kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

দুই শ্বেতাঙ্গ পুরুষের লড়াই মার্কিন নির্বাচনে

জন ড্যাভিস

২৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছিল ১৭৮৮ সালে। এরপর এখন পর্যন্ত ৫৭টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনে দুজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ (সাম্প্রতিক ব্যতিক্রম ওবামা ২০০৮ ও ২০১২ এবং হিলারি ক্লিনটন পরাজিত ২০১৬ সালে) রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়ার আসনে আসীন হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। অল্পবিস্তর ব্যতিক্রম বাদে প্রত্যেক জোড়াই নিজেদের নিবেদিত করেছেন রাষ্ট্রের এজেন্ডা ‘হোয়াইট-মেইল সুপ্রিমেসি’ ধরে রাখার জন্য। নিবর্তনের এ ব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কলম্বাস, ১৪৪২ সালে।

আগামী ৩ নভেম্বর ৫৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। কাঠামোটা এখনো ঠিক আছে—প্রতিযোগিতা হবে দুজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষের মধ্যে। তাঁদের দুজনের মধ্যেই একটি ধারণা কাজ করে—লিঙ্গ ও গাত্রবর্ণ তাঁদের শাসনের অধিকার দিয়েছে; শাসন করতে না পারলেও তাঁরা অর্থ ও ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করবেন। প্রতি চার বছর পর আমরা আমাদের ‘চয়েস’ প্রকাশ করি—দুজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষের একজনকে বাছাই করার। প্রার্থীরা গভীরভাবে শ্বেতাঙ্গ পুরুষাধিকারে আস্থাবান।

আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো, যা আমাদের প্রেসিডেন্টরা রক্ষার শপথ করেন, এ সুবিধা রক্ষার কাঠামোয় বিশ্বাসী। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে ওরাকল, তারা দাবি করে বর্তমানের যেকোনো প্রশ্ন পূর্ববর্তী ঘটনা (প্রিসিডেন্স) দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এটা হচ্ছে সেই দেশ, যা নিজেকে অতীতের ঘটনাবলি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে। আমাদের অতীত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনদের দাসশ্রমে এবং আদিবাসী আমেরিকানদের নির্বংশকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। সহজাত কুসংস্কার, চায়নিজ এক্সক্লুশন অ্যাক্ট এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের স্থানান্তর, কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি লোকদের গণকারান্তরীণ করা এবং অতি সাম্প্রতিক পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নকরণ আইন ও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে যেতে অঙ্গীকার করা (এসব মেক্সিকান ও মধ্য আমেরিকানদের জন্য) বিষয়ক হীন কর্মকাণ্ড দ্বারা বিষয়গুলোকে আরো পোক্ত করা হয়েছে। এসব করা হয়েছে আইনের সম্পূর্ণ আশ্রয় নিয়ে ও মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এবং সেই নেতৃত্বের দ্বারা যারা শ্বেতাঙ্গ পুরুষের সুপ্রিমেসির বৈধতাকে সম্পূর্ণভাবে মানানসই করে নিয়েছে।

মার্কিন ইতিহাসে বেশির ভাগ সময় নারীর মর্যাদা প্রায় দাসদের মতো ছিল। খ্যাতিমান আইন বিশেষজ্ঞ সান্ড্রা এল রায়ারসন তাঁর ‘Race and Gender Discrimination : A Historical Case for Equal Treatment under the Fourteenth Amendment, 1994’  ১৯৯৪’ নিবন্ধে লিখেছেন, ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার কালো ও নারীদের অভিজ্ঞতা একই রকম প্রায়, বিশেষ করে চতুর্দশ সংশোধনীতে যেসব অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে সেসবের পরিপ্রেক্ষিতে। মার্কিন সমাজে যৌনতা (সেক্সিজম) ও বর্ণবাদ (রেসিজম) সব জাতের নারীদের প্রতিহত করেছে এবং কালো পুরুষদের বঞ্চিত করেছে অধিকার ভোগ থেকে—পৌর, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে। যদিও সাংবিধানিকভাবে এসবে তাদের অধিকার আছে।

যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দেশ, যেখানে নারীরা গাত্রবর্ণ-নির্বিশেষে, হীন জাত হিসেবে স্বীকৃত হয়, ভদ্র ভাষায় ‘দুর্বল লিঙ্গ’ হিসেবে। তাদের ক্ষেত্রে সমান অধিকারের সাংবিধানিক ধারা অস্বীকার করা হয়। তাদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছে ১৯২০ সালে। নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে তারা সর্বদা হুমকিগ্রস্ত। সামাজিক পুনরুৎপাদনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও ব্যবস্থাটি তাদের গৃহস্থালি কর্মের জন্য কোনো কিছু দেয় না, কর্মক্ষেত্রে কাজের জন্য পুরুষদের চেয়ে কম বেতন দেয়। তারা যদি কর্মী হয়, সাধারণত তাদের ক্ষেত্রে পেইড ম্যাটারনিটির শর্ত মানা হয় না; চাইল্ড কেয়ার ও সন্তানদের জন্য অন্যান্য সেবা তারা পায় না। শ্বেতাঙ্গ পুরুষদেরও অনেক বঞ্চনা আছে; কিন্তু তাদের একটা চিরস্থায়ী শক্তিমানতার বোধ দেওয়া হয়—এ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যবস্থাকে সমর্থন যাতে তারা করে। তারা যতই ভোগান্তিতে থাকুক, নানা সান্ত্বনা তাদের দেওয়া হয়। সবচেয়ে বাজে সান্ত্বনার কথা হচ্ছে—রাজনীতিক হও, এমনকি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হও।

আমাদের সরকার সাম্রাজ্য রক্ষা বা বিস্তারের জন্য যুদ্ধ করে। এটা ঔপনিবেশিক আকুতির সম্প্রসারণ। এসব তারা করে ভিন্ন বর্ণের লোকদের শোষণ করার জন্য, তাদের ভূমি থেকে সম্পদ আহরণের জন্য যে ভূমির ওপর তাদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। যে অঞ্চলজুড়ে আজকের যুক্তরাষ্ট্র, তাতে আদি ১৩টি কলোনি ছিল, যা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন করা হয় ১৭৮৩ সালে। এসব কলোনি বা পরে যা কেনা বা অধিকার করা হয়েছে, সব জায়গায় কলম্বাসের আগে আদিবাসীরা থাকত। ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধ বা বিংশ শতকে মধ্য আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরে অ্যাডভেঞ্চারিজম চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—সাম্রাজ্যের মনোভাবে বর্ণগত ও সভ্যতাবিষয়ক সুপিরিয়রিটির বোধ ছিল এর পেছনে।

বিংশ শতকে দুটি বিশ্বযুদ্ধে বিলম্বিত ও দায়সারা অংশগ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি এখনো মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ায় আঞ্চলিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে; সব ক্ষেত্রে বর্ণবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয়াদিতে যুক্তরাষ্ট্র যৌন ও বর্ণবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়; সমস্ত বাণিজ্যিক, আর্থিক কর্মকাণ্ডে ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ মানসিকতা অন্তর্নিহিত। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের হিসাবে গড়পড়তায় একটি কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের চেয়ে প্রায় দশ গুণ সম্পদ আছে একটি শ্বেতাঙ্গ পরিবারের। এটা এই মহামারির সময়ে আরো প্রকট হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ বা বাদামি পরিবারে সংক্রমণ বা মৃত্যুহার অহিস্পানিক সাদা পরিবারের তুলনায় কমপক্ষে পাঁচ গুণ। জরুরি কাজের শ্রমিকরা মূলত কালো বা বাদামি এবং অস্বাভাবিক হারে নারী। এটা হয়েছে মার্কিন সমাজে নিহিত কুসংস্কারের কারণে। এ কুসংস্কারই পুনর্নবায়িত হয়ে চলছে। প্রতি চার বছর পর প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে একজন শ্বেতাঙ্গের পেছনে যে বিনিয়োগ হয়, তার খুবই বাস্তবিক ও প্রতীকী গুরুত্ব আছে। এটা গোটা জনসংখ্যার শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের প্রতি বিনা প্রশ্নে আনুগত্যের প্রতীক। সমাজের প্রতি স্তরে পুরুষতান্ত্রিকতার এ প্রমাণ বিদ্যমান।

যুক্তরাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবেই বর্ণবাদী ও যৌনতাবাদী। প্রেসিডেন্টরা ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এ বোধকে লালন ও সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা ও সাম্যের দেশ, আঁতুড়ঘর—এ বোধ ও মিথের আড়ালে এসব ঢাকা থাকে। এই মানসিকতা দূর করতে হলে মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন দরকার। ভোটাররা নিজের অজান্তেই যৌনতা ও বর্ণবাদের—আসলে হোয়াইট-মেইল সুপ্রিমেসির ধারণা জিইয়ে রাখায় সহযোগীর ভূমিকা পালন করে।

 

লেখক : স্থাপত্যকলাবিদ, ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা

সূত্র : কাউন্টারপাঞ্চ

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা