kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সমৃদ্ধ দেশ গড়তে মেধার চর্চা দরকার

ড. মো. নাছিম আখতার

১৬ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সমৃদ্ধ দেশ গড়তে মেধার চর্চা দরকার

২ অক্টোবর ১৬৪৮ সাল। দিনটি ইউরোপীয়দের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রায় ৩০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটে এই দিনে। এরপর কিন্তু ইউরোপীয়রা সময় নষ্ট না করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে উত্তাল সমুদ্রপথ ও দুর্গম বন-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। নানা প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে বিশ্বময় গড়ে তুলেছিল নিজেদের উপনিবেশ। উপনিবেশগুলো থেকে আহরিত সম্পদ তারা শুধু নিজেদের ভোগ-বিলাসে কাজে লাগায়নি, গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতিতেও ব্যয় করেছে। সূচনা করেছে শিল্পবিপ্লবের। ফলে তারা হয়েছে তস্কর থেকে উন্নত ও সভ্য জাতি।

এখন পৃথিবীতে ঔপনিবেশিক শাসন নেই। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের মাধ্যমে এক দেশ আরেক দেশের মধ্যে ব্যাবসায়িক, শ্রমভিত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক উপনিবেশ তৈরি করতে পারছে। করোনাকালে মন্দা অর্থনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন চিন্তা করেছিল এইচ-১ ভিসা নিয়ে যে ভারতীয়রা সেখানে কাজ করছে, তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়াবে না। কিন্তু অনেক চিন্তা-ভাবনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর দেখা গেল এইচ-১ ভিসাধারী পাঁচ লাখ ভারতীয়কে থাকার অনুমতি না দিলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। ঘটনাটি প্রমাণ করে নাগরিক যে দেশেরই হোক না কেন দক্ষ ও মেধাবী জনশক্তি নিজগুণে বৈশ্বিক সর্বজনীনতা অর্জন করবেই। পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়, সেখানকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধ্যাপক চীন ও ভারত থেকে আগত। কেন এমনটি হচ্ছে? কারণ এই দুটি জাতি পড়াশোনায় সবচেয়ে বেশি সময় দেয়। পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বে পড়ুয়া জাতি হিসেবে ভারত ও চীনের অবস্থান এক থেকে তিনের মধ্যে।

কোনো দেশের অগ্রগতি ও উন্নতি নির্ভর করে ওই দেশের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সদিচ্ছা ও দেশের প্রকৃত অবস্থা বুঝে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর। জনসংখ্যার নিরিখে আমাদের দেশ পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাতে চীন ও ভারতে যখন যথাক্রমে বাস করে ১৪৫ ও ৪১১ জন, সেখানে আমাদের দেশে বাস করে প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক হাজার ১৮৪ জন। যদি এই জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে আমাদের দেশ এগোবেই। এর জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন। জাতি গড়তে জ্ঞানের চর্চায় এগিয়ে থাকতে হবেই। একটি বিষয় লক্ষণীয়, অঙ্ক অলিম্পিয়াডে যে প্রতিযোগীরা ভালো করে তাদের অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে। এটা প্রমাণ করে যে গবেষণা ও পৃথিবী বদলানোর জন্য যে পরিবর্তনগুলো সাধিত হয়েছে তার মূলে রয়েছে অঙ্ক। তা ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চালিকাশক্তি দক্ষ ও প্রত্যয়ী ‘কম্পিউটার প্রগ্রামার’ তৈরিতে অঙ্কতে পারদর্শিতা অপরিহার্য। অঙ্ক ছাড়া পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে প্রত্যয়ী জ্ঞান ছাড়া গবেষণামুখী জাতি গঠন সম্ভব নয়। একটি খবরের সূত্রমতে, যশোর হাইটেক পার্ক ছেড়েছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সেখানে একটি বড় সমস্যা দক্ষ জনবল পাওয়া। সারা বাংলাদেশেই কম্পিউটার প্রগ্রামিংয়ে দক্ষ জনবল পাওয়া বেশ কঠিন। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। শুধু পাশ্চাত্যের অনুকরণ নয়, বাস্তবিক বিশ্লেষণে যে জাতি অঙ্ক, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের উন্নত তাদের শিক্ষাকে অনুকরণ করতে হবে আমাদের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে।

ছাত্রজীবনে দেখেছি, কোনো বিষয়ে জানা এক বিষয় আর ওই বিষয়ে প্রত্যয়ী হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। পরীক্ষার হলে যখন প্রত্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করি, তখন দেখি কিছু কিছু শিক্ষার্থী লেখা থামিয়ে পরীক্ষার হলের ছাদের দিকে তাকিয়ে মন্ত্র পাঠের মতো বিড়বিড় করে পড়া মনে করার চেষ্টা করে। আবার লিখে, আবার ছাদের দিকে তাকিয়ে পড়া মনে করে। এভাবেই ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে পরীক্ষার শেষ সময় পর্যন্ত। কারণ তারা পড়লেও পড়াটিকে লিখে অনুশীলন করে না। যার কারণে লিখে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা থেকে যায়। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ফটোকপি, স্মার্টফোনে ছবি তোলার মাধ্যমে পড়ালেখা সংরক্ষিত রাখা যায় বলে লেখার পরিমাণ কমে গেছে। লেখা ছাড়া শুধু পড়ে কোনো বিষয়ে প্রত্যয়ী হওয়া সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে লেখার বিষয়টি চর্চার মধ্যে রাখতে হবে। অন্যথায় ভাসা ভাসা জ্ঞানসম্পন্ন জাতি গড়ে উঠবে, যারা অবৈধ উপায়ে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করবে বা ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে সাগর-মহাসাগর-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অবৈধভাবে ঢোকার চেষ্টায় জীবন সংকটে পড়বে।

সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের ব্যবহার পুরো জাতিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে। অসুস্থ জনগোষ্ঠী দেশের অগ্রগতিতে কোনোভাবেই অবদান রাখতে পারবে না, বরং সমাজকে বিশৃঙ্খল ও কলুষিত করবে। আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বলেন, আমরা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত হব; কিন্তু তারা কি জানেন মাদক নিয়ন্ত্রণ ও মাদক ব্যবসায়ীর শাস্তির ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম আইন রয়েছে সিঙ্গাপুরে। উন্নত জাতি গড়তে মাদকের ক্ষেত্রে আমাদের আইনও হওয়া উচিত সিঙ্গাপুরের অনুরূপ।

দেশের উন্নয়নে আরেকটি প্রধান শর্ত দুর্নীতির অপসারণ। দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য লোকের নিয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ দেশকে শুধু দরিদ্রই করে না, জনগোষ্ঠীর অন্তর্নিহিত ইচ্ছাশক্তি পরস্ফুিটনে বাধা সৃষ্টি করে। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজে মানুষ চিন্তা করে এত পরিশ্রম করে লাভ কী? চুরি করে বা দুর্নীতি করে তো ভালোই থাকা যায়! এমন জীবনদর্শনের কারণে পুরো জাতি নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধিতে নিশ্চেষ্ট হতে পারে। তাই দুর্নীতি বন্ধ হলে মানুষ পরিশ্রমী, চিন্তাশীল ও মেধার চর্চায় উৎসাহিত হবে। ফলে পুরো জাতি হবে যোগ্য ও প্রত্যয়ী।

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা