kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

মৃত্যুদণ্ডেই কি ধর্ষণ বন্ধ হবে?

খন্দকার ফারজানা রহমান ও উম্মে ওয়ারা

১৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মৃত্যুদণ্ডেই কি ধর্ষণ বন্ধ হবে?

সম্প্রতি সিলেটের এমসি কলেজ ও নোয়াখালীতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের মতো মর্মান্তিক ঘটনার জন্য পুরো দেশ যখন ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের জন্য ফুঁসে ওঠে, তখন মন্ত্রিসভা সাধারণ মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০, যেটি ২০০৩ সালে সংশোধিত হয়েছিল, সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ডকে সর্বোচ্চ শাস্তি রেখে বিল পাস করে। কিন্তু শুধু সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করেই কি ধর্ষণ ঠেকানো সম্ভব? প্রশ্নটি কিন্তু থেকেই যায়। তাই আমরা মনে করি, এখানে কিছু বিষয় তুলে ধরা দরকার।

প্রথমত, আমরা যদি আমাদের দেশের অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে তাকাই, তাহলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধর্ষণের শিকার নারীকে প্রমাণ করতে হচ্ছে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কি না। ধর্ষণের শিকার নারীকে আইনের সামনে আনা, আলামত প্রমাণ করা, মামলাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মতো কঠিন কাজগুলো করতে হচ্ছে প্রসিকিউটরকে। এ ছাড়া আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষী সুরক্ষা বা ভিকটিম প্রটেকশন আইন পাস হয়নি। তাই ২০০০ সালের আইন অনুযায়ী মূলত চাপ থাকে ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর। উপরন্তু বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির জন্য নির্যাতিতার ওপর চাপ আরো বেশি বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণস্বরূপ সুবর্ণচরে ধর্ষণের মূল আসামি রুহুল আমিন বর্তমানে জামিনে আছে। সে যত দিন জামিনে থাকবে তত দিন ধর্ষিতার জীবনের ঝুঁকি থাকার আশঙ্কা প্রবল। উপরন্তু আমাদের সমাজে ধর্ষণ একটি কলঙ্কজনক ঘটনা হিসেবে মনে করা হয় এবং ধর্ষণের শিকার নারীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়। এ ছাড়া আমাদের দেশে ধর্ষণের মামলাগুলো আলোর মুখ দেখে না মূলত দুটি কারণে। একটি হলো পর্যাপ্ত আলামতের অভাব, অন্যটি হলো সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণে সমস্যা। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের অনেক নারীই জানে না ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর গোসল করা যাবে না, ধর্ষণের কত দিনের মধ্যে সে সিমেন (বীর্য) ও আলামত মেডিক্যাল টেস্ট সংরক্ষণের জন্য দিতে পারবে। ফলে নানা অজ্ঞতার কারণে ধর্ষকের সঙ্গে সমঝোতা করে বিভিন্ন প্রকার কমপেনসেশনের (ক্ষতিপূরণ) মাধ্যমে ধামাচাপা দিতে হয়। তৃতীয়ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অনেকেই জানে না, আলামত কিভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ বন্ধ করা হয়েছে, সেটি অন্তত ভালো একটি উদ্যোগ; কিন্তু ধর্ষণের শিকার নারীরা জানেই না কোথায় গিয়ে আলামত জমা দিতে হবে। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রতিটি মামলায় ডিএনএ টেস্টের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে মামলার আলামত প্রমাণ ও রায় পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আমাদের দেশের ডিএনএ ল্যাবরেটরিগুলোর সক্ষমতা নিয়ে সব সময় এক ধরনের জটিলতা থেকেই যায়।

পৃথিবীর অনেক দেশেই সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কারণ তাদের মতে, মৃত্যুদণ্ড অপরাধ দমনে ভূমিকা রাখতে পারে না। এমনকি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়, ২০১০-১৯ পর্যন্ত দুই হাজার ৬৮টি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে; কিন্তু মাত্র ৩০টি কার্যকর করা হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি প্রশ্ন আসতেই পারে, ধর্ষণ প্রতিরোধে তাহলে কী কী পদক্ষেপ কার্যকর হবে?

এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে ২০০০ সালের আইনটি যেহেতু ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের সমস্যাযুক্ত ‘ধর্ষণ’-এর সংজ্ঞা অনুসরণ করছে, এ ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞাটিকে সময়োপযোগী না করে, কঠিন শাস্তির বিধান কখনোই দূরবর্তী কোনো সমাধান আনতে পারবে না ধর্ষণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে। পেনাল কোড ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করেছে একপেশে চিন্তা থেকে, যেখানে শুধু একজন পুরুষই একজন নারী বা মেয়েশিশুকে ধর্ষণ করতে পারে, ছেলেশিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এখানে। আবার ২০০০ সালের আইনটি ‘শিশু’ অর্থ অনধিক ১৬ বছর বয়সের যেকোনো ব্যক্তিকে বুঝিয়েছে। সঠিক বিচার লাভের জন্য আইনের এই অসংগতি দূর করা প্রয়োজন। এমনকি পেনাল কোডে ‘পেনিট্রেশন’কেও সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এ কারণে কোনো অবজেক্ট প্রবেশের মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন বা নারীর যোনিপথ ছাড়া অন্য কোনো পথে পুরুষের যৌনাঙ্গ প্রবেশ ও ‘পেনিট্রেশন’-এর আওতাভুক্ত কি না তা পরিষ্কার নয়।

আইনের এসব জটিলতা ছাড়াও যে বিষয়ে আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার, তা হলো আইন সংস্কার করে আমরা অপরাধ কতটুকু কমাতে পারছি? আর এসব বিষয়ের উত্তর শুধু আইনের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে ‘রেট্রিবিউটিভ’ বা ‘প্রতিশোধমূলক’ বিচারব্যবস্থায় যেখানে আমরা শুধু অপরাধীকে শাস্তির মাধ্যমেই অপরাধ দমনের কথা ভাবছি, অপরাধীকে ‘রিফরমেশন’ বা ‘সংশোধন’ করে নয়। ধর্ষণের মতো একটি অপরাধের ক্ষেত্রে ধর্ষক ও সম্ভাব্য ধর্ষকদের মনস্তত্ত্বকে আমলে এনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক দিকগুলো নিয়ে যত দিন গবেষণামূলক ও ব্যাবহারিক পদক্ষেপ না নেওয়া হবে, তত দিন এই অপরাধটি সমাজ থেকে নির্মূলের সম্ভাবনা বেশ কম। কারণ সংশোধন ছাড়া একজন ব্যক্তি কারাদণ্ড ভোগ করার পর আবারও ধর্ষণ করতে পারে, যদি তার মনস্তত্ত্বে কোনো পরিবর্তন না আসে।

উদাহরণ দিয়ে বলি। আমেরিকার প্রতি ছয়জন নারীর মধ্যে একজন তার জীবদ্দশায় ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার ভিকটিম। গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন নিপীড়করা জাত-ধর্ম-লিঙ্গ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানভেদে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। তাই তাদের যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ করার পেছনে লিঙ্গবৈষম্যের প্রভাব ছাড়াও টক্সিক মাস্কুলিনিটি (বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র), সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ত্রুটি, শৈশবকালীন ট্রমার মতো নানা কারণ রয়েছে, যেগুলো শাস্তি বিধানের মাধম্যে নিরাময় করা সম্ভব নয়। কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট লিখেছেন, তাই আমেরিকায় যৌন নিপীড়কদের মানসিক পরামর্শদানের মাধ্যমে তাদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। এই চিকিৎসার মাধ্যমে নিপীড়করা অবমাননাকর আচরণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল আত্মস্থ করে, নিজেকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ লাভ করে।

এবার আসুন দেখি বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা ভিকটিমকে কিভাবে এবং কতটুকু বিচার নিশ্চিতকরণে সহায়ক। অপরাধী শাস্তি পাওয়া মানেই কি ‘জাস্টিস’? রেস্টরেটিভ জাস্টিস ব্যবস্থায় ভিকটিম এমপাওয়ারমেন্টের কথা বলা হয়েছে, যেটি আমাদের দেশে একেবারেই প্রচলিত নয়। উল্টো ‘ভিকটিম ব্লেমিং’-এর আশ্রয়ে নারীকে বিচার চাওয়া থেকে আরো নিরুৎসাহ ও অবদমিত করে রাখা হয়। এই বিচারব্যবস্থা ‘ভিকটিম’কে ‘সারভাইভার’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের কারণ বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।  বাংলাদেশের বর্তমান বিচারব্যবস্থায় অপরাধীর চেয়ে সারভাইভারের দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ কম, আইনে   মৃত্যুদণ্ডের সংযোজনের মাধ্যমে যা আরেকবার প্রমাণিত হলো।

এ ছাড়া ২০০০ সালের আইনের অধীনে ধর্ষণের ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো আধুনিক রায়ও দেওয়া হয়েছে মার্চ, ২০১৯ সালে মানিকগঞ্জের একটি ধর্ষণ মামলায় (২১ বিএলডি ৪৬৫)। ব্লাস্ট ও সিসিবি ফাউন্ডেশনের করা রিট আবেদনে, আদালত অভিযুক্ত দুই পুলিশ অফিসারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন ভিকটিমকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য নয় মর্মে রুল জারি করেন। গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় এই প্রথম হাইকোর্ট নীতি সাপেক্ষে ধর্ষণকে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকার করেন, ক্ষতিপূরণ বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। 

আইন প্রয়োগের প্রশ্ন আসে কোনো একটি অপরাধ সংঘটনের পর। কিন্তু আমাদের মতে, ধর্ষণ প্রতিরোধে সমাজকে সর্বপ্রথম ‘বহুমাত্রিক পদ্ধতি’ প্রণয়ন করতে হবে, যেটি করবে সরকার। আইনি ব্যবস্থা আধুনিকায়নের মাধ্যমে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ ইত্যাদি সেক্স এডুকেশনের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া পরিবারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ শিশু-কিশোররা পরিবার থেকেই তাদের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা পায়। এ ছাড়া পারস্পরিক সম্মান ও সম্প্রীতির জায়গা সুদৃঢ় করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ধর্ষকদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সুযোগ না দিয়ে সেটি প্রতিরোধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের একত্রে কাজ করতে হবে। তাহলেই হয়তো আমরা ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধ দমন করতে পারব এবং ধর্ষণের শিকার কোনো নারী যেন কোনোভাবে হেনস্তার শিকার না হয়, সেদিকেও ভূমিকা রাখতে পারব।

 

লেখকদ্বয় : চেয়ারপারসন ও সহকারী অধ্যাপক এবং সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য