kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে

এ কে এম আতিকুর রহমান

১৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস পালন করে থাকে। এ দিবসটি পালনের প্রেক্ষাপটে রয়েছে চরম দারিদ্র্য, সহিংসতা ও ক্ষুধায় যেসব মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের স্মরণে ১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে কয়েক লাখ লোকের সমবেত হওয়ার ঘটনাটি। তখন থেকে পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ ও সংস্থা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি নবায়নের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর পালন করে আসছিল। বিষয়টি বিশ্বনেতাদের নজরে এলে ১৯৯২ সালের ২২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব উপস্থাপিত হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে ১৭ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে দিবসটি সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে।

সন্দেহ নেই, এই দিনটি পালনের মাধ্যমে প্রতিটি দেশের নেতাদের তাঁদের জনসংখ্যার দরিদ্র অংশকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাঁদের আন্তরিক ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এই দিনটি পালনের উদ্দেশ্য হলো, অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির জন্য দায়ী বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে তাদের জন্য সোচ্চার হওয়া। আর এ ক্ষেত্রে সংগত কারণেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে রাজনৈতিক নেতাদের, যেহেতু তাঁরাই দেশ ও সমাজের জন্য নীতিনির্ধারণ করে থাকেন।

এখনো বিশ্বে যেসব সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি সেগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য অন্যতম। এটি কখনো আবার যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। যদিও আমাদের জানা নেই যে মানবসভ্যতা কখন থেকে দারিদ্র্যের অভিশাপের মুখোমুখি হতে শুরু করে। যা হোক, বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য যেমন আগেও ছিল, এখনো তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। বিশ্বনেতারা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বহু বছর ধরেই দারিদ্র্য হ্রাস করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং আশা করা যায়, একদিন (আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে) বিশ্ব দারিদ্র্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হবে।

দারিদ্র্য শুধুই একটি জাতীয় বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়। দারিদ্র্যের গুরুত্ব এবং মানুষের জীবিকার ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় এরই মধ্যে এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ক্ষেত্র, যেমন—বাসস্থান, আহার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত বঞ্চনা দারিদ্র্যের তীব্রতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি বলাই বাহুল্য, দারিদ্র্যের এসব কারণের সমাধান করা না হলে দরিদ্র গোষ্ঠীর দুর্ভোগ কখনো শেষ হবে না। প্রকৃতপক্ষে সমতাভিত্তিক শান্তিপূর্ণ বিশ্বসম্প্রদায় সৃষ্টি করতে পারলেই বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করা সম্ভব।

একটি দেশের চরম দারিদ্র্য হ্রাস করা যেতে পারে, যদি সে দেশটির অন্ততপক্ষে একটি অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকে এবং ওই প্রবৃদ্ধি এমনভাবে বণ্টিত হয়, যা বিদ্যমান আয়বৈষম্যকে হ্রাস করে। এটি স্পষ্ট যে একটি অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেই দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করা যায় না। অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনকে সহজ করতে পারে, তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে প্রাপ্ত সুবিধা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিদ্যমান আয় ব্যবধানকে হ্রাস করার লক্ষ্যে সুষমভাবে বণ্টন করতে হবে। অতএব অর্থনৈতিক নীতিমালা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যেক নাগরিকের সর্বাধিক অংশগ্রহণ এবং ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা যায়।

আমরা জানি যে বিশ্বনেতারা ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো (এসডিজি) নির্ধারণ করে সেগুলো কার্যকর করতে নেমে পড়েন এবং পরবর্তী ১৫ বছরের মধ্যে দারিদ্র্যের সর্বপ্রকার বিকাশের অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। ওই লক্ষ্যগুলোর মধ্যে দারিদ্র্যের অবসান অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এটি সত্য যে সাধারণ পরিস্থিতিতেও দারিদ্র্য বিমোচন বিশ্বনেতাদের জন্য একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েই গেছে; যদিও লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি, প্রকল্প এবং সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁদের ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করা অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে হঠাত্ করে কভিড-১৯ গোটা বিশ্বকে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে গেছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্যগুলো অর্জন, বিশেষ করে দারিদ্র্যের অবসান বলতে গেলে অনিশ্চিত। বিগত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে আমরা উন্নতির যে ইতিবাচক প্রবণতা দেখেছি তা করোনার নেতিবাচক প্রভাবে ঠিক উল্টো দিকে ফিরে আসার সমূহ আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক সময়ের হিসাব বলছে, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫০ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্র্য প্রান্তিকের নিচে (প্রতিদিন ১.৯৯ মার্কিন ডলারের কম আয়) চলে যেতে পারে। ব্যাংক আরো বলেছে, করোনা মহামারি আঘাত না হানলে বৈশ্বিক চরম দারিদ্র্যের হার ৭.৯ শতাংশে নেমে যাওয়ার আশা ছিল; কিন্তু এখন তা বেড়ে ৯.৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা অনুমান করেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এ বছরই দারিদ্র্যের খপ্পরে পড়তে পারে ৮৮ থেকে ১১৫ মিলিয়ন মানুষ। অনেকেই ধারণা করেন, ২০৩০ সাল নাগাদ দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে সংঘর্ষ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপকে সঙ্গে করে করোনা মহামারি সেই লক্ষ্য অর্জনকে নাগালের বাইরে নিয়ে যাবে। 

বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক ও কার্যকর প্রচেষ্টার ফলে গত কয়েক বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রশংসনীয় হারে হ্রাস পাচ্ছিল। কিন্তু গত মার্চ মাসে করোনার প্রাদুর্ভাবের পর প্রথম কয়েক মাস পুরো দেশটাই ছিল স্থবির, নিশ্চল। তবে মানুষের জীবন ও জীবিকার সম্ভাব্য দুরবস্থার কথা চিন্তা করে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের কথা চিন্তা করে, সরকার কঠোর স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুসরণ সাপেক্ষে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রটি উন্মুক্ত করে দেয়, যাতে মানুষ অন্তত রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পারে। সর্বোপরি সরকারের ঘোষিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক সহায়তা অর্থনীতির চাকা সচল করতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তবে অন্যান্য দেশের মতোই আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও কভিড-১৯-এর কমবেশি নেতিবাচক প্রভাব যে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্স হলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত আমাদের অভিবাসী কর্মীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স। করোনা মহামারিতে সেসব দেশও আক্রান্ত। ফলে তাদের অর্থনীতিও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আর এ কারণে আমাদের অভিবাসী কর্মীদের জীবনেও নেমে এসেছে এক দুর্বিষহ অনিশ্চয়তা। এরই মধ্যে অনেকেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। বিষয়টি কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তা নির্ভর করছে করোনা মহামারির স্থিতিকালের ওপর। 

যেহেতু আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত করা, তাই আমাদের উপার্জন করার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকারটি হবে সামাজিক ও আয়বৈষম্য হ্রাস করার পদক্ষেপ গ্রহণ। আমাদের নেতাদের এই কাজগুলোকে একটি সুন্দর দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব সৃষ্টির জন্য মহান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যা বিশ্বে শান্তি বয়ে আনবে। আজকের এই দিনে আমরা আমাদের হূদয় থেকে কামনা করি যে বিশ্বনেতারা করোনার মহামারি কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করেই পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবেন।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা