kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

এই সময়

কেমন হলো প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক?

তারেক শামসুর রেহমান

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কেমন হলো প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক?

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ক্লিভল্যান্ডে প্রথম প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। ফক্স টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যা দেখল, তাতে করে তারা হতবাক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের যে আস্থা, সে আস্থা আর থাকল না। সারা বিশ্বের মানুষ দেখল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিভাবে নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের বক্তব্যের সময় বাধা দিচ্ছেন। মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন। সারা বিশ্বের মানুষ আবারও দেখল, কিভাবে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে অসংযত আচরণ করেন। অহেতুক বিতর্ক করেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। একজন প্রেসিডেন্টের জানার কথা, প্রকাশ্যে ডিবেটে কিভাবে কথা বলতে হয়, কিভাবে বিতর্ক করতে হয়, কিভাবে প্রতিপক্ষের প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিবিদরা এ ধরনের বিতর্ক করেন। প্রতিপক্ষকে সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি সভ্য সমাজে এটা কি চিন্তা করা যায়? গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এই প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক শেষ হয়েছে। আমি অন্তত তিনটি প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক নিজে যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। দুটি বিতর্কের খবর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কালের কণ্ঠের পাঠকদের পাঠিয়েছি। মূল্যায়ন করেছি। কিন্তু এবারের মতো অতীতে আমি কখনো দেখিনি। ফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে অনেকের। আগামী ১৫ অক্টোবর মিয়ামিতে ও ২২ অক্টোবর নাসভিলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৩ নভেম্বর সেখানে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

প্রথম প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের আগেই কতগুলো ‘ইস্যু’ সামনে চলে আসছে, যা বিতর্কের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী পরিমাণ ট্যাক্স দেন। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ ধনীদের একজন ট্রাম্প। প্রথম কাতারে না থাকলেও, ২০১৯ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে দেখা যায় ট্রাম্পের সম্পদের পরিমাণ ৩.১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত এই হিসাব। ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত তাঁর সম্পদ আরো বেড়েছে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের কাতারে তাঁর অবস্থান ২৫৯তম, আর বিশ্বে ৭১৫তম। তবে ২০১৫ সালে ট্রাম্প এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্বীকার করেছিলেন, তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার (এনবিসি, ১৬ জুলাই ২০১৫)। যে পরিমাণ অর্থই তাঁর থাকুক না কেন, তা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর (২০১৬) তিনি স্বীকার করেননি কখনো। তাঁর ট্যাক্স ফাইলে তা উল্লেখও করেননি। তবে তাঁর ট্যাক্স ফাইলের গোপন তথ্যটি ফাঁস করে দেয় নিউ ইয়র্ক টাইমস গত ২৭ সেপ্টেম্বর, প্রথম প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের দুই দিন আগে। তাতে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা সবাইকে অবাক করেছে। একজন বিলিয়নেয়ার ট্যাক্স দিয়েছেন মাত্র ৭৫০ ডলার (২০১৭ সালের হিসাব)! অন্যদিকে আরেকটি তথ্যও আমরা পেয়েছি। তাতে দেখা যায়, অন্যতম প্রার্থী জো বাইডেন ট্যাক্স দিয়েছেন ৩৭ লাখ ৪২ হাজার ৯৭৪ ডলার, ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও জো বাইডেনের রানিং মেট কমালা হ্যারিস দিয়েছেন পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৯ ডলার, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তিন লাখ ৪৩ হাজার ৮৮২ ডলার, সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন দিয়েছেন দুই লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৪ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে সবাইকে ট্যাক্স দিতে হয়, যাঁরা চাকরি করেন। আয় থেকেই তাঁরা ট্যাক্স দেন। তাহলে ট্রাম্পের ব্যাপারে এত ফাঁকিজুকি কেন? সাধারণত ধনী ব্যবসায়ীরা এ কাজটি করেন—তাঁরা ট্যাক্স ফাঁকি দেন। ট্রাম্পও দিয়েছেন। তবে অত্যন্ত কৌশলে এ কাজটি তিনি করেছেন। অতীতে একাধিকবার এই প্রশ্নটি উপস্থাপিত হলেও ট্রাম্প কখনোই তা খোলাসা করেননি। এবারও যখন নিউ ইয়র্ক টাইমস তথ্যটি ফাঁস করে দিল, হোয়াইট হাউস কিংবা ট্রাম্পের ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে তা খণ্ডন করা হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে বছরে যে বেতন পান (চার লাখ ডলার), তা তিনি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দান করে দেন। একজন প্রেসিডেন্ট যখন অবসরে যান, আজীবন তিনি পেনশন পান, যার পরিমাণ দুই লাখ ১৯ হাজার ২০০ ডলারের মতো বছরে।

একজন ধনী ব্যক্তি হয়েও ট্রাম্প ট্যাক্স দেন না, এটা বহুল আলোচিত এবং প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কেও তাঁকে এ প্রশ্নটি করা হয়েছিল। তখন তিনি জবাবে বলেছিলেন, তিনি ‘মিলিয়ন ডলার ট্যাক্স’ দেন। তাহলে কি তিনি মিথ্যা বললেন? তাঁর স্টাফরা অবশ্য এ ব্যাপারে কোনো তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে পারেননি। তার অর্থ হচ্ছে, তিনি যা বলেছেন তা মিথ্যা। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তথ্যের কোনো মিল নেই। প্রশ্ন হচ্ছে এখানেই। একজন প্রেসিডেন্ট কি তাহলে মিথ্যা বললেন?

শুধু তা-ই নয়, বিতর্ক চলাকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে বারবার জো বাইডেনের বক্তব্য দেওয়ার সময় বাধা দিচ্ছিলেন, তা ছিল অসৌজন্যমূলক। একটি নিউজ পোর্টাল (প্রগেস রিপোর্ট) আমাদের জানাচ্ছে, ট্রাম্প উপস্থাপক ক্রিস ওয়ালেস ও জো বাইডেনকে মোট ১২৮ বার বাধা দিয়েছেন, তাঁদের কথা বলতে দেননি। ফলে যাঁরা প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের আয়োজন করেন, তাঁরা এখন বিতর্কের কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন আনবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতিতে একটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমেসি। ট্রাম্পের জমানায় জাতিগত বিদ্বেষ বেড়েছে, তাঁকে কেন্দ্র করে জন্ম হয়েছে ‘ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারস’ আন্দোলনের। ট্রাম্পের নীতি শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে উসকে দিয়েছিল। তিনি শ্বেতাঙ্গ ‘সুপ্রিমেসির’ ধারণার জন্ম দিয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছিলেন। বিতর্কে ক্রিস ওয়ালেস যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ ধারণা যাঁরা প্রমোট করেন, যেমন Proud Boys-দের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যকলাপের নিন্দা করেন কি না, জবাবে তিনি তাদের সমর্থন করলেন এবং তাদের পক্ষে দাঁড়ালেন। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও বহুল আলোচিত। এ ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলেও তিনি আগের ‘অবস্থান’ থেকে সরে আসেননি। অথচ জো বাইডেন বললেন, তিনি নির্বাচিত হলে ‘প্যারিস চুক্তি’তে ফিরে যাবেন, যেখানে বিশ্বের নেতারা বিশ্বের উষ্ণতা কমাতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন মাত্রা কমাতে রাজি হয়েছিলেন। ট্রাম্পকে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে তাঁর নীতির ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, তিনি কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফল হয়েছেন এবং তিনি না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে ২০ লাখ মানুষ মারা যেত! অথচ পরিসংখ্যান বলছে, কভিড-১৯-এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে।

প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের পর যে জনমত জরিপ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যায় জো বাইডেনের পক্ষে জনমত শতকরা ৪৮ ভাগ, আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে ৪১ ভাগ। ১০ ভাগ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন (statista)। ফলে একটা প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে যে নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে গেলে তিনি এই ‘হার’ স্বীকার করবেন কি না। তাঁকে এ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি এর সুস্পষ্ট জবাব দেননি।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। এখন আমাদের অপেক্ষার পালা ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। এই সময়সীমায় ট্রাম্প জনমত তাঁর পক্ষে নেওয়ার জন্য কী কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য