kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

প্রিন্স উইলিয়াম এবং একটি পুরস্কারের কথা

অনলাইন থেকে

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যখন নির্বাচিত কর্মকর্তারা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের কথা শুনে থমকে দাঁড়ান, পিছটান দেন বা এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করেন, তখন একজন রাজকুমারকে শুভ উদ্যোগে শামিল হয়ে কাজ শুরু করতে দেখে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত বোধ করতে হয়।

ব্রিটিশ সিংহাসনের দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম সম্প্রতি আর্থশট প্রাইজ ঘোষণা করেছেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন খ্যাতিমান ইংলিশ ব্রডকাস্টার ও প্রাকৃতিক ইতিহাসবিদ স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। তাঁরা প্রতিবছর ৫০ লাখ পাউন্ডের পুরস্কার দেওয়ার কথা বলেছেন; আগামী ১০ বছর এটি পাঁচটি পরিবেশগত লক্ষ্যে কাজ করার জন্য দেওয়া হবে। সেগুলো হলো—জলবায়ুকে স্বাভাবিক রাখা, বাতাসকে পরিশুদ্ধ রাখা, প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেওয়া ও পুনঃসঞ্জীবিত করা, মহাসাগরগুলোকে সপ্রাণিত করা ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

বিশ্বের যেকোনো ব্যক্তি বা গ্রুপ বা করপোরেশন এসব কাজের জন্য উপযুক্ত এবং যেকোনো পরামর্শকে—অ্যাটেনবরো বলেছেন, এমনকি যাদের কথাবার্তা খ্যাপাটে বলে মনে হয় তারাও—স্বাগত জানানো হয়েছে, যতক্ষণ তাদের পরামর্শ বৈশ্বিক মাত্রায় প্রযোজ্য থাকবে। এটি হতে পারে নতুন কোনো প্রযুক্তি, নতুন কোনো অ্যাপ্রোচ, নতুন কোনো সরকারি নীতি অথবা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন কিছু অথবা প্রতিভার স্ফুরণ বা আইডিয়া। এই উদ্যোগের লক্ষ্যটি হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের এই গ্রহটিকে পুনঃসংস্থাপিত করা।

এই উদ্যোগটি কিছু মাত্রায় বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। পুরস্কারের উদ্দেশ্য হচ্ছে (যা এটিকে একই উদ্দেশ্যের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে) প্রণোদনা বা উৎসাহের জোগান দেওয়া। প্রিন্স উইলিয়াম বলেছেন, এটি এক ধরনের অনুঘটক, এটি এক ধরনের আশা, এক ধরনের ইতিবাচকতা অর্থাৎ লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রয়াস; প্রায়ই ডুমসডে সিনারিওতে এমন কিছুর কথা বলা হয়। আর্থশট কথাটি নেওয়া হয়েছে মুনশট থেকে। মুনশটের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬১ সালে ‘জায়ান্ট টেন-ইয়ার প্রজেক্ট’ বিষয়ক ঘোষণায় বলেছিলেন, এক দশকের মধ্যে চাঁদে একজন মানুষ পাঠানো হবে, সেটিই ‘মুনশট’ কথার দ্যোতক।

বিবিসির মতে, প্রিন্স উইলিয়াম বেশ কিছুদিন ধরে পুরস্কারটি চালুর চেষ্টা করছেন একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ডাচেস অব কেমব্রিজ ক্যাথেরিন পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এর জন্য প্রয়োজনীয় টাকা আসবে বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত দাতার কাছ থেকে; তাদের মধ্যে রয়েছে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিজ, দ্য জ্যাক মা ফাউন্ডেশন ও দি আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক। প্রাইজ কাউন্সিলে (যাঁরা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করবেন) রয়েছেন বিভিন্ন সেলিব্রেটি, যেমন—অভিনেত্রী কেইট ব্লানচেট, কলম্বিয়ার গায়িকা শাকিরা।

পুরস্কারের ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো, যখন ইতিবাচকতার আশ্বাস বেশি করে দরকার। সারা বিশ্বেই করোনার উপদ্রব বাড়ছে, সংক্রমণ বর্ধমান এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের লক্ষণ; যেমন—ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল ও আর্কটিকে বরফ গলনের মতো ঘটনা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট ও বিপজ্জনক হচ্ছে।

প্রিন্স উইলিয়ামের রাজকীয় রক্তে এনভায়রনমেন্টাল অ্যাক্টিভিজম আছে। তাঁর দাদা ডিউক অব এডিনবরা ও রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী প্রিন্স ফিলিপ একজন সক্রিয় পরিবেশবাদী ছিলেন। প্রিন্স উইলিয়ামের বাবা প্রিন্স অব ওয়েলস ও ব্রিটিশ সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লসও তা-ই ছিলেন। গত মাসে নিউ ইয়র্কের ক্লাইমেট উইকের শুরুর দিনে বক্তৃতা করতে গিয়ে প্রিন্স চার্লস এমন একটি গ্রহের কথা বলেন, যে গ্রহকে তার গ্রহসীমার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

প্রিন্স উইলিয়াম তাঁর রাজকীয় ঐতিহ্যের কথা বলেছেন। আবার এ স্বীকারোক্তির সময় যাঁরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য মানবীয় দায়দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা অব্যাহত রাখেন, তাঁদের প্রতি কিছুটা কটাক্ষও করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, তাঁর বাবা প্রিন্স চার্লস একটি সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন যে পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে কখনো কতকটা উত্কট ও খ্যাপাটে মনে করা হয়েছে। প্রিন্স উইলিয়াম বিচক্ষণ মন্তব্য করে বলেন, ‘আমি নিয়মিত পড়ি/শুনি আমার বাবা কী বলেন! এবং অবাক হই।’ এর পরই বলেন, তিনি সব সময় তাঁর কথা শোনেন, সেখান থেকে জানার চেষ্টাও করেন এবং তাঁর কথা বিশ্বাস করেন; পরিবেশ সম্পর্কে তিনি আসলে কী বলেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করেন।

এসব জ্ঞানসমৃদ্ধ কথা, একজন রাজকুমারের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা বুদ্ধিদীপ্ত কথা এবং পুরস্কারটি একটি ভালো জিনিস। পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড, টাকার মাত্রায় এটি নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের চেয়েও বেশি। এতে প্লানেট আর্থের দুর্দশা থেকে উত্তরণবিষয়ক মনোযোগী ও সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনা উৎসাহিত হবে। নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে যা হয় না, সেটি এ ক্ষেত্রে হবে বলে ধারণা করা চলে—আর্থশট পুরস্কারের টাকা খরচ হবে উইনিং প্রজেক্টে।

 

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা