kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

মার্কিন রাষ্ট্রপতিত্ব

মোস্তফা মামুন

১৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




মার্কিন রাষ্ট্রপতিত্ব

‘বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা দেখতে চায়। নির্বাচনে মার্কিন জনগণের মতামত সঠিকভাবে প্রতিফলিত হোক এবং নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখুক—এটাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা। বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চায় গণতন্ত্র ও সুশাসনের প্রতি বাংলাদেশ সব সময়ই অঙ্গীকারাবদ্ধ।’

কিছু দুর্মুখ মানুষ আছে এরা রসিকতায়ও ভুল ধরতে আসে। তেমনি একজন গম্ভীর মুখে বলল, ‘তোমার এই কথার মধ্যে বড় ত্রুটি আছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুযোগ থাকলেও এ রকম বিবৃতি দিতে পারত না।’

‘কেন পারত না?’

‘সে রকম নৈতিক অবস্থানই নেই। যে দেশে গণতন্ত্র নেই, নির্বাচনব্যবস্থা হাস্যকর, তারা তো আর অন্য দেশ নিয়ে কথা বলতে পারে না। তা ছাড়া...’

দীর্ঘ বক্তব্যের প্রস্তুতি ছিল। ঠেকালাম। এই বিষয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেওয়া খুবই সম্ভব। আর বন্ধুটি উগ্র ও সরকারবিরোধী বলে ওর যুক্তির অভাব নেই।

যা হোক, এ রকম রসিকতা, যুক্তি-তর্ক মিলিয়ে মোটামুটি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনটা আমরা প্রায় পারই করে দিয়েছিলাম, যখন-তখন সেরা রসিকতা নিয়ে হাজির হলেন একজন। সিনেমার পতনের সঙ্গে সঙ্গে পর্দার তুখোড় কমেডিয়ানরা হারিয়ে গেছেন, সেই ঘাটতি অন্য দায়িত্বশীল পদের লোকরা পূরণ করে দিচ্ছেন। আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার যুক্তরাষ্ট্রকে তাচ্ছিল্য করে বললেন, ‘ওরা ১০-১২ দিনেও ভোট গুনতে পারে না। অথচ আমাদের লাগে পাঁচ মিনিট।’

দুর্মুখ সেই বন্ধুটির মতো মানুষেরা বললেন, ‘পাঁচ মিনিটই বা লাগে কেন? ভোট তো আগে থেকেই গোনা থাকে।’

যা হোক, এই ধরনের মানুষরা আমাদের যে যথেষ্ট হাসিয়ে যাচ্ছেন, এরও একটা মূল্য আছে। বিনোদনদাতা হিসেবে নিশ্চয়ই আমরা তাঁদের মনে রাখব। যেমন—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যথেষ্ট বড় বিনোদনদাতা। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির মতো প্রতিষ্ঠানকে যে খেলো করে ফেলা যায় ট্রাম্পের আবির্ভাব না হলে আমরা জানতেই পারতাম না। সত্যি বললে, ট্রাম্প অনেক শিক্ষার নাম। যেমন—ট্রাম্প মার্কিন সমাজের লুকানো একটি ব্যাধিকে প্রকাশ্য করে তুলেছেন। বর্ণবাদ নেই, উঁচু-নিচু নেই—বহু বছর ধরে সে রকম সাম্যের একটি সমাজের ছবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে মার্কিনরা। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হয়ে সেই ধারণাকে আরো মূর্ত করলেন। কালো মানুষ, অভিবাসী—তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে ফেলে, স্বপ্নের সমাজ তাহলে বাস্তব হয়ে গেল। কিন্তু ওই যে স্বপ্নের পর থাকে স্বপ্নভঙ্গ। কেউ কেউ মনে করেন, ওবামার মাধ্যমে উদারবাদীদের অগ্রযাত্রাই কট্টরপন্থীদের একীভূত করেছে। পরের নির্বাচনে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত ছবি। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বকামী, রক্ষণশীল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট। সত্যি বললে, সামনের ঝকমকে ছবির আড়ালের যে ঘোর অন্ধকার, ট্রাম্প সেটাই দেখালেন। মার্কিন সমাজ তাই খানিকটা হলেও বিব্রত ছিল। এবার ছিল দায়মোচনের। সেটা ওরা গোছাল; কিন্তু আবার এটাও তো ঠিক, যেভাবে আমরা ভেবেছিলাম, তেমন একচেটিয়া মোটেও হয়নি; বরং প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি লড়াই করেছেন ট্রাম্প। ‘ট্রাম্প ইজ নাইদার রিজেক্টেড, নর অ্যাকসেপ্টেড’ এ রকম একটি শিরোনাম করেছে মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক। মনে হচ্ছে এটাই ঠিক। তাঁকে মার্কিনরা বর্জনও করেনি। গ্রহণও করেনি।

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে কথা হচ্ছিল এক মার্কিন অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি দাবি করলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বে আসলে দুই ধরনের শাসন চলে। বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র ও নির্বাচনী রাজতন্ত্র। তোমাদেরটা নির্বাচনী রাজতন্ত্র।’

‘নির্বাচনী রাজতন্ত্র!’

‘তোমরা বা এসব দেশ তো নেতা নির্বাচন করো না, রাজা নির্বাচন করো। রাজার মতোই ক্ষমতা তাদের।’

বিদেশি একজন মানুষের মুখে দেশের বদনাম ঠিক ভালো লাগল না। দমাতে বললাম, ‘কিন্তু তোমাদের দেশ-ই বা কম কী? মার্কিন প্রেসিডেন্টের যে ক্ষমতা সেটা তো প্রায় ঈশ্বরের সমতুল্য।’

তিনি হেসে বললেন, ‘যতটা তোমরা ভাবো, ততটা নয়। তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো যা ইচ্ছা করতে পারেন না। আসলে দেশটার ভেতরে তো ৫০টি দেশ। আলাদা আইন, প্রায় পুরোই স্বাধীন। এই স্টেটগুলোকে এক ছাতার নিচে রাখার জন্য একটি প্রতীক চাই, শক্ত প্রতীক। প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন সেই প্রতীক। এ জন্যই ওর ব্যক্তিত্বকে বড় করে দেখাতে হয়। তাই তাঁকে ঘিরে অত সাজসজ্জা।’

ঠিকই। যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্যের ও স্থায়িত্বের সূত্রধর আসলে দেশের প্রেসিডেন্ট। তাই ভাবমূর্তিটাকে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ করে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় আয়োজন চলে। এভাবেই প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিকে বড় হওয়ার ছাতা দিয়েছে। ব্যক্তিরা তাঁদের দ্যুতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আরো উঁচুতে নিয়ে গেছেন। এই পারস্পরিকতাই রাষ্ট্রপতিকে বড়, আরো বড় বানিয়েছে।

এর মধ্যেও কয়েকজন আলাদা। বেশির ভাগ বিবেচনায়ই যুক্তরাষ্ট্রের সেরা প্রেসিডেন্টের তালিকাটা এ রকম—জর্জ ওয়াশিংটন, উইলিয়াম জেফারসন, আব্রাহাম লিংকন এবং দুই রুজভেল্ট—ফ্রাংকলিন ও থিওডর। আর যদি একজন বেছে নিতে হয় সেখানে বেশির ভাগের রায়ই লিংকনের পক্ষে। ‘অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল...’ তো আছেই, এর বাইরেও তাঁকে ঘিরে অনেক কিংবদন্তি। একবার এক জনসভায় নাটকীয় ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ‘ধরো, কেউ একজন একটা দড়ির ওপর দিয়ে বড় নদী পার হচ্ছে। ওর কাঁধে একটা ঝোলা, সেই ঝোলায় তোমার যাবতীয় সম্পত্তি। তুমি তখন কী চাইবে?’

সবাই এক স্বরে বলল, ‘চাইব, সে ঠিকমতো নদীটা পার হোক।’

লিংকন হাসলেন। ‘অথচ দেখো, আমার ক্ষেত্রে হচ্ছে উল্টা। তোমরা তোমাদের সব ভালো-মন্দের দায়িত্ব দিয়েছ আমার ওপর, অথচ সেই আমি যেন ব্যর্থ হই, সে জন্য কত মানুষের লাফালাফি। তাহলে হবে কিভাবে?’

অনুপ্রাণিত করার মতো হাজারও কথা আছে তাঁর। খুব সামান্য; কিন্তু অসামান্য অর্থবহ এটা, ‘আমি অন্যদের মতো অত দ্রুত চলতে পারি না। আমি খুব ধীরে হাঁটি; কিন্তু সুবিধা হলো, আমি কখনো পেছনের দিকে হাঁটি না।’

নিক্সনের পর আরেক কিংবদন্তি রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট, যিনি ত্রিশের দশকের মহামন্দার পর ‘নিউ ডিল’ দিয়ে নতুনভাবে তৈরি করেছিলেন দেশ এবং দেশের অর্থনীতিকে। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি, যিনি দুইবারের বেশি (টানা চারবার) নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবার এমন রাষ্ট্রপতিও আছেন, যিনি এমনকি কখনো ভাইস প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হননি। জেরাল্ড ফোর্ডকে নিক্সন তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করেছিলেন আগের ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায়। ফোর্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন, এবার স্বয়ং নিক্সন অভিযুক্ত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে। তিনি গেলেন। ফোর্ড প্রেসিডেন্ট; কিন্তু কিছুদিন পরের নির্বাচনে তিনি জিমি কার্টারের কাছে পরাজিত। নিক্সনের কাহিনিও দারুণ। আইজেনহাওয়ারের সঙ্গে তিনি ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট (১৯৫২-১৯৬০), পরেরবার জন এফ কেনেডির সঙ্গে নির্বাচন করে হেরে যান তিনি। কিছুদিন পর ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনেও হারলেন। ধরা হয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ। অতল থেকে ফিরে এসে আট বছর পর প্রেসিডেন্ট। নিক্সনের পর জিমি কার্টার; কিন্তু চার বছরের প্রেসিডেন্সির সমাপ্তি ঘটল এমন লজ্জাজনকভাবে যে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হারের রেকর্ড তাঁর। জিতেছিলেন রোনাল্ড রিগ্যান। হলিউড অভিনেতা রিগ্যান শুধু পর্দায় নয়, কথাবার্তায়ও ছিলেন দারুণ চৌকস। অর্থনীতির মন্দা নিয়ে কথা হচ্ছিল, রিগ্যান বললেন, ‘যখন তোমার পাশের বাসার লোক চাকরি হারাবে, তখন বুঝবে মন্দা শুরু হয়েছে। যখন নিজে চাকরি হারাবে, তখন বুঝবে মহামন্দা হচ্ছে।’ আর কখন বুঝব মন্দা কাটতে শুরু করছে? রিগ্যানের উত্তর, ‘যখন দেখবে নির্বাচনে জিমি কার্টার হেরে গেছে।’

এরপর ওবামা-ক্লিনটনদের কারিশমা, বুশ বাবা-ছেলের প্রতাপ, ট্রাম্পের উগ্রতা পেরিয়ে এবার বাইডেন। খুব কারিশমা নেই। তুখোড় বক্তাও নন; একবার তো তাঁর বিরুদ্ধে বক্তৃৃতায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছিল। তবু কিন্তু নিজের জায়গায় অনন্য তিনি। ৫০ বছর ধরে লেগে থেকেছেন। ১৯৮৮ নির্বাচনে প্রথম যেবার মনোনয়ন চেয়েছিলেন, সেবার প্রেসিডেন্ট হন সিনিয়র বুশ। বুশ জিতলেন, তারপর এমনকি তাঁর ছেলে পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। তারও ১২ বছর পর এসে...। রবার্ট ব্রুসের ধৈর্য কিংবদন্তি। বাইডেনও কি খুব কম! তিনি দৌড়ের আত্মম্ভরী খরগোশ নন, স্থিরপ্রতিজ্ঞ কচ্ছপ। ব্যক্তিজীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড় সামলে, ধীর পায়ে হেঁটে, লক্ষ্যে স্থির থেকে, লিফট এড়িয়ে সিঁড়িতে চলে আজ তিনি গন্তব্যে।

শিক্ষা তাই আছে বাইডেনেও। ধৈর্য, লেগে থাকা—এসবের মূল্য পৃথিবীতে এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

কিন্তু আমাদের তো এসব শিক্ষা নিতে বয়েই গেছে। আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরং ওদের শিক্ষা দিতে যাচ্ছেন, কিভাবে চার-পাঁচ মিনিটেই ভোটের কারবার শেষ করে ফেলা যায়!

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা