kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

স্বাধীনতা মানে বোকাদের স্বাধীনতা নয়

মিশেল তমস্কি   

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজপথে ফিরে এসেছেন ট্রাম্প; গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে সমাবেশ করে যাচ্ছেন। এসব সমাবেশে প্রেসিডেন্টের পেছনে যাঁরা থাকছেন তাঁরা মাস্ক পরছেন; কিন্তু বাকি বেশির ভাগই তা পরছে না। বেশির ভাগের কাছে এটাকে বেদনাদায়ক দায়িত্বহীনতা বলে মনে হয়। কিছু জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সাধারণত বাইরে গেলে মাস্ক পরে।

ট্রাম্পের লোকজন এ বিষয়গুলোকে অন্যভাবে দেখে। মাইক পেন্স মাস্ক না পরার এ দৃষ্টিভঙ্গিটাকে ভাইস প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে বিবৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা স্বাধীনতার বিষয়ে বলি এবং আমরা মার্কিন জনগণের স্বাধীনতার বিষয়টিকে শ্রদ্ধা করি।’

কমালা হ্যারিস মার্কিন জনগণের কাছে এই মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাস যে মাত্রায় ছড়িয়েছে তাকে মাইক পেন্সের মতো ‘শ্রদ্ধা’ বলা যায় কি না সন্দেহ আছে। এটা খুব ভালো জবাব ছিল; কিন্তু তিনি ভুল শব্দ বাছাই করেছেন। তিনি চাইলে আরো দাঁতভাঙা জবাব দিতে পারতেন, যদি তিনি সঠিক শব্দটির ওপর জোর দিতেন। সেই শব্দটি গত কয়েক মাসে ডেমোক্র্যাটরা কাজে লাগায়নি।

আমি মনে করি, সেই শব্দটি হতে পারত ‘স্বাধীনতা’ (ফ্রিডম)। পশ্চিমা ‘স্বাধীনতা’র ধারণার অন্যতম প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ট মিল। ‘অন লিবার্টি’তে তিনি বলেছেন, লিবার্টি বা ফ্রিডম মানে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করা। মানুষের কর্ম অন্য কারো ক্ষতি করবে না। তবে অনেকে ভাবতে পারে, এসব আচরণ বোকার মতো, বিকৃত অথবা ভুল।

‘যতক্ষণ আমাদের কাজ তাদের ক্ষতি করবে না’—এ কথাটিই ফ্রিডমের প্রমিত সংজ্ঞা। আরো সাধারণ করে বললে এই প্রবাদের মতো করে বলা যায়—‘তুমি তোমার ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করতে পারো, তবে তোমার মুঠির আওতা আমার নাকের ডগা পর্যন্ত।’

স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে কাউকে অসুস্থ করে বিষয়ে স্বাধীনতা দেয় না। এটা মুদির দোকানে কাউকে মাস্ক পরতে না চাওয়ার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে না, কারো ওপর হাঁচি দেওয়া অনুমোদন করে না এবং কারো ওপর ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার স্বাধীনতা দেয় না।

জো বাইডেন এ ব্যাপারে ভালোই বলেছেন। সম্প্রতি মিয়ামিতে তিনি বলেছেন, ‘মাস্ক যে আমাকে খুব সুরক্ষা দেবে এভাবে বিষয়টাকে আমি দেখছি না; এটাকে আমি দেশপ্রেমিকের কর্তব্য হিসেবে দেখছি।’ ডাকাবুকো লোকজন বলছে, ‘আমি মাস্ক পরছি না, আমি ভীত নই।’ ঠিক আছে, ভালো কথা। তুমি তোমার স্বামীর, স্ত্রীর, পুত্রের, কন্যার, প্রতিবেশীর, সহকর্মীর কথা ভেবে ভীত বা সতর্ক হও। তুমি মাস্ক পরলে ওরা রক্ষা পাবে। এটাকে দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব হিসেবে ভাবা উচিত—আশপাশে যারা আছে তাদের রক্ষা করতে হবে।

এটা ভালো। আরো ভালো হতো যদি তিনি সরাসরি বলতে পারতেন আজকের দক্ষিণপন্থীরা স্বাধীনতা সম্পর্কে যা বলে তা ঠিক নয়। আমাদের রাজনৈতিক অভিধানে কিছু শব্দ আছে, যা এ পক্ষেও পড়ে, ও পক্ষেও পড়ে। ‘ফেয়ারনেস’ বা সুষমতা একটা লিবারেল শব্দ। রক্ষণশীলরা এ নিয়ে কমই বলে। ‘গ্রোথ’ বা প্রবৃদ্ধি মূলত একটি রক্ষণশীল শব্দ, মাঝেমধ্যে তা পপুলার ইকোনমিক ডিসকোর্সে ‘ফেয়ারনেস’-এর বিপরীত শব্দ; যদিও উদারপন্থীরা এটা ব্যবহার করে, তবে বিশেষণসহ (যেমন—ব্যালান্সড গ্রোথ, ইকুইটেবল গ্রোথ প্রভৃতি)।

স্বাধীনতা এখন প্রায় পুরোপুরিই দক্ষিণপন্থায় পড়ে। তারা লাগাতার ফ্রিডমের কথা বলে এবং জোর দিয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সম্পর্কের কথা বলে; এমনভাবে বলে যে আগেরটা ছাড়া পরেরটা অসম্ভব। এটাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য সত্য বলা যায়, কিন্তু এটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের জন্য সত্য নয়। যদি তারা সঠিক হতো, তাহলে স্ক্যান্ডিনেভীয় জাতিগুলোর, যারা অর্থনীতির প্রশ্নে স্ট্যাটিস্ট, রাজনৈতিক কারাবন্দিপূর্ণ জেলখানা থাকত। তারা সঠিক হলে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ, যারা বামঘেঁষা সরকার নির্বাচন করে তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিলুপ্ত হতো। কিন্তু সেটা হয়নি।

মোটাদাগে আমেরিকার বামপক্ষ দশকের পর দশক স্বাধীনতার এ ধারণাকে বাধাহীন অবস্থায় চলতে দিয়েছে, দক্ষিণপন্থীরা যেমন মনে করে সেভাবে। তারা স্বাধীনতার নামে রোগের বিস্তার ঘটতে দিতে পারে, মানুষ হত্যার বিষয়টিকে ঘটতে দিতে পারে। এটা পাগলামি।

একটা বিষয়ে ডেমোক্র্যাটরা তেমন ভালো নয়; নিজেদের অবস্থানকে ফিলোসফিক্যাল প্রিন্সিপালের লেভেলে ডিফেন্ড করে তারা। এটা হওয়ার কারণ রিগ্যানের আমল থেকে তারা ফিলোসফিক্যালি ডিফেনসিভ। এখনই সময়, ডেমোক্র্যাটরা কিছু ফিলোসফিক্যাল অফেন্স করতে পারে, বিশেষত মাস্ক পরা বিষয়ে। এ ইস্যুতে  বেশির ভাগ জরিপে দেখা গেছে, বিপুল মেজরিটি তাদের সমর্থন করছে।

ফ্রিডম মানে বোকাদের কারণে সংক্রমিত হওয়া নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা