kalerkantho

বুধবার । ১৩ মাঘ ১৪২৭। ২৭ জানুয়ারি ২০২১। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সব সুবিধা ওষুধওয়ালাদের দিলে হবে না

আওয়েন জোনস

১৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সব সুবিধা ওষুধওয়ালাদের দিলে হবে না

একটি সফল ভ্যাকসিন, যা আমাদের প্রলম্বিত অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে রক্ষা করবে, তাকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত। একই সঙ্গে আমাদের উচিত ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির জন্য এর ক্রয়ের বিষয়টি বাদ রাখা। যদি ‘ধনীদের সমাজতন্ত্র’ (সোশ্যালিজম ফর দ্য রিচ) দেখতে চাও অথবা ব্যাপক মুনাফার জন্য পাবলিক সেক্টরের গবেষণা বা নবায়নের ওপর নির্ভরশীল প্রাইভেট বিজনেসের কথা বলো, তাহলে বড় ফার্মাগুলোর বাইরে তাকিয়ো না।

ফাইজার এবং এর জার্মান বায়োটেক পার্টনার বায়োনটেক করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন বাবদ আগামী বছর ৯.৪ বিলিয়ন পাউন্ড উপার্জন করতে চায়। লোকজন বলাবলি করছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর সমস্যার নামে ওষুধ কম্পানিগুলোর মুনাফা করা ঠিক হবে না। জুলাইয়ে এ-বিষয়ক সব পরামর্শ ‘র‌্যাডিক্যাল’ বলে খারিজ করে দিয়েছেন ফাইজারের সিইও। এ ছাড়া হয়তো অনেকেই পরিস্থিতিগত কারণে এ ধরনের মুনাফাবৃত্তিকে এখন দেখেও দেখবেন না। ফাইজার বলেছে, ‘কখনো মার্কিন সরকারের কাছ থেকে বা অন্য কারো কাছ থেকে টাকা নেয়নি তারা।’ তাদের এ দাবি ধোপে টেকেনি। কারণ বিগ ফার্মা সব সময় পাবলিক সেক্টরের বদান্যতার ওপর নির্ভরশীল।

ফাইজার-বায়োনটেকের পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন নিজেই একটি স্পাইক প্রোটিন টেকনোলজি ব্যবহার করে। এই টেকনোলজির বিকাশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। রাষ্ট্রের ভূমিকা ছাড়া এই ভ্যাকসিন সম্ভবত এত তাড়াতাড়ি তৈরি করা সম্ভব হতো না। চলমান মহামারির কারণে দুনিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লোকের মৃত্যু হচ্ছে আর এ সময়ে ফাইজারের সিইও ভ্যাকসিনের নিউজকে পুঁজি করছেন, ৫.৬ মিলিয়ন শেয়ার বিক্রি করছেন। এই খবরে অসন্তোষের চেয়েও বেশি কিছু সৃষ্টি হওয়ার কথা। (একজন মুখপাত্র অ্যাক্সিওসকে (নিউজ মিডিয়া) বলেছেন, ‘শেয়ারের এই বিক্রিটা গত আগস্টে পূর্বনির্ধারিত ছিল’)।

মূলত বড় ওষুধ কম্পানিগুলো বৈশ্বিক একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান। তাদের অধিকার দেওয়া হয়েছে তাদের উৎপাদিত নতুন ওষুধের জন্য বাজার যদ্দুর সইতে পারে তদ্দুর মূল্য নির্ধারণ করার। এ কথা বলেছেন ‘গ্লোবাল জাস্টিস নাউ’-এর নিক ডিয়ারডেন। তাঁরা ফাইজারের ভ্যাকসিনের পেটেন্ট বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। এই পেটেন্ট ফাইজারকে একান্ত অধিকার দিয়েছে ২০ বছরের জন্য ভ্যাকসিন তৈরি ও বিক্রির এবং সস্তা ও জেনেরিক ভার্সন তৈরি প্রতিহত করার। এই একটা সেক্টর, যারা রোগ উপশমের কথা ভাবে না, শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফার কথা ভাবে।

এই ওষুধশিল্পের বিষয়ে দুটি উদাহরণ দেওয়া যাক। যখন লাখ লাখ আফ্রিকান এইচআইভি/এইডস মহামারিতে মরছিল তখন বড় ওষুধ কম্পানিগুলো অর্থ সংকটে পতিত সরকারগুলোকে রুখে দিল, যাতে তারা জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সাশ্রয়ী সংস্করণ আমদানি করতে না পারে। অন্য উদাহরণটি হলো, যেসব ইনফেকশনে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না সেগুলোর ঊর্ধ্বগতি দেখা দিল, জরুরি হয়ে পড়ল; এই পরিবর্তনকে ক্লাইমেট ক্রাইসিসের সঙ্গে তুল্য করে দেখা যায়। এ পরিস্থিতিতে ওষুধ কম্পানিগুলো ব্যর্থ হলো নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের জন্য বিনিয়োগ করতে। খুবই দুঃখজনক! প্রায় চার বছরের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের নতুন গ্রুপ পাওয়া গেল না। কারণ এই বিনিয়োগ ওষুধ কম্পানিগুলোর জন্য লাভজনক ছিল না। বিভিন্ন (আফ্রিকান) সরকারের বিপুল ব্যর্থতার কারণে সাবেক ‘সুপারবাগ জার’ জিম ও’নিলকে দিয়ে বলাতে হলো, জাতীয়কৃত ওষুধ কম্পানিগুলো এ ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান হতে পারে।

কভিডের প্রতি আমাদের সহযোগিতা, সংহতি ও ন্যায়ের সঙ্গে সাড়া দেওয়া দরকার। এ কথা বলেছেন ‘জাস্ট ট্রিটমেন্ট’-এর জিয়ারমেইড ম্যাকডোনাল্ড। তাঁদের প্রতিষ্ঠানটি সরকার ও বড় ওষুধ কম্পানির মধ্যে যেকোনো ভ্যাকসিন বিষয়ে গোপন চুক্তির বিরুদ্ধে প্রচারাভিযানে লিপ্ত। জিয়ারমেইড বললেন, বিগ ফার্মার মডেল আসলে ক্লোজড বিজনেস মডেল; তাঁদের ফোকাস হলো, প্রতিযোগিতামূলক প্রয়াস, তবে তা সংগোপনে সম্পন্ন। এর উদ্দেশ্য, সবার কাছে যেন সবচেয়ে ভালো ওষুধ বা ভ্যাকসিন দেওয়া না হয়। তাদের উদ্দেশ্য কম্পানির হাতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মুনাফা পৌঁছানো।

২০০০ সালের গোড়ার দিকে সার্সঘটিত মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে (এটাও করোনাভাইরাস) বিভিন্ন সরকার অঙ্গীকার করেছিল, গবেষণায় বর্ধিত হারে বিনিয়োগ করা হবে, সম্ভাবনাময় ভ্যাকসিনের জন্য সহায়তা করা হবে, যেটিকে কভিড-১৯-এ কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু ওষুধ কম্পানিগুলো গবেষণা পরিত্যাগ করল। কেন করল? কারণ এর থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

গত মাসে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনকে বলল, বিভিন্ন দেশকে ক্ষমতা দেওয়া হোক, যাতে তারা যতক্ষণ না গ্লোবাল ইমিউনিটি অর্জিত হচ্ছে, ততক্ষণ কভিড-১৯ সম্পর্কিত ওষুধে বা ভ্যাকসিনে রোগীদের সংশ্লিষ্ট না করে। এ সপ্তাহে সমর্থন দিল জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা সরকারগুলোকে বললেন ভ্যাকসিনের বৈশ্বিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে। কিন্তু এসব প্রস্তাব বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। কতিপয় ধনী দেশ ফাইজার-বায়োনটেকের ভ্যাকসিনের এক বিলিয়নের বেশি ডোজের জন্য চুক্তি করেছে; সারা বিশ্বের জন্য যত উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল তার এক-চতুর্থাংশেরও কম অবশিষ্ট রাখা হয়েছে।

ভ্যাকসিনে একচেটিয়াপনায় কী বিপর্যয় ঘটতে পারে সেটা ভেবে দেখা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র গড়ে অন্যান্য দেশের তুলনায় ওষুধ বাবদ চার গুণ খরচ করছে; প্রত্যেকের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। ভাকসিন আসবে ঠিকই কিন্তু এর সব সুবিধা ওষুধ কম্পানিগুলোকে দেওয়া ঠিক হবে না। তারা বলতে গেলে অকার্যকর ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া।

লেখক : দ্য গার্ডিয়ান ইউকের কলামিস্ট

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা