kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে বদলে যাওয়ার প্রবণতা

গোলাম কবির

১৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে বদলে যাওয়ার প্রবণতা

ইতিহাসে দেখা যায়, যুগে যুগে মারি আর দুর্যোগ সমৃদ্ধ জনপদ ধ্বংস করেছে। কোথাও কোথাও শ্যামল প্রান্তর আর কোলাহলমুখর জনবসতি বিরান হয়ে গেছে। এসব নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে। আর ধর্মগ্রন্থগুলো বিষয়টির কম গুরুত্ব দেয়নি। বলা হয়েছে, মানুষের কৃত অনাচার দুর্যোগ ডেকে এনেছে। বিজ্ঞানও তাই বলে। আমরা প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে মানবসৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছি। ফারসি সাহিত্যের শাহনামা তো যুদ্ধবিগ্রহের অপর নাম। গ্রিক সাহিত্য ধ্বংসযজ্ঞ দিয়েই শুরু। আরবি সাহিত্যে বিরান জনপদ নিয়ে কাঁদতে দেখা গেছে কবি ইমরুল কায়েসকে : ‘কিফা নাবকি মিন জিকরা হাবিবিওঁ ওয়া মানজিলি’ বলে। কালান্তরে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। আমরাও ফিরে যাব অচিরে, করোনার প্রকোপ থেকে। সে বিশ্বাস সামনে রেখে আমাদের কৃতকর্মগুলো একনজর ফিরে দেখতে চাই।

ইতিহাস বলছে, ক্ষমতাদর্পী মানুষ সেখান থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। এ প্রসঙ্গে কতিপয়ের দুষ্কর্মকে সচল রাখার অভিপ্রায়ে কিছু প্রবাদ চালু রাখা হয়েছে প্রায় সব ভাষায়। সংস্কৃতে বলা হয়েছে, ‘অঙ্গরং শত ধৌতং...’, যাকে বাংলায় বলা হয়, কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। আরবিতে বলা হয়েছে, ‘আলখাসলাতু লা ইয়ারুদ্দু ইল্লাল কাজা’ আর ইংরেজির প্রবাদ ‘ব্ল্যাক উইল টেক নো আদার হিউ’ আমরা এসবকে আপ্তবাক্য ভেবে নিষ্ক্রিয় থাকি।

বলা হয়ে থাকে, মানুষ সহজাত সুস্বভাব নিয়ে জন্মে। কুল্লু মওলুদুন ইউলাদু আলাল ফিওরাতি, যাকে রুশো বলেছেন, ‘ম্যান ইজ বর্ন ফ্রি বাট এভরিহয়্যার হি ইজ ইন চেইনস’। সারকথা মানুষ পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে বদলে যায়। এই যে বদলে যাওয়ার প্রবণতা, তা অলৌকিক নয়। সমাজের নানা স্তরের অভিভাবক, বিশেষ করে শিক্ষকসমাজ ‘আপনি আচরিধর্ম অপরে শেখা’লে সমাজের অধঃপাত হয়তো ঠেকানো যেত। দুঃখের বিষয়, আমাদের শুরুতেই গলদ। আমরা যে যেখানে আছি, সবাই চাই বর্তমান আর ভবিষ্যতের সব প্রয়োজন একজনকে পূরণ করতে। সুনীতি বা ন্যায়বোধ আমাদের তাড়িত করে না। কর্তৃত্ববাদিতা আমাদের প্রলুব্ধ করে। এটা মনুষ্যত্ব বা সুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক নয়। আমি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মানুষ। সমাজের চারপাশে চোখ-কান খাড়া রাখলেও সব কিছু নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার আমার সীমিত। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসংশ্লিষ্টতার কারণে অনুভব করছি, আমরা কোন তিমিরে নিমজ্জমান, তার আংশিক খতিয়ান বোধ করি দেওয়া যায়।

এ সত্য মানতেই হবে, বিশ্বজোড়া রাষ্ট্র পরিচালনার চাবিকাঠি—ব্যতিক্রম ছাড়া—মুনাফাসেবীদের হাতে। মানবকল্যাণ নয়, ব্যক্তিস্বার্থ ও মুনাফাই তাদের লক্ষ্য। তা-ই যদি হয়, তবে শিক্ষা বাদ যাবে কেন? মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ধারা আমরা অধোগতির তলানিতে। এর মূলে রাজনীতির স্বার্থবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, মতবাদের ফাঁকফোকর, তার সঙ্গে যুক্ত আমরা শিক্ষকসমাজ। নিজের অযোগ্যতা অবহিত হয়েও জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছি। নানা কৌশলে সুলভ কর্মসংস্থান হাতিয়ে নিয়ে পেশার সঙ্গে অবিচার করছি। অথচ শিক্ষকতা সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রত।

শিক্ষক অভিধাটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের নিয়ে যায় জ্ঞানভারে বিনত, স্বার্থবাদী বৈষয়িকতার ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী এক ব্রতী মানুষের কাছে। দুঃখের বিষয়, এর কানাকড়িও কি আমাদের মাঝে অবশিষ্ট! প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র কিছু শিক্ষক নামের ব্যক্তির প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা। তাঁদের বাইরে দলীয় লেফাফা মুখে বঙ্গবন্ধুর গুণকীর্তন আর অন্তরে ওপরে ওঠার তীব্র অভীপ্সা। এসব লোভাতুর মানুষের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে ন্যায়বোধ ছায়ার মতো মিলিয়ে যায়। তরুণরা এদের অনুকারী হয়; কারণ সবার জানা, ব্যাধি সংক্রামক। তারা শিক্ষক নেতাদের অপকর্ম দেখে দ্বিগুণ উৎসর্গ দুষ্কৃতির উৎসবে গা ভাসায়। এটি ষোলো আনা সহজাত নয়। (বিষয়টি সামাজিক নেতৃত্বের জন্য প্রযোজ্য) এই ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম পন্থা হলো যথার্থ শিক্ষকতাব্রতীকে যথাস্থানে নিয়োগ।

সংসার থেকে অনাচার বিলুপ্ত হবে, তা দুরাশা। তার রকমফের থাকবে তো! করোনা যাবে; কিন্তু রেশ রেখে যাবে। লোক-দেখানো নয়, সত্যিকার শিক্ষকতাব্রতী নিয়োজিত হলে শুদ্ধ সমাজ গড়ে উঠবে এবং করোনার সঙ্গে আমাদের ভ্রষ্টাচার প্রশমিত হবে বলে বিশ্বাস রাখতে বেশি কল্পনার প্রয়োজন হয় না।

ইতিহাসে অনেক শিক্ষকতাব্রতীর নাম লেখা আছে, যাঁদের ত্যাগ ও খ্যাতি মহাকালের স্রোতে বিলীন হয়নি। আমাদের বহু শিক্ষক সেই অভিধা থেকে যোজন দূরে থাকবে। তার কারণ তাঁদের কেউ যেন শিক্ষাব্রতে অমনোযোগী হয়ে পদ-পদবির লোভে পদলেহন আর অনাচারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। ভাবছিলাম, সরকার করোনা বিতাড়ন আর শিক্ষা খাতে অকাতরে ব্যয় করছে; কিন্তু আমাদের শিক্ষকতাব্রতবিরোধী আচরণের জন্য অনাগত দিনগুলো কি করুণার অযোগ্য হয়ে থাকবে শান্তিসন্ধানী মানুষের জন্য!

 লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা