kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

করোনায় বিভ্রান্ত শিক্ষা খাত

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনায় বিভ্রান্ত শিক্ষা খাত

জাতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে শিক্ষাঞ্চল। কিন্তু বরাবরই এ দেশের শিক্ষানীতি ও এর দুর্বল প্রয়োগের কারণে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনদের অস্বস্তি কাটেনি। শিশুশিক্ষার জন্য তো তেমন কোনো নীতিই তৈরি হয়নি এ দেশে। মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের নীতিনির্ধারণের দুর্বলতা বারবার চোখে পড়েছে। ক্রমাগত কারিকুলাম ও পাঠ্যসূচির পরিবর্তনের অদ্ভুত নিরীক্ষা অব্যাহতভাবে চলছে। একই দেশে নানা ধারার শিশুশিক্ষা পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে আগামী দিনের ভিত্তি গড়ার মতো অত্যন্ত জরুরি বিবেচনাটি করতে হয়, সেখানে বারো রকমের শিক্ষার ধারা আতঙ্কিত করে তুলছে সচেতন মানুষকে। এমনসব খানাখন্দে ভরা শিক্ষার চলা পথ করোনার আঘাতে আরো বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে যেন। সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের আপৎকালীন সিদ্ধান্তগুলো দেখলে মনে হয়, করোনা সবাইকে দিগভ্রান্ত করে ফেলেছে। এ কারণেই যেন শিক্ষা খাতের এমন বিভ্রান্ত দশা।

শিক্ষা-ভবিষ্যৎ নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকে না বলে করোনার মতো কঠিন অবস্থায় পড়লে দিশাহারা দশায় পড়েন নিয়ন্ত্রকরা। চাপিয়ে দেন নানা ধরনের ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। কারা এসবের পেছনে মাস্টারমাইন্ড তা-ও ঠিক বুঝতে পারি না।

গত ২২ অক্টোবর কালের কণ্ঠ পত্রিকায় অন্যতম প্রধান সংবাদের শিরোনাম ছিল—‘কোটি কোটি শিক্ষার্থীর কী হবে’। এখানে লাখ লাখ কিন্ডারগার্টেনের স্কুলের শিক্ষার্থীর কথা বলা হয়েছে। হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। আরো অনেক বন্ধ হওয়ার পথে। একটি বিষয় সাধারণ মানুষ ও সরকারকে বুঝতে হবে। রাষ্ট্রেরই কিন্তু দায়িত্ব ছিল নাগরিকদের শিক্ষার পথ প্রশস্ত করা। সেই সক্ষমতা নেই বলে বেসরকারি উদ্যোগে অসংখ্য শিশু শিক্ষালয় গড়ে উঠেছে। এসব স্কুল সরকারের তেমন সহযোগিতা ছাড়াই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব পালন করছে। এই শিক্ষার্থীরাই পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতায় নামছে। এই বিচারে দুর্দিনে রাষ্ট্রেরই আশ্রয়দাতা হওয়ার কথা ছিল এসব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের। কিন্তু কভিডের এই আট মাসে তেমন তৎপরতা সরকারের দিক থেকে দেখা যায়নি। এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সরকারি নানা দোদুল্যমানতা আমরা লক্ষ করেছি। এটি তেমন অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ এমন একটি দম বন্ধকর অবস্থায় শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন, কারো শতভাগ ঠিক পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। আর মন্ত্রণালয়কে তো দারুণ চাপেই থাকতে হয়েছে। সংশ্লিষ্টজন নিশ্চয় একটি উত্তম ফায়সালায় যেতে চেয়েছেন। তবে যে সিদ্ধান্তে আসা হয়েছে তা নিজেদের গা বাঁচানোর জন্য যতটা সঠিক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিণতি ততটাই তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। যেহেতু শিক্ষকতা করি, তাই পরিচিতজন শিক্ষাসংক্রান্ত নানা সংকটে আমাদের কাছে পরামর্শ পেতে চান। এবার অনেকেই এইচএসসির অটো পাস ও এইচএসসির ফলাফল নির্ধারণের পদ্ধতির কথা শুনে দারুণ গোলকধাঁধায় পড়েছে। এটি কী তাদের জন্য ভালো হলো, না মন্দ হলো বুঝে উঠতে পারছে না। এই ফলাফল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ইত্যাদিতে ভর্তিযুদ্ধে তারা ছিটকে পড়বে কি না তেমন আতঙ্কে ভুগছে। তবে যেসব শিক্ষার্থী মেধাচর্চায় পিছিয়ে থাকে, যেসব কলেজের পরীক্ষার ফলাফল তলানিতে থাকে তারা মহানন্দে আছে। এই অটো পাস তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। আমার বন্ধু সদ্য অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক রসিকতা করেই বললেন, করোনা আমাদের অনেকেরই উপকারী বন্ধু। সব বছরেই স্কুল ও কলেজে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর যারা এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষা দেয় তাদের কমপক্ষে ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। এবার জেএসসি ও এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে সবাই অটো পাস হচ্ছে এবং অদ্ভুত পদ্ধতিতে তাদের ফলাফলও নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার পথে হাঁটতে গিয়ে দারুণ হোঁচট খাবে।

এবার মাধ্যমিক পর্যায় নিয়েও সিদ্ধান্তে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখানেও অটো পাসের মধ্য দিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উঠবে সবাই। তবে সপ্তাহে সপ্তাহে শিক্ষকদের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার মধ্যে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে শিক্ষকদের। এই সংকট দশায় এটিকে মন্দের ভালো বলা যায়। তবে একেবারে অনিবার্য না হলে কোনো প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া শিক্ষার্থীদের হরেদরে পাস করিয়ে দেওয়াটা শিক্ষাবিজ্ঞানের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরাটাই স্বাভাবিক। একটি জাতির শিক্ষা-ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁরা বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই এজাতীয় সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিতে পারেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পরীক্ষা না নিয়ে উত্তীর্ণ করানো কি বর্তমান বাস্তবতায় অনিবার্য ছিল?

আমাদের কিন্তু তেমনটা মনে হয় না। কারণ ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারতের মতো কভিড কিন্তু আমাদের দেশে তেমন প্রকটরূপে নেই। গত মার্চ মাসের পর কয়েক মাস যতটা ভয়ংকররূপে কভিড ছিল বা ভয়ংকর ভেবে মানুষ ঘরবন্দি ছিল, ততটা এখন নেই। তা ছাড়া ক্রমান্বয়ে সরকার যেমন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, সাধারণ মানুষও অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে ঘটনাগুলো ঘটছে তার বেশির ভাগ বয়স্ক ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক শিল্প-কারখানায় কাজ করে যাচ্ছেন এবং ভালোই আছেন। চাকরিজীবীরা ১০টা থেকে ৫টা অফিস করে যাচ্ছেন। দেশজুড়ে বাজারঘাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই চলছে। হাজার হাজার প্রবাসী চাকুরে বিমানের টিকিট প্রত্যাশায় দিনের পর দিন ভিড় জমাচ্ছেন এয়ারলাইনসের অফিসের সামনে। এসব ক্ষেত্রে করোনা সংক্রমণের কথা বলে কোনো কড়া আইন প্রয়োগ হয়নি।

সবচেয়ে আপাত বিরোধী পরিস্থিতি দেখি দুদিন আগে যখন উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি শুরু হলো, তখন খুব কম কলেজই অনলাইনে ভর্তি সম্পন্ন করেছে। বেশির ভাগ কলেজে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে একাধিকবার ভর্তীচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীরা জড়ো হয়েছে। তখন কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কোনো নির্দেশনা ছিল না। এরই মধ্যে দুটি প্রজ্ঞাপন দেখে বিস্মিত হলাম। একটি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, স্কুল ও মাদরাসার প্রধানদের কাছে পাঠানো চিঠি। এটি পঞ্চম জাতীয় বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণের জন্য চিঠি। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের সূত্রে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে। এক অধ্যক্ষের প্রশ্ন, যেখানে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় এইচএসসি পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাকে অটো পাসের ফর্মুলায় ফেলে দেওয়া হলো, সেখানে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হচ্ছে কিভাবে? দ্বিতীয় চিঠিটির পরিসর আরেকটু বড়। এই চিঠিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রচারিত। বিষয়টি ৪১তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ এবং বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ২০২০-এ বিভিন্ন গ্রুপভিত্তিক ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠানোর নির্দেশনামা। দেখা যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম থেমে নেই। তাহলে কেন স্বাস্থ্যবিধি মান্য করিয়ে সতর্কতার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিসর ও সিলেবাসে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা গেল না। এ পর্যন্ত পত্রপত্রিকার নানা লেখা ও বিশ্লেষণে আমরা বিকল্প নানা উপায় উত্থাপনের চেষ্টা করেছি।

তাহলে সন্দেহবাতিকগ্রস্তরা যেমন বলেন, যাঁরা নীতিনির্ধারণ করেন তাঁদের নিকটজনেরা খুব কমই এমন সাধারণ ধারায় বা দেশে থেকে লেখাপড়া করে। তাই গভীর দায়বোধ তাঁদের থাকে না। শুধু আত্মরক্ষায় ব্যস্ত থাকেন তাঁরা। আমরা আশা করব, এখনো যদি সুযোগ থাকে, তবে এই বিভ্রান্ত দশা থেকে সংশ্লিষ্টজনরা যেন ফিরে আসেন।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা