kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

আমরা উদ্বিগ্ন

মো. সুলতান-উল-ইসলাম টিপু, সফিকুন্নবী সামাদী, এস এম এক্রাম উল্যাহ, মো. আসাবুল হক, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, শহীদ ইকবাল, মো. জাহাঙ্গীর আলম সাউদ, অসিত রায়, মো. মামুনুর রশিদ তালুকদার, সৈয়দ মুহাম্মদ আলী রেজা অপু, মো. মজিবুল হক আজাদ খান, মো. তারিকুল হাসান, মো. শহিদুল আলম, মো. মিজানুর রহমান, মোহা. মাইনুল হক রানা, মোস্তফা তারিকুল আহসান, সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমরা উদ্বিগ্ন

সাম্প্রতিককালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের নিয়োগ বাণিজ্য, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করে উপাচার্যের কন্যা, জামাতা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনের সন্তানদের শিক্ষক-কর্মকর্তা হিসেবে ঢালাও নিয়োগ প্রদান, উন্নয়ন বাজেটের অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে উপাচার্যের কন্যা ও জামাতা এবং তাঁর একান্ত অনুসারীর সন্তানদের শিক্ষক-কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ প্রদানের জন্য সর্বজন প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল ও অবনমিত করার। আগের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী অভিযুক্ত প্রার্থীরা শিক্ষক হিসেবে আবেদন করার যোগ্যতা হারিয়েছিল। সংবাদপত্রে প্রকাশ, শুধু শিক্ষকের সন্তান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষক ৩০-৩৫ বছর ধরে প্রত্যাশিত সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হন। বহু শিক্ষক আছেন যাঁরা দিনের পর দিন ক্লাসে-ল্যাবে যান না, শুধু প্রশাসনের তোষামোদিতে ব্যস্ত থাকেন। অনেক শিক্ষকের উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণাও নেই। গবেষণাপত্র নকল করা থেকে শুরু করে এমফিল/পিএইচডি ডিগ্রি জালিয়াতির সম্ভাবনা যোগ্যতমদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস জালিয়াতি বন্ধ করার লক্ষ্যে প্লেজারিজম সফটওয়্যার সংগ্রহ করা হলেও বর্তমান প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার কারণে প্লেজারিজম কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হয়নি। ফলে গবেষণাপত্র জালিয়াতি রোধ করা প্রকৃত অর্থে সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত প্রশাসনের সময় এমফিল/পিএইচডি অভিসন্দর্ভ অনলাইনে আপলোড করার চলমান প্রক্রিয়া বর্তমানে থেমে যাওয়ায় অনেক ডিগ্রি সম্পর্কে শিক্ষকরা সন্দিহান।

প্যারিস রোড রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অহংকার। প্যারিস রোডের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে প্রথমে ঘাস লাগানো হয়। পরে ঘাস তুলে পরিকল্পনাহীন ফুটপাত করা হয়। আবার সেই ফুটপাতের সংস্কার করা হয়েছে। রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে ফুটপাতের পাশে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এক কাজ তিনবারে করে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে রুচিহীন স্থাপনা অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করে সমালোচনার খোরাক সৃষ্টি করা হয়েছে।

জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের এখনো সুরাহা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বর্তমান উপাচার্যের প্রথম মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুসারে অপরাধীদের শাস্তি হওয়া দূরে থাক, অজ্ঞাত কারণে রিপোর্টটি আলোর মুখও দেখেনি। এমনকি বর্তমান উপাচার্য সে সময় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট যথাসম্ভব দ্রুত বাক্সবন্দি করে রাখার সব প্রক্রিয়া এককভাবে সম্পন্ন করেছেন। বিশ্বমানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রশাসন শিক্ষা-গবেষণার মান বৃদ্ধির জন্য ইনস্টিটিউট, বৃত্তি, অনুদান চালু করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গবেষণাগারগুলোর উন্নয়ন না করলেও জনগণের অর্থ ব্যয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের নামে হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক নির্মাণের তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করে বর্তমান প্রশাসন স্মৃতিফলক নির্মাণের কাজ স্বজ্ঞানে অসমাপ্ত রাখার দায়িত্ব পালন করছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে দক্ষিণপন্থীদের অবস্থান শক্ত হওয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক নির্মাণকাজে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শহীদদের আত্মদানকে অবমাননা করা হয়েছে। বর্তমান উপাচার্যের প্রথম মেয়াদে টিএসসিসি নির্মাণের কাজে অগ্রগতি হয়নি। বিগত প্রশাসনের আমলে মূল ভবনের কাজ করা হলেও বর্তমানে টিএসসিসি চত্বরের কাজ অসম্পূর্ণই রয়ে গেল। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চত্বর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। বর্তমান প্রশাসনের আমলে অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনাগ্রহের কারণে এর নির্মাণকাজ শুরু করা হয়নি। ঠিক এমনই অনাগ্রহ ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে ২০ তলা একাডেমিক ভবন, ১০ তলা আবাসিক ভবন, শেখ হাসিনা হল, এ এইচ এম কামারুজ্জামান হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ ৫২০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের বেশির ভাগ কাজের লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়নি। প্রাপ্ত অর্থ যেখানে সেখানে পরিকল্পনাহীনভাবে ব্যয় করা হচ্ছে।

লাইব্রেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি আধুনিকায়নের কাজ বন্ধ রয়েছে, পাঠকক্ষের শীতাতপ ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আরএফআইডি সিস্টেম চালুর কোনো অগ্রগতি হয়নি। লাইব্রেরি পরিণত হয়েছে শ্মশানে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু কর্নার প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যপথে বর্তমান প্রশাসনের নির্দেশে বাতিল করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগ, অনুষদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নতমানের গবেষণামূলক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। গবেষণামূলক পত্রিকাগুলো অনলাইন করার কোনো উদ্যোগ গত চার বছরে গ্রহণ করা হয়নি। প্রশাসনের মেয়াদ শেষ হতে চললেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকটা অধরাই থেকে গেল।

দেশে দুর্নীতির অভিযোগে কোনো কোনো উপাচার্য পদ হারিয়েছেন। পদ হারানোটাই কি যথেষ্ট? উপাচার্যের মতো অতি সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন পদে থেকে যাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন তাঁদের প্রতি অনুকম্পা দেখানো হলে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় না। উপাচার্যদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফল বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতিকে বহুকাল ধরে বহন করতে হয়। ভোগান্তিতে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা। জনগণের অর্থের অপচয় হয় ঠিকই; কিন্তু জাতির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অর্থলিপ্সু, লোভী, চতুর, দুষ্ট, দুর্জন ও সুবিধাবাদীদের নিয়ে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল শিক্ষকসমাজের মধ্যে বিভেদ, হিংসা, জিঘাংসার সৃষ্টি করেছেন। শিক্ষকদের বেতনক্রমের সমতা বিধান না করে দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা এবং জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ না করেই পদোন্নতি দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পারস্পরিক আত্মকলহ ও উত্তেজনার সৃষ্টি করায় শিক্ষকমহল চরম অসন্তুষ্ট।

অপরাধের দায়মুক্তি অপরাধ করার প্রবণতা বৃদ্ধি করে। অনুপ্রবেশকারী সুযোগসন্ধানী অপরাধীরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এর নেতিবাচক প্রভাব জনমনে অসন্তুষ্টির উদ্রেক ঘটায়। শিক্ষা ও গবেষণাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়, সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলাদেশ গঠন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণে অপরাধীদের প্রতি অনুকম্পা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।

লেখকবৃন্দ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল শিক্ষকসমাজের সদস্য

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা