kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে আমাদের অগ্রগতি প্রসঙ্গে

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে আমাদের অগ্রগতি প্রসঙ্গে

গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের ২০২০ সালের তথ্য মতে, বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশ ১০৭টি দেশের মধ্যে ২০.৫ স্কোর নিয়ে ৭৫তম স্থান দখল করেছে। ঠিক ২০০০ সালে ৩৬ স্কোর নিয়ে দেশের অবস্থান ছিল অনেক পেছনে, যা সূচকের ভাষায় ভীতিকর অবস্থা নির্দেশ করে। এ বছর বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এসেছে। সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ৯৮ ও ৮৮। ক্ষুধা সূচকে আমাদের অবস্থানের অগ্রগতি হলেও সামগ্রিক অর্থনীতির অগ্রগতি যেমন ভালো হওয়া উচিত ছিল, ঠিক তেমনটি নয়। তবে এ কথা বলা যায়, আমাদের অগ্রগতি অনেক হয়েছে। আমরা ভারত ও পাকিস্তানকে টপকে গিয়েছি সত্য; কিন্তু আমাদের আরো সামনে আগাতে হবে। ক্ষুধা সূচকে সামনে আসার জন্য তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বসে থাকলে চলবে না; বরং আরো অনেক কাজ করতে হবে। সম্প্রতি আইএমএফ বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে করোনার মধ্যেও যে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে তা উল্লেখ করেছে। বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি করোনার কারণে যেখানে ঝুঁকির মধ্যে, সেখানে বাংলাদেশের জিডিপি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও করোনা মোকাবেলায় যথাসাধ্য চেষ্টার ফসল আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল।

একসময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। বাংলাদেশ সেই কলঙ্ক অনেক আগেই গোছাতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে প্রশংসা ও আশাব্যঞ্জক মন্তব্য করতে এখন একটুও পিছপা হয় না। সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ, সাহস ও ধারাবাহিকতা আমাদের আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সাহস না থাকলে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা কী করে সম্ভব। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পেছনে অবদান এ দেশের কর্মঠ ও পরিশ্রমী মানুষের। আর কাণ্ডারি হিসেবে কাজ করছে সরকারের সুযোগ্য নেতৃত্ব, নীতি, পরিকল্পনা ও ব্যাপক কর্মসূচি। সরকারের যাবতীয় পদক্ষেপের বিপরীতে কাজ করছে মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আজ আমরা সামাজিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো দেশকে টপকে গিয়েছি; এর অন্যতম কারণ সরকারের যথাযথ কর্মসূচি ও তার প্রতি মানুষের আস্থা। আমাদের মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু ও অপুষ্টি অনেক কমে গিয়েছে। তার অন্যতম কারণ ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডূকতাকে পেছনে ফেলে নারীরা গর্ভকালীন ও পরবর্তী সময়ে শিশুদের সময়মতো টিকা দিতে সক্ষম হয়েছেন। মাঠকর্মীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মায়েদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে।

গত দুই দশক আগেও আমাদের চাল আমদানি করতে হতো। এখন আমরা রপ্তানি করি। এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের কৃষকদের কঠোর পরিশ্রম ও কৃষি গবেষকদের গবেষণার সাফল্যের জন্য। প্রতিবছর কমবেশি বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ফসলহানি হয়; তার পরও কৃষকরা ঘুরে দাঁড়ায়। আমরা এখন অনেক পণ্য রপ্তানি করি। মানুষের কঠোর পরিশ্রম আজকে বাংলাদেশকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। যে কারণেই হোক, করোনার এই সময়ে আমাদের রেমিট্যান্সের পরিমাণ সর্বোচ্চ। বিদেশে চাকরি হারিয়ে অনেকে দেশে ফিরেছেন; কিন্তু তার প্রভাব অর্থনীতিতে তেমন পড়বে বলে মনে হয় না। আমাদের সামাজিক বেষ্টনীর প্রসার ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে আনুমানিক এক শ কিংবা তারও বেশি নিরাপত্তাবেষ্টনী রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আজকের সূচকের অগ্রগতি।

তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের দেশেও রয়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতি আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। এর পরও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তার অন্যতম কারণ আমাদের খেটে খাওয়া মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম। আমরা যদি দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে আমাদের অবস্থান আরো এগিয়ে যেত। নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংস আচরণ আমাদের উন্নয়নের বড় বাধা। সম্প্রতি ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো সামাজিক ব্যাধি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়বে নারীশিক্ষা ও নারীর কর্মসংস্থানের ওপর। ঘরে ও বাইরে যদি নারী নিরাপদ না হয়, তাহলে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ যাতে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে সে জন্য নতুন নতুন উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সবার ওপরে দেশ। দেশের গুটিকয়েক লোককে ব্যবসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বড় করার অর্থ গরিব ও ধনীর মধ্যে ব্যবধান আরো বেড়ে যাওয়া। আমাদের নীতির মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে। আবার এটাও ভাবতে হবে, প্রাইভেট সেক্টরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে না পারলে বেকার সমস্যা আরো তীব্র আকার ধারণ করবে। আমাদের অর্থনৈতিক সূচক এখন অনেক ভালো। আরো ভালো করতে হলে দরকার দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সমাজ থেকে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো সামাজিক ব্যাধি লাঘব। আমাদের প্রত্যেককে অঙ্গীকার করতে হবে—আমরা কোনো প্রকারের দুর্নীতি করব না এবং দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব না। তবেই বিভিন্ন সূচকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। 

 

 লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য