক ছিলাম। কবিতার বইয়ে কাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটি কবিতার সঙ্গে কবির ‘নওজোয়ান’ শীর্ষক একটা কবিতা ছিল, যার প্রথম ক’টি চরণ ছিল এরকম : মরেছে যাহারা তাহারা নয়/আসিছে যাহারা বাঁচিয়া রয়/তাদের বুদ্ধি বদ্ধ নয়/নওজোয়ান।... কবিতাটির কথা ও ছন্দ আমার খুব ভাল লাগল। একদিন রিহার্সেলের সময় স্যার যখন বললেন, তুমি কোন কবিতা শোনাবে? আমি তখন ওই নওজোয়ান কবিতাটিই মুখস্থ শোনাতে লাগলাম। তবে আবৃত্তি করে নয়, রীতিমতো সুর করে গানের ঢঙে। সঙ্গে সঙ্গে স্যারের ঠোঁটের ওপর হাল্কা করে ছাঁটা গোঁফ জোড়ার নিচে হাসির ঝিলিক খেলে গেল, সেই সঙ্গে স্যারও সুর করে বললেন, ‘হলো-না, হলো না-’। তারপর কবিতাটি কী করে আবৃত্তি করতে হবে দেখিয়ে দিলেন।...তাঁর সেই ‘হলো-না, হলো না-’ আজো কানে বাজে।

বায়ান্ন সালে আমাদের স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বেশ ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ভেন্যু ছিল এডোয়ার্ড ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চ, টমসন হল নয়। ছাত্রদের মা-বাবা ছাড়াও শহরের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিও আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন অনুষ্ঠানে। আমার আম্মাও ছিলেন আমন্ত্রিতদের মধ্যে। অফিস কামাই দিয়ে আব্বা আসেননি। সেই এডোয়ার্ড ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চ বা রিভলভিং স্টেজটি এখন নিশ্চয়ই আর নেই। ওটা ছিল বিখ্যাত এডোয়ার্ড পার্কের ভেতর ‘মেরিনা’ নামক সিনেমা হলে। তা ওই অনুষ্ঠানে গান-বাজনা তো ছিলই, তবে প্রধান আকর্ষণ ছিল কয়েকটি, হ্যাঁ কয়েকটি, একাঙ্কিকা বা ছোট ছোট এক অঙ্কের নাটক। একটি ইংরেজি নাটিকাও ছিল, যাতে অভিনয় করে তাঁর সুন্দর সাহেবি উচ্চারণ ও সাবলীল অভিনয়ের জন্য প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন ক্লাস নাইনের ছাত্র, আমার অগ্রজ, দারুণ সুদর্শন, তফজ্জুল করিম খসরু। আর আমি? আমি আমার জীবনের প্রথম নাট্যাভিনয়ের কথাটি না বললে সারদা স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তো অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

ওই অনুষ্ঠানে পরশুরামের মজার গল্প চিকিৎসা-সঙ্কটকে কাটছাঁট করে একাঙ্কিকা হিসেবে এবং আরেকটি ছোটদের নাটিকা ‘কিপ্টে ঠাকুর্দা’ প্রযোজনা করেছিলেন সারদা স্যার। দুটিতেই আমি অভিনয় করেছিলাম। তবে হ্যাঁ, তা অত সহজে নয়। শুনুন তা হলে সেই গল্প।

পরশুরামের গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দ-র ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বড় ভাইয়ের সহপাঠী আব্দুর রহমান বাবলু ভাই ও তাঁর বন্ধুদের চরিত্রগুলোর একটিতে ছিলাম আমি। আমার চরিত্রের নাম ছিল গুপী। নাটিকাটির প্রথম দৃশ্যে দেখা যাবে বিরসবদনে তাঁর বৈঠকখানায় বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন নন্দ। প্রথম ডায়লগই ছিল আমার, অর্থাৎ গুপীর। ডায়লগটি ছিল : ‘উঁহু। শরীরের ওপর অত অযত্ন করো না, নন্দ। এই শীতকালে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়।’ প্রথম দিনের রিহার্সেল শুরু হতেই আমি ওই ডায়লগটি আওড়ালাম ক্রিকেটের ওপেনিং ব্যাটসম্যানের মতো। অমনি প্রথম বলেই আম্পায়ার সারদা স্যার যেন তর্জনি উঁচিয়ে আমাকে আউট ঘোষণা করলেন। কী ব্যাপার? না, আমার ‘শরীর’ (শোরীর), ‘ওপর’ (ওপোর), ‘অত’ (অতো), ‘অযত্ন’ (অজতেনা)—এই শব্দগুলোর উচ্চারণ একেবারে ছ্যাড়াবেড়া হয়েছে। অতএব, আম্পায়ার মহোদয় প্রথম বলেই আমাকে এল বি ডব্লিউ আউট দিয়ে দিলেন। তারপর শুরু হলো ‘কোচ’ গুরুর কাছে আমার উচ্চারণ মেরামত করার পালা। আমি সিলেট অঞ্চলের (কুলাউড়া, মৌলভীবাজার) এক অর্বাচীন বালক। বাংলা শব্দের উচ্চারণে যে ‘ফাইন টিউনিং’ আছে তা তো আমার জানার কথা না। যা হোক দু-তিন দিনের প্র্যাকটিসের পর টিকে গেলাম। ওই রোলটা এবং ‘কিপ্টে ঠাকুর্দা’ নাটিকার মুখ্য চরিত্র ঠাকুর্দা আমিই করলাম। স্যারের কাছ থেকে উচ্চারণ ও অভিনয়ের খুঁটিনাটি সম্বন্ধে যা শিখেছিলাম, তা পরবর্তী জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক করার সময় দারুণ কাজে লেগেছিল। সারা জীবন স্যারের ওই পাঠদান পুঁজি করেই চলছি।

১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২১ না ২২ তারিখ জানি হঠাৎই আমরা বগুড়া ছাড়লাম। পেছনে পড়ে রইল কত মধুস্মৃতি ভরা আমার প্রিয় শহর, প্রিয় স্কুল। ’৫৪ থেকে ’৮৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩২ বছর স্যারের কোনো খোঁজ-খবরই বলতে গেলে পাইনি, যেমন পাইনি আরো অনেক স্যারের সংবাদ।

 ’৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার আমাকে ঢাকা থেকে বদলি করে বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে রাজশাহী পাঠাল। ওখানে যাওয়ার আগে ঢাকাতেই এক বন্ধুর কাছ থেকে জানলাম আমার স্কুল জীবনের দুই স্যার সারদাবাবু ও আনিসুর রহমান সাহেব চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর রাজশাহী শহরেই বসবাস করেন। শুনে ভীষণ পুলকিত বোধ করলাম। মনে মনে ঠিক করলাম, নতুন কর্মস্থলে পৌঁছেই আমার দু্ই পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে খুঁজে বের করে তাঁদের পদধূলি নেবো। কিন্তু আমি যে অভাগা তার প্রমাণ আবারও পেলাম রাজশাহীতে ২৭ সেপ্টেম্বর ’৮৬ তারিখে পৌঁছে : খবর নিয়ে জানা গেল, মাত্র দু-তিন দিন আগে বাবু সারদা কিঙ্কর মজুমদার, আমার এত প্রিয় স্যার, প্রায় তিন যুগ পর যাঁকে দেখতে পাব বলে দেহমন আনন্দে ছটফট করছিল, ঢাকা চলে গেছেন। কবে ফিরবেন, আদৌ ফিরবেন কিনা রাজশাহীতে, কেউ বলতে পারল না। এক বছর পর স্যারের দর্শনসুখ লাভ না করেই আমি আবার বদলি হয়ে ঢাকা ফিরে গেলাম। অভাগার অদৃষ্টে বোধ হয় স্যারের শ্রীচরণের ধূলিলাভ ছিল না। আনিসুর রহমান স্যারের সন্ধান অবশ্য পেয়েছিলাম এবং যথাশীঘ্র একদিন গিয়েওছিলাম তাঁর বাসায়। স্যার বাসায় ছিলেন না। একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছিলাম। পরে স্যার আমার বাসায় এসেছিলেন একদিন এবং দারুণ খুশি হয়েছিলেন আমাকে দেখে। বলা বাহুল্য আমিও।

সারদা স্যার এবং আমার অন্য স্যাররা আজ আর কেউ বেঁচে নেই। সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে প্রার্থনা করি, পরলোকে তাঁদের সকলের আত্মা অনন্ত শান্তিলাভ করুক।

উপসংহারে সারদা স্যারের এক অতিশয় কাঙাল ছাত্রের বিনীত অনুরোধ : স্যার, একবারটি এসে দেখে যাবেন না আপনার অবোধ ছাত্রটি কেমন আছে, কেমন হয়েছে এখন তার বাংলা উচ্চারণ? সে তো এখনো আপনার আশীর্বাদ কামনা করে সমস্ত অন্তরাত্মা দিয়ে। একবারটি এসে দেখা দিয়ে যান না স্যার আপনি, আশীর্বাদ করে যান না একবারটি। আপনার জন্যে, আপনাদের জন্যে, আজো, এই জীবন সায়াহ্নে এসেও যে আমার বড় মন কেমন করে।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা