kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

জয়তু দেবী দুর্গা

তারাপদ আচার্য্য

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জয়তু দেবী দুর্গা

সনাতন ধর্মের পূজা অনুষ্ঠানগুলোতে এবং বিভিন্ন প্রতিমার রূপ কল্পনায় মূলশক্তি হলো আত্মশক্তি। যাকে সংস্কৃততে বলে ‘আত্মানাং বিদ্ধি’ অর্থাৎ নিজেকে জানো বা আত্মাকে জানো। দুর্গা সাধকের নিজের এবং বিশ্বের মূল মহাশক্তি। সব দেবতার তেজরাশির সমন্বিত শক্তিরূপই মহাশক্তি দুর্গা

 

দেশে করোনাকাল চলছে। প্রতিটা দিন মানুষের দুশ্চিন্তায় কাটছে। কে কখন মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হবে, তা কেউ জানে না। এই সংকটময় সময় থেকে উত্তরণের জন্য মায়ের আগমন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মা দুর্গার আগমনে মানুষের এই দুর্গতির অবসান হবে।

বাংলাদেশে মাতৃপূজার যে প্রচলন তাতে বিচিত্র রূপ আছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে মাতৃদেবীর মধ্যে বহু যুগের বহু ধারা এসে মিশেছে। অনেক প্রাচীন ধারামূল আমরা বেদের মধ্যেই লক্ষ করতে পারি। এই মাতৃ বা শক্তিদেবীর প্রাচীন ধারা মুখ্যত দুটি। একটি শস্য প্রজননী ভূতধারিণী পৃথিবী দেবী, অন্যটি এক পর্বতবাসিনী সিংহবাহিনী দেবী, যিনি পরবর্তীকালে পার্বতী, গিরিজা, অদ্রিজা নামে খ্যাত। এই পার্বতীই হলেন উমা। মা দুর্গা নামে ভক্তদের কাছে পরিচিতা। চণ্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী দুর্গম নামের অসুরকে বধ করায় মায়ের নাম হয়েছে দুর্গা। দুর্গম অসুরের কাজ ছিল জীবকে দুর্গতিতে ফেলা। দুর্গমকে বধ করে যিনি স্বর্গ থেকে বিতাড়িত দেবতাদের হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দেন এবং জীবজগেক দুর্গতির হাত থেকে রক্ষা করেন, তিনি মা দুর্গা, সন্তানের মঙ্গলময়ী জননী।

দুর্গা ও দুর্গাপূজা সংক্রান্ত কাহিনির মধ্যে ভক্তদের কাছে সর্বাধিক প্রিয় ও লোকমান্য হলো দেবীমাহাত্ম্যমের কাহিনি। দেবীমাহাত্ম্যম প্রকৃতপক্ষে ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর একটি নির্বাচিত অংশ। ৭০০ শ্লোকবিশিষ্ট এই দেবীমাহাত্ম্যমই শ্রীশ্রী চণ্ডী। দেবীমাহাত্ম্যমের কাহিনি অনুসারে পুরাকলে মহিষাসুর দেবতাদের যুদ্ধে পরাজিত করে স্বর্গ দখল করে। অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী তখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত দেবতারা প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাকে মুখপাত্র করে শিব ও নারায়ণের কাছে উপস্থিত হন। মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনি শোনার পর তাঁরা উভয়েই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হন। সেই ক্রোধে তাঁদের মুখমণ্ডল ভীষণাকার ধারণ করে। ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতার দেহ থেকেও বিপুল পরিমাণে তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হয়। সুউচ্চ হিমালয়ে অবস্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজপুঞ্জ একত্র হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করে। এই তেজস্বিনী দেবীই হলেন মা দুর্গা। দেবতাদের পুঞ্জীভূত শক্তির দেবী।

আশ্বিনের শুক্লাষষ্ঠী থেকে শুক্লানবমী পর্যন্ত দেবী দুর্গার পূজা হয়ে থাকে। দেবীর সঙ্গে যুক্ত হয় আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্যাবিজ্ঞানদায়িনী দেবী সরস্বতী, সর্বৈশ্বর্য প্রদায়িনী দেবীলক্ষ্মী, সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশ, বলরূপী কার্তিক এবং ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন ত্যাগ ও বৈরাগ্যের মূর্তবিগ্রহ দেবাদিদেব মহাদেব। এ যেন একই সঙ্গে শক্তি, জ্ঞান, ঐশ্বর্য, সিদ্ধি, বল ও বৈরাগ্যের এক অপূর্ব সমাবেশ।

পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমী। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে আবার কৈলাসে ফিরে যাবেন স্বামীর ঘরে। সঙ্গে নিয়ে যাবেন ভক্তদের ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর বেদনাশ্রু। সকালেই দেবীর দশমীবিহিত পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জনের পর্ব শেষ হবে। প্রতিমা বিসর্জনের আগে ভক্তিমতী রমণীরা দেবী দুর্গাকে বেদনাবিধুর বিদায়লগ্নে তেল, মিষ্টি, ধান, দূর্বা, সিঁদুর ও পান দিয়ে ভোজন করাবেন। এরপর শোভাযাত্রাসহকারে দেবী প্রতিমার হবে বিসর্জন। ভগ্নমনোরথে ভক্তরা মন্দিরে ফিরে শান্তিজল ও আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে যাবেন আপন ঘরে। শুরু হবে আগামী বছর মায়ের ফিরে আসার দিন গোনা।

সনাতন ধর্মের পূজা অনুষ্ঠানগুলোতে এবং বিভিন্ন প্রতিমার রূপ কল্পনায় মূলশক্তি হলো আত্মশক্তি। যাকে সংস্কৃততে বলে ‘আত্মানাং বিদ্ধি’ অর্থাৎ নিজেকে জানো বা আত্মাকে জানো। দুর্গা সাধকের নিজের এবং বিশ্বের মূল মহাশক্তি। ঋষি বেদব্যাস পরম ব্রহ্মের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন, তুমি রূপ বিবর্জিতা; আমি ধ্যানে তোমার রূপ কল্পনা করেছি। অপরূপকে রূপময়, অনির্বচনীয়কে বচনীয় এবং সর্বব্যাপীকে স্থানিক করা হয়েছে সর্বলোকের কল্যাণের জন্য। আমাদের ঋষিকবিরা মানুষের মধ্যকার সুরশক্তির ও অসুরশক্তির দ্বন্দ্বের কথা এবং পরিণামে অসুরশক্তির বিনাশ ও সুরশক্তির জয়ের কথা ধর্মগ্রন্থে রূপকে বর্ণনা করেছেন। সব দেবতার তেজরাশির সমন্বিত শক্তিরূপই মহাশক্তি দুর্গা।

 

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা